মতামত

মহালয়ার সুর ও শ্রীবীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সন্ধিক্ষণকেই বলা হয় মহালয়া।
আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সন্ধিক্ষণকেই বলা হয় মহালয়া।ছবি: ফাইল ফটো, প্রথম আলো
বিজ্ঞাপন

আশ্বিন মাসের অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপূজা ও মাতৃপূজার সন্ধিক্ষণকেই বলা হয় মহালয়া। ‘মহ’ শব্দটির দুটি অর্থ আছে। ‘মহ’ বলতে বোঝায় পূজা, আবার ‘মহ’ বলতে বোঝায় উৎসব। আবার মহালয় বলতে বোঝায় মহান+আলয়। এর সঙ্গে আছে স্ত্রীকারান্ত ‘আ’। মহালয় হচ্ছে পূজা বা উৎসবের আলয় বা আশ্রয়। অন্যদিকে ‘মহালয়’ বলতে, ‘পিতৃলোককে’ বোঝায় যেখানে বিদেহী পিতৃলোক অবস্থান করছেন। তা যদি হয়, তাহলে পিতৃলোককে স্মরণের অনুষ্ঠানই মহালয়া। কিন্তু তাহলে শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ হলো কেন? পিতৃপক্ষের অবসানে, অন্ধকার অমাবস্যার সীমানা ডিঙিয়ে আমরা যখন আলোকময় দেবীপক্ষের আগমন প্রত্যক্ষ করি, তখনই সেই মহালগ্নটি আমাদের জীবনে ‘মহালয়ার’ বার্তা বহন করে আনে। এ ক্ষেত্রে স্বয়ং দেবীই হচ্ছে সেই মহান আশ্রয় বা আরাধনার ক্ষেত্র এবং তাঁর এ উত্তরণের লগ্নটির নামই মহালয়া।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন, যেটি ঋষি এবং প্রজাপতিদেরও আবাসস্থল। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় লীন হন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের ঊর্ধ্বে উঠে যান। এই কারণে শুধু জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে; এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সূর্য কন্যা রাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষেরা পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাঁদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এরপর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশে তর্পণাদি করতে হয়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মহাভারত অনুযায়ী, প্রসিদ্ধ দাতা কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা স্বর্গে গমন করলে তাঁকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়। কর্ণ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে ইন্দ্র বলেন, কর্ণ সারা জীবন স্বর্ণই দান করেছেন, তিনি পিতৃগণের উদ্দেশে কোনো দিন খাদ্য প্রদান করেননি। তাই স্বর্গে তাঁকে স্বর্ণই খাদ্য হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তাঁর পিতৃগণের সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না, তাই তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে পিতৃগণকে স্বর্ণ প্রদান করেননি। এই কারণে কর্ণকে ১৬ দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পিতৃলোকের উদ্দেশে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়।

পিতৃপক্ষের শেষে দেবীপক্ষের শুরুকে মাতৃপক্ষ বলা হয় এবং এই পক্ষেই দেবীর অবগাহন করা হয়। দেবী দুর্গা মহাশক্তি, মহামায়া ও সর্বশক্তির কেন্দ্রীভূত শক্তি। তাঁর বাহন রজোগুণের প্রতীক, অসুর তমগুনের আধার। মহাসরস্বতীরূপে তিনি জ্ঞানের প্রতীক, জ্ঞানতাপস রাজহংস তাঁর বাহন, ধনভান্ডারী রূপে তিনি মহালক্ষ্মী, বাহন যাঁর সদা জাগ্রত পেঁচক। মা আদ্যাশক্তির সঙ্গে থাকেন বল ও বীর্যের প্রতীক দেব সেনাপতি কার্তিক এবং বিঘ্ন নাশকরূপে গণেশ ঠাকুর। কিন্তু সবার ঊর্ধ্বে থাকেন ধ্যানমগ্ন দেবাদিদেব মহাদেব।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মহালয়া ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র

default-image

কোনটি আমাদের কাছে বেশি পরিচিত ‘মহালয়া’ নাকি ‘মহিষাসুর-মর্দিনী’? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা কিন্তু এত সহজ নয়। কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করি, মহালয়া শব্দের সঙ্গে যে প্রবাদপুরুষটির নাম নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে উনি কে? আমি জানি আপনারা এক বাক্যে এবং নির্দ্বিধায় বলবেন, ‘বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র’। বাঙালি হিন্দু সমাজে মহালয়া এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র যেন এক বৃন্তে দুটি ফুল। ১৯৩৩ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিও শারদ-বন্দনা নামে প্রথম প্রচার করেছিল আজকের এ মহালয়ার অনুষ্ঠান। স্তোত্র পাঠে কিংবদন্তি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ভক্তিগদগদ হয়ে এক স্বর থেকে আরেক স্বরে তাঁর কণ্ঠ ও উচ্চারণের ওঠা এবং নামার এক নতুন ছন্দময় গতির সৃষ্টি করে হয়ে উঠেছিলেন মহিষাসুর-মর্দিনীর আচার্য। পরে ১৯৩৪ সালের ৮ অক্টোবর এটিকে মহালয়া নামে এক ঘণ্টার একটি অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করা হয়। দিবসের প্রথম ভাগের রাগাশ্রিত সুর-তালের (মালকোষ ও ভৈরবী) সমন্বয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল সংগীতগুলোকে, যার রূপকার ছিলেন সংগীতের আরেক কিংবদন্তি আচার্য পঙ্কজ কুমার মল্লিক এবং সর্বধর্মের মানুষ যেমন আন্তোনি গোমেজ, সাগর উদ্দিন খান, চন্দ্রকান্ত শীল প্রমুখ অংশ নিয়েছিলেন এ মহতী অনুষ্ঠানে।

মহালয়া নামের যে অনুষ্ঠানটি আজ আমরা উপভোগ করি এর পেছনে একটা মজার কাহিনি আছে। অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল ১৯২৮ সালের দিকে রেডিওর এক ঘরোয়া আড্ডায় যেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন রেডিওর কর্তা নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণী কুমার, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, রাই চাঁদ বড়াল প্রমুখ। সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে বাণী কুমার স্ক্রিপ্ট লিখবেন আর শ্রীশ্রী চণ্ডী পাঠ করবেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কিন্তু বিপত্তি বাধল চণ্ডীপাঠক বীরেন্দ্রকে ঘিরে; কারণ ব্রাহ্মণ সন্তান ছাড়া অন্য জাতের কারও চণ্ডী বা গীতা পাঠ করার অধিকার ছিল না। এখানে বলা বাহুল্য, বীরেন্দ্র ছিলেন কায়েতের ছেলে। বিষয়টি নৃপেণের কানে আসতেই তিনি কড়া প্রতিবাদ করে বলছিলেন, ‘আরে আমরা কি মন্দিরে পুজো দিয়ে যাচ্ছি নাকি যে বামুনের ছেলে ছাড়া চণ্ডী পাঠ করা যাবে না! বীরেনকে বাদ দিলে তো বাদক দলের অর্ধেকটাকেই বাদ দিতে হয়, কারণ আলী মুন্সী ও খুশি মহম্মদ এ অনুষ্ঠানে বাজাবেন। মহালয়ার স্ক্রিপ্ট লিখবেন ও পরিচালনা করবেন তো খাঁটি বামুনের ছেলে বাণী কুমার (বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য)।’ পুরো বিষয় শুনে বাণী কুমার হেসে বলেছিলেন, ‘আমি বীরেন্দ্র ছাড়া অন্য কারুকে চণ্ডী পাঠ করতে দেব না।’

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমার মনে হয় আপনারা সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের জন্মই হয়েছিল মহিষাসুর-মর্দিনীর চণ্ডী পাঠ করার জন্য অথবা যদি এভাবে বলি, শ্রীচণ্ডীমাতা বীরেন্দ্র কৃষ্ণকে জন্ম দিয়েছিলেন চণ্ডী পাঠের মাধ্যমে মায়ের মহিমাকে প্রতিটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর ঘরে ও হৃদয়ে পৌঁছে দিতে এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র তাঁর সুর-ছন্দ ও আবেগপূর্ণ চণ্ডী পাঠের মাধ্যমে তা করতে পেরেছিলেন, এটা বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহাশত্রুও স্বীকার করবেন।

১৯৯১ সালের ৩ নভেম্বর বাঙালির এ প্রবাদপুরুষ দেহত্যাগ করেন।

ড. বিজন কুমার শীল: অণুজীববিজ্ঞানী।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন