ডা. সামন্তলাল সেনের জন্ম ১৯৪৯ সালে, সিলেটের হবিগঞ্জে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন। ২০০৯ সালে অবসর গ্রহণের পর থেকে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের অবৈতনিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।

default-image

প্রথম আলো : ২০১০ সালে নিমতলী অগ্নিকাণ্ডে মারা গিয়েছিল ১২৪ জন মানুষ। সেটা ছিল একটা দুর্ঘটনা। আর এখন মানুষ মানুষকে পুড়িয়ে মারছে প্রতিদিন। এ পর্যন্ত পেট্রলবোমা ও আগুনে পুড়ে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৫০ পেরিয়ে গেছে। এটাকে আপনি কী বলবেন?

সামন্তলাল সেন :মানুষ মানুষকে পোড়াচ্ছে, এভাবে দগ্ধ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া আমাদের জন্য যারপরনাই দুঃখজনক। একসময় আমরা বলতাম, আমাদের যেন অ্যাসিডে পোড়া মেয়েদের চিকিৎসা করতে না হয়। ঠিক তেমনই এখন আমাদের বলতে ইচ্ছা করছে যে, আমাদের যেন মানুষে মানুষে সহিংসতার শিকার পোড়া ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিতে না হয়। আমাদের যাতে দেখতে না হয় যে, মানুষ হয়ে মানুষকে আগুনে পুড়িয়েছে আর সেই পোড়া মানুষের চিকিৎসা আমাদের করতে হচ্ছে।

প্রথম আলো :রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে মানুষ যে প্রতিদিন দগ্ধ হচ্ছে এবং তারা চিকিৎসা নিতে বার্ন ইউনিটে আসছে, এর ফলে বার্ন ইউনিটের ওপর যে বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে, আপনারা কি তা যথাযথভাবে সামাল দিতে পারছেন?

সামন্তলাল সেন:আজ শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি। গতকাল পর্যন্ত বার্ন ইউনিটে রাজনৈতিক সহিংসতায় মোট পোড়া রোগী ভর্তি ছিল ৫৫ জন। গতকালই আরও আটজন ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৬৩। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ১৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছে, যারা সহিংসতার শিকার নয়। তারা বিভিন্নভাবে আগুনে পুড়েছে। অর্থাৎ, ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ২০ জনের বেশি রোগী। সুতরাং, রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে বার্ন ইউনিটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা খুব সৌভাগ্যবান যে, এই বার্ন ইউনিটের ওয়ার্ড বয় থেকে শুরু করে চিকিৎসকেরা পর্যন্ত সবাই খুবই নিবেদিতপ্রাণ। সে জন্যই এ চাপ সামলানো সম্ভব হচ্ছে। সবাই ভীষণ আন্তরিক। আজ শুক্রবার, ছুটির দিন, তবু সবাই কাজ করছেন। পাঁচ-ছয়জন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা নিজে থেকেই যাচ্ছেন। শুক্রবারে কর্মস্থলে যাওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রথম আলো : আন্তরিকতা আছে, এটা বেশ ভালো কথা, কিন্তু পর্যাপ্ত লোকবল কি আছে? চিকিৎসা ও রোগীদের সেবাশুশ্রূষা তো শুধু আন্তরিকতা দিয়ে হয় না, এ জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞানসম্পন্ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোকবল প্রয়োজন। তা কি আছে?

সামন্তলাল সেন : বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬ লাখ ৫৩ হাজার ১১৬ জন মানুষ বিভিন্ন কারণে পুড়ে যায়। তাদের মধ্যে ৬ হাজার ৩৫২ জন মারা যায়। এই মানুষগুলোর চিকিৎসা করার জন্য বাংলাদেশে মোট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন মাত্র ৫২ জন। আমাদের হিসাবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন প্রায় দেড় হাজার। সেদিক থেকে লোকবলের ঘাটতি বিরাট। তবে এখন বিশেষ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ১৮ জন চিকিৎসক ও ৩০ জন নার্সকে এখানে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা দিনরাত কাজ করছেন। এটা হলো একটা দিক, আরেকটা দিক হলো আমাদের এখানে একটা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে রাজশাহী বিভাগের প্রায় ৩০ জন চিকিৎসক অংশ নিচ্ছেন। তাঁরাও এই বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন। এসব মিলিয়ে আমরা বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছি।

প্রথম আলো : আপনি বলতেচাইছেন,জরুরি পরিস্থিতি আপনারা ঠিকমতোই সামাল দিতে পারছেন?

সামন্তলাল সেন : এত বড় সমস্যা ঠিকমতো সামাল দেওয়া শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের একার পক্ষে সম্ভব নয়। দেখুন, একজন পোড়া রোগীর জন্য প্রথম ২৪ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ের মধ্যে যথাযথ চিকিৎসা না পেলে অনেক পোড়া রোগীকেই বাঁচানো সম্ভব হয় না। এখন কেউ একজন পঞ্চগড়ে দগ্ধ হলেন, তাঁকে যদি ঢাকা আনতে হয়, তার আগের ২৪ ঘণ্টা তো তাঁকে সুচিকিৎসা পেতে হবে। সে জন্যই আমি যে প্রশিক্ষণের কথা বললাম, সেটার ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা-উপজেলা হাসপাতালগুলোয় যেসব চিকিৎসক ও নার্স আছেন, তাঁরা যাতে পোড়া রোগী আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম ২৪ ঘণ্টার চিকিৎসাটা সামাল দিতে পারেন, সে লক্ষ্যেই তাঁদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণটা দেওয়া হচ্ছে।

প্রথম আলো : নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের সময় আমরা দেখেছিলাম, এ দেশে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল। তখন উপলব্ধি করা হয়েছিল যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামর্থ্য বাড়ানো প্রয়োজন, প্রয়োজন আরও বার্ন ইউনিট। এমন কথাও শোনা গিয়েছিল, দেশের জেলা হাসপাতালগুলোয় বার্ন ইউনিট করা হবে। তারপর কি কোনো অগ্রগতি হয়েছে?

