মুশফিকের ব্যাট নিলাম নিয়ে কিছু কথা

বিজ্ঞাপন
default-image

পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদি ক্রিকেট–বিশ্বে বেশি পরিচিত তাঁর মারকুটে ব্যাটিংয়ের জন্য। টেস্ট ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি ২০১৪ সালে শহীদ আফ্রিদি ফাউন্ডেশন নামে একটি জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

ক্রিকেটার হিসেবে বাংলাদেশে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু এ দেশে তাঁর ফাউন্ডেশন সম্পর্কে কমই জানা ছিল মানুষের। সম্প্রতি তার ফাউন্ডেশনটি আলোচিত হচ্ছে মুশফিকুর রহিমের ব্যাট নিলামে কিনে নিয়ে। এ নিয়ে উঠছে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও।

বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মুশফিক ২০১৩ সালে দেশের পক্ষে টেস্টে প্রথম দুই শত রান করার গৌরব অর্জন করেছিলেন। করোনা আক্রান্তদের সাহায্যার্থে তিনি ডাবল সেঞ্চুরি করা সেই ঐতিহাসিক ব্যাটটি নিলামে তুলেছিলেন। কয়েক দিন আগে সেটি শহীদ আফ্রিদি ফাউন্ডেশন কিনে নিয়েছে প্রায় ১৭ লাখ টাকা দিয়ে। আফ্রিদির এই কাজের প্রশংসা করেছেন দেশের অনেক মানুষ। ভারতের ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকাটিতে এটিকে ‘হার্ট-উইনিং জেশ্চার’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তবে আফ্রিদির এ কাজকে ঘিরে বিভিন্ন প্রশ্নও উঠেছে, বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। মুশফিক তাঁর অতি প্রিয় ব্যাটটি নিলামে তুলেছিলেন করোনায় বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। এমন একটি কাজে কেন এগিয়ে এলেন না দেশের সম্পদশালী ব্যক্তিরা? মানুষের হৃদয় জয় করার তাড়না কেন তাঁরা অনুভব করলেন না? কেন এ কাজে এগিয়ে এলেন শুধু পাকিস্তানের মতো একটি দেশের একজন ক্রিকেটার? মানুষের এসব প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়।

শহীদ আফ্রিদি পাকিস্তানের বলেই এসব প্রশ্ন বেশি উঠছে। বেশি ওঠাও অস্বাভাবিক নয়। রাজনৈতিক শত্রুতা ও তিক্ত ইতিহাস থেকে খেলাকে দূরে রাখার মানসিকতা অনেকের থাকে না। স্নুায়ুযুদ্ধকালে অলিম্পিকের মতো সর্বজনীন প্রতিযোগিতায় আমরা এর প্রতিফলন দেখেছি। আবার এসব থেকে কেউ কেউ ঊর্ধ্বে উঠেছেন। পারমাণবিক বোমাক্রান্ত হয়েও জাপান শুধু খেলায় না, সব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়েছে। তিন–তিনটি বড় যুদ্ধ ও আরও অনেক খণ্ড যুদ্ধ করা চরম বৈরী দেশ পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ভারতের খেলোয়াড়দের রয়েছে নানা সৌহার্দ্যের ইতিহাস। শহীদ আফ্রিদি ফাউন্ডেশনে ওয়েবপেজে এখনো রয়েছে ভারতের ক্রিকেট–বিস্ময় শচীন টেন্ডুলকারের শুভেচ্ছাবাণী।

তবে আমাদের জন্য ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা ভুলে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের ২৭ জুন বঙ্গবন্ধু জুলফিকার আলী ভুট্টোকে দেশে আমন্ত্রণ করে এনেছিলেন। ২৮ জুন নিউইয়র্ক টাইমস–এর সংবাদ অনুসারে তিনি অতীতের সব তিক্ততা ভুলে দুই দেশের মানুষের জন্য আশা ও অগ্রগতির নতুন অধ্যায় সূচনা করার তাগিদও দিয়েছিলেন কিন্তু পাকিস্তানের শাসকেরা সম্পর্কোন্নয়নে আসল কাজটি কখনো করেননি। তাঁরা একাত্তরের বর্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনা করেনি এবং দিল্লি চুক্তি অনুসারে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত পাকিস্তানি সেনাদের বিচার করেনি। বরং এ দেশে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের সময় নানা হস্তক্ষেপমূলক মন্তব্য করে এ সম্পর্কে নতুন প্রতিকূলতা তৈরি করে।

এমন একটি দেশের একজন শহীদ আফ্রিদি বাংলাদেশে একটি মহৎ উদ্যোগে এগিয়ে এলেন আর এ দেশের কেউ এলেন না—এ নিয়ে বাড়তি ক্ষোভ মানুষের থাকা স্বাভাবিক। আমাদের স্মরণ আছে, ধনকুবের বৃদ্ধির দ্রুততায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বের শীর্ষস্থানে, এ দেশে কারও কারও এখন প্রাইভেট হেলিকপ্টার আছে, এ দেশে ব্যাংক থেকে একেকজন গায়েবই করেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। আমরা প্রতিনিয়ত শুনি কানাডা, সিঙ্গাপুর হয়ে যাওয়ার কথা, কোটি কোটি টাকার ফ্র্যাঞ্চাইজের কথা, ক্রিকেটপ্রেমী ধনবানদের কথা, চেতনায় সদা জাগ্রত মানুষের কথা। মানবিক একটি উদ্যোগে সামান্য কয়েক লাখ টাকা নিয়ে কেউ এগিয়ে আসার দায় ও আগ্রহ অনুভব করলেন না কেন তাঁদের কেউ?

কথা আসতে পারে মুশফিকের ব্যাট আফ্রিদি কিনলেই বা দোষ কী? না, আফ্রিদির এখানে কোনো দোষ নেই। আমরা এটাকে আফ্রিদির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বা স্টান্টবাজি বলে ছোট করার চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু মুশফিককে পাঠানো তাঁর ভিডিও বার্তায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর মানবিকতাবোধই। তিনি সেখানে এক জায়গায় বলেছেন, ‘আমরা সবাই মিলে খারাপ একটা সময় পার করছি। এ সময় আমাদের একে অন্যকে সাহায্য করা জরুরি, যাতে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।’

আফ্রিদিকে বরং আমাদের প্রশংসা জানাতে হবে মন না চাইলেও। দোষটা আমাদের নিজেদের। মুশফিকের ব্যাট কেনার নিলামে আফ্রিদির ‘মহানুভবতা’কে পরাজিত করার মতো আসেনি কেউ। আরও শোচনীয় হচ্ছে, যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা এসেছিলেন এটা নিয়ে ঠাট্টা–মশকরা করতে, এটাকে বাধাগ্রস্ত করতে। ভুয়া এসব নিলামকারীর উল্টোপাল্টা ডাক দেখে নিলাম একবার বন্ধ পর্যন্ত করে দিতে হয়েছিল। মুশফিক নিউ এজ পত্রিকাকে বলেছেন, এটি তাঁর জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।

এই নিচু মানসিকতার প্রকাশ আমার আশরাফুলের ব্যাট নিয়ে নিলামের সময়ও দেখেছিলাম। এমনকি ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে সাকিবের ঐতিহাসিক ব্যাটটি নিলামের সময়ও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি দেশে। ব্যাটটি কিনেছেন নিউইয়র্কপ্রবাসী একজন বাংলাদেশি, প্রায় ২০ লাখ টাকায়।

করোনাকালে খেলোয়াড়েরা মানবিকতার নানা উদাহরণ গড়ে তুলছেন বিশ্বব্যাপী। ভারতে এ উদাহরণ আছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় আছে। ইংল্যান্ডে শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রিকেটাররা পর্যন্ত ম্যারাথনের আয়োজন করেছে করোনার ফান্ড তোলার জন্য। এসব উদ্যোগ সফল হয়েছে বা সফল হয় তাদের দেশের মানুষ এগিয়ে এসেছে বলে।

আমাদের দেশে এমন উদাহরণ তৈরি করতে হবে। গত রোববার মাশরাফির ব্রেসলেট ৪২ লাখ টাকায় কিনে নিয়েছে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিএলএফসিএ। এটি এমনি একটি ভালো উদাহরণ। এমন উদাহরণ আরও অনেক তৈরি করতে হবে।

করোনাকালে এ দেশে বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করছেন। ব্র্যাক, গ্রামীণফোন, গণস্বাস্থ্য, বিদ্যানন্দের মতো প্রতিষ্ঠানের কাজ মানুষের প্রশংসাও পেয়েছে। কিন্তু দুর্যোগকালে সমবেতভাবে ছাপিয়ে পড়ার যে জাতীয় উদ্দীপনা আমরা দেখতাম আগে, তার কোথায় যেন একটু অভাব দেখা যাচ্ছে এবার। ক্রিকেটারদের মতো জাতীয় বীর হিসেবে নন্দিত মানুষদের আয়োজনে যদি আমাদের সাড়া না থাকে, সাড়া যদি আসে অন্য দেশ থেকে শুধু, তাহলে এ অভাববোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।

আমরা তাই মুশফিকের শুধু ব্যাট না, চাই মাশরাফির ব্রেসলেটের নিলামের মতো আরও বহু উদাহরণ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন