default-image

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারের দুই দিনের ভারত সফরের মূল উদ্দেশ্য যে পুরোপুরি চীনকেন্দ্রিক, দ্ব্যর্থহীনভাবে দুজনেই তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিলেন। গতকাল মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে বহুপ্রতীক্ষিত ‘টু প্লাস টু’ বৈঠকের আসরে পম্পেও বলেন, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ওপর চীনা হুমকির মোকাবিলায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে।

বহুপ্রতীক্ষিত ‘বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো–অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ‘বেকা’ গতকাল ওই বৈঠকে সই হয়। ভারত–চীন চলমান সীমান্ত উত্তেজনার মধ্যে এই চুক্তি সামরিক দিক থেকে ভারতের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার জবাবও দিয়েছে চীন। বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে চীনের বিভেদ সৃষ্টি করলে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বৈঠক। ভারত সফরের পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী যাবেন শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ায়।

যুক্তরাষ্ট্র–ভারত এবং চীনের এমন পাল্টাপাল্টি সমালোচনার আগে ১৪ অক্টোবর তিন দিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন ই বিগান। ঢাকা সফরেও তিনি চীনের কড়া সমালোচনা করেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে গতকাল ‘টু প্লাস টু’ মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের এটি ছিল তৃতীয় পর্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র ছয় দিন আগে সেই বৈঠকের আসরে ভারতের রাজধানীতে দাঁড়িয়ে সরাসরি চীনের সমালোচনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই আমাদের অনেক কিছু করণীয় আছে। উহানে সৃষ্ট অতিমারির মোকাবিলা করতে হবে। নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির হুমকির মোকাবিলা করতে হবে। আঞ্চলিক শান্তি ও সুস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।’

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আসর ছাড়াও পম্পে চীনকে একহাত নেন ন্যাশনাল ওয়ার মেমোরিয়ালে গিয়ে। গালওয়ানে নিহত ভারতের বীর জওয়ানদের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর পর তিনি বলেন, ‘নিহত সেনাদের আমরা শ্রদ্ধা জানালাম। সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় ভারতের পাশে থাকবে। যেকোনো বিপদের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সহযোগিতা করবে।’

গত জুন মাস থেকে লাদাখে ভারত ও চীনের মধ্যে যে উত্তেজনা বিদ্যমান, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের দুই মন্ত্রী তা নিয়ে পৌনে এক ঘণ্টা ধরে আলোচনা করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে। তাঁরা দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গেও।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই দেশের চার