সামন্তলাল সেন : নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে একটা ভালো বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সেখানে সব সময় ৬০ থেকে ৭০ জন রোগী ভর্তি থাকে, তারা সুচিকিৎসা পায়। এ ছাড়া কুমিল্লায় একটা ভালো বার্ন ইউনিট করা হয়েছে। সিলেটে একটা হয়েছে এবং রংপুরে একটা ভালো বার্ন ইউনিট করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর—এই তিনটি বার্ন ইউনিট বেশ ভালো। সেখানে সব সুবিধাই মোটামুটি আছে। এ ছাড়া ঢাকায়ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে একটা বার্ন ইউনিট আছে, সেখানেও যোগ্যতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন, চিকিৎসার যাবতীয় সুবিধা আছে।

প্রথম আলো : কিন্তু আমরা তো শুনতে পাই, একমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ছাড়া দেশের আর কোনো হাসপাতালে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই।

সামন্তলাল সেন : আগে ছিল না। কিন্তু এখন আছে। সমস্যা হলো, রোগীরা অন্যান্য বার্ন ইউনিটে যেতে চায় না। সংবাদমাধ্যমে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের ইতিবাচক প্রচারের কারণে সব পোড়া রোগী শুধু এখানেই আসতে চায়। আপনাকে একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, আমাদের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসার পর চারজন পোড়া রোগীর অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। আমাদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক আমাকে বললেন, ‘স্যার, এদের এখন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠিয়ে দিই।’ কিন্তু দেখা গেল, ওই চার রোগী সেখানে যেতে চায় না, তারা এখানেই থাকতে চায়। যা-ই হোক, অতীতে বার্ন ইউনিটের ভালো কাজের জন্যই হয়তো এই প্রতিষ্ঠানের একটা ভালো ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে—এটা ভালো কথা। তবে সবাইকে এটাও জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, ঢাকার বাইরেও অন্তত ভালো তিনটি বার্ন ইউনিট এখন কাজ করছে। সেখানে গেলেও পোড়া রোগীরা ভালো চিকিৎসা পেতে পারে। আমার মনে হয়ে, দেশের অন্য বার্ন ইউনিটগুলো রোগীদের আস্থাভাজন হয়ে উঠতে পারে, যদি সংশ্লিষ্ট বার্ন ইউনিটগুলোর চিকিৎসক, ব্যবস্থাপক ও গণমাধ্যম ভূমিকা রাখে। গণমাধ্যমে এটা প্রচার হওয়া উচিত যে অন্য বার্ন ইউনিটগুলোও ভালো। তাহলে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের ওপর থেকে চাপ একটু কমতে পারে।

প্রথম আলো : চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার পোড়া রোগীদের ছবি তোলার জন্য বার্ন ইউনিটে ফটোসাংবাদিকদের বেশ ভিড় দেখা যায়। সম্প্রতি এখানে রোগীদের ছবি তোলা নিয়ে কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার সমালোচনা হচ্ছে। আপনারা ফটোগ্রাফারদের নিয়ন্ত্রণ করেন না কেন?

সামন্তলাল সেন : এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এখানে শুটিং করা হয়েছে, রোগীদের বিশেষ ভঙ্গিমায় ছবি তোলা হয়েছে। আমার মতে, এটা একটা অপরাধজনিত কাজ হয়েছে, আমি এর তীব্র নিন্দা জানাই। আমাদের লোকজন বুঝতে পারেনি যে এসব করা হবে। সমস্যা হলো, সংবাদমাধ্যম থেকে এখানে কেউ ছবি তুলতে এলে তাঁদের নিষেধ করা যায় না। এক প্রতিষ্ঠানের কাউকে ঢুকতে দিলাম, অন্য প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিককে ঢুকতে দিলাম না—এটা তো করা যায় না। আমাদের দিক থেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকবে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ফটোসাংবাদিকদের নিজেদের বিচার-বিবেচনা। দেখুন, ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে অধিকাংশ পোড়া রোগীর মৃত্যুর প্রধান কারণ ইনফেকশন। এ রকম ইনফেকশনের ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের ছবি তোলার জন্য দলে দলে সাংবাদিক ভিড় করলে সেটা তো ভীষণ দুঃখজনক। তা ছাড়া পোড়া-বীভৎস রোগীদের ছবি কেন সংবাদমাধ্যমে দেখাতে হবে—সেটাও আমার বোধগম্য নয়।

প্রথম আলো : দেশের পোড়া রোগীদের চিকিৎসাব্যবস্থা আরও উন্নত এবং আরও পর্যাপ্ত করার জন্য কী করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সামন্তলাল সেন : প্রথমেই দরকার আরও অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকতৈরির উদ্যোগ নেওয়া। যেখানে প্রায় দেড় হাজার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রয়োজন, সেখানে মাত্র ৫২ জনকে দিয়ে কখনোই পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে এবং পোড়া রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেউ পুড়ে গেলে তাকে যাতে ঢাকায় আনতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, অন্তত বিভাগীয় সদর হাসপাতালগুলোয়, তারপর জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত এই চিকিৎসাব্যবস্থা ছড়িয়ে দিতে হবে। পোড়া রোগীদের জন্য দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির লক্ষ্যে একটা স্বতন্ত্র বার্ন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।

সামন্তলাল সেন : আপনাকেওধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন