ধর্ষণ-নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ, মতিঝিল, জাতীয় প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ চলছে
ধর্ষণ-নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগ, মতিঝিল, জাতীয় প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন স্থানে দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ চলছেছবি: রয়টার্স

গত সপ্তাহ থেকে পত্রিকা এবং টেলিভিশনে যে খবরটি সবাইকে মর্মাহত করেছে তা হলো, অনবরত ঘটে যাওয়া ধর্ষণ। সর্বোচ্চ বিচার ফাঁসির দাবি জনমতের। বিগত কয়েক দশক থেকে এই বিকৃত ব্যাধি ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অপরাধীদের ফাঁসি দিলেই কি এ সমস্যার সমাধান হবে? আসলে এর কারণ খুঁজতে হবে। কোনো সমাজে যখন শ্রেণিবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করে, সেখানে অপরাধও সমানভাবে বেড়ে যায়। একটা শ্রেণি রাতারাতি অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে যায়। অনেকে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে সেখানে বিলাসিতায় জীবন যাপন করছে। একা কেউ কোনো অপরাধ করতে পারে না।

অপরাধের পেছনে আর্থিক লোভে কিছু ইন্ধনকারী সহযোগিতা করে। আমাদের সমাজে এই প্রবণতা বহুলাংশে বেড়ে গেছে। এর বড় একটা কারণ, সর্বত্রই অবক্ষয়। আর একটা কারণ, ঠিকমতো অপরাধের বিচার না হওয়া। একটা বিরাট সমস্যা সমাজে বিদ্যমান, সেটা হলো শিশু নির্যাতন। শুধু গ্রামে নয়, শহরেও সমানভাবে শিশু নির্যাতন চলে। আর মাদ্রাসাগুলোর চিত্র আরও ভয়ংকর। শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি চলে পৈশাচিক অত্যাচার। গরিব মা-বাবা দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে শিশুটিকে বাঁচাতে আল্লাহর নামে মাদ্রাসায় ভর্তি করান। আবার পরকালের কিছু আশাও কাজ করে। ছেলে মৌলভি হয়ে বেহেশতে যাবে এবং তাদেরও সঙ্গে নেবে। এ রকম নানা চিন্তা কাজ করে। কিন্তু নির্যাতন এবং অত্যাচারে বেড়ে ওঠা শিশুটি পরবর্তী সময়ে এক ভয়ংকর দানবে পরিণত হয়। সামাজিক মাধ্যমে মাদ্রাসার তথাকথিত হুজুর শিশুদের কীভাবে নির্যাতন করে, তা দেখে সহ্য করা যায় না। শিশুটিকে বলের মতো লাথি মারতে দেখে চোখের পানি আটকাতে পারিনি। আহা রে, গরিবের বুকের মানিককে কোন পিশাচের কাছে জিম্মি রেখেছে। এর কোনো বিচার কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না।

বিজ্ঞাপন
default-image

শহরের অনেক স্কুলেও শিক্ষকেরা ছাত্রদের বেদম পেটান। নামী এক স্কুলের শিক্ষিকাকেও দেখেছি ছাত্রীদের পেটাতে। এ কেমন অসভ্যতা। মানসিক বিকারগ্রস্ত কারও শিক্ষকতার পেশায় আশা উচিত না। কোমলমতি শিশুদের অনেক মমতাসহকারে শিক্ষা দিতে হয়। কঠিন আইন করে শাস্তির বিধান রেখে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ না করলে আগামী প্রজন্মকে বাঁচানো যাবে না।

কিছুদিন আগে দেখলাম, কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে কীভাবে নির্যাতন করে কিশোরদের হত্যা করা হয়। নির্যাতন সহ্য করতে করতে ওরা আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষের এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। মানসিক চিকিৎসা না দিয়ে করা হয় মানসিক এবং শারীরিক নির্যাতন।

বিজ্ঞাপন

এরপর আসি পরিবারে। আজকাল পরিবারের বন্ধন অনেক শিথিল হয়ে পড়েছে। সবার মধ্যে একটা অস্থির ভাব। মা-বাবা কি তাঁদের দায়িত্ব যথাযথ পালন করেন? অনেক পরিবারে মেয়েসন্তানকে একটু শাসনে রাখেন আর ছেলেকে প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলেন। পরবর্তী সময়ে এই ছেলেই বেপরোয়া হয়ে যায়। যে শিশু পরিবারের স্নেহ-মমতা আর ভালোবাসায় বেড়ে ওঠে, সে সন্তান কখনো বিপথে যেতে পারে না। যে শিশু তার চারপাশে এত অনাচার-অনিয়ম-উচ্ছৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠে, সে বড় হয়ে এটাই নিয়ম মনে করে। এখানে মা–বাবা এবং পরিবারের সবার দায়িত্ব রয়েছে। আপনার সন্তানদের আপনি ভালোবাসায় বুকে আগলে রাখুন, সে কখনো অন্যের বুকে ছুরি বসাবে না। অসৎ বাবার সন্তান অসৎই হয়। দামি গাড়ি, দামি ফ্ল্যাট আর ভোগবিলাসিতায় সে অন্য এক মনুষ্যত্বহীন সমাজের বাসিন্দা হয়ে যায়। কে রুখবে তাকে?

আরেকটি ভয়ংকর সমস্যা যুবসমাজকে গ্রাস করে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তা হচ্ছে মাদক। আজ যে সারা দেশে ধর্ষিতাদের চিৎকার-আহাজারি আর ধর্ষকের উল্লাস, তার পেছনে একমাত্র কারণ মাদক। যে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে, সে তো মানুষের পর্যায়ে পড়ে না। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বৃহৎ একটা অংশ মাদকের নেশায় তাণ্ডব চালাচ্ছে। হলে হলে নির্যাতন সেল, সহপাঠীদের হত্যা, মেয়েদের যৌন হয়রানি—সবকিছুর পেছনে রয়েছে মাদকের নেশা। অভিজাত শ্রেণি থেকে শুরু করে বস্তিবাসী—কেউই এই নেশার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। যতই ধর্ষকের ফাঁসি দেওয়া হোক, দিন দিন এই ধর্ষকের বাড়ন্ত থামানো যাবে না।

বিজ্ঞাপন
একাত্তরে যুবকেরাই দেশমাতৃকার মুক্তিতে শত্রুর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন। আরেকবার ঘুরে দাঁড়াও সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে। হ্যাঁ, তোমরাই পারবে বাংলাদেশকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিতে, এ বিশ্বাস করি।

যুবসমাজ আজ ধ্বংসের শেষ সীমায়। জাতি আজ বড় অসহায়। এ দেশ ও সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে মাদকমুক্ত করতে হবে। আসুন দলমত-নির্বিশেষে মাদকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। মাদককে ধ্বংস করলে আমরা সবাই বেঁচে যাব। বেঁচে যাবে অসহায় শিশু-কিশোর এবং যুবসমাজ, যারা আমাদের ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে দেশকে সঠিক নেতৃত্বে এগিয়ে নেবে। মুছে যাবে ঘুষ-দুর্নীতি-সন্ত্রাস আর ধর্ষণের কালিমা। শুভ দিন আসবে।

একাত্তরে যুবকেরাই দেশমাতৃকার মুক্তিতে শত্রুর বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন। আরেকবার ঘুরে দাঁড়াও সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে। হ্যাঁ, তোমরাই পারবে বাংলাদেশকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিতে, এ বিশ্বাস করি।

বড় কষ্ট এই গরিব দেশের। ক্ষুধার জ্বালায় মা তাঁর সন্তান বিক্রি করেন, কিশোরী তার দেহ বিক্রি করে আর বেকারত্বের অভিশাপ থেকে বাঁচতে যুবকেরা নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। এ কলঙ্কের কালিমা তোমাদেরকেই ঘোচাতে হবে। এসো মাকে জড়িয়ে বলি—মা তোমাকে অনেক ভালোবাসি। মায়ের হাসি ছড়িয়ে পড়বে দিগ্‌দিগন্তে। হাসবে বাংলাদেশ। বিশ্ব আবার অবাক তাকিয়ে দেখবে সোনার বাংলার সোনার সন্তানকে—এই প্রত্যাশা রইল।

*কামরুন নেসা হাসান: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির অ্যাডভাইজার

মন্তব্য পড়ুন 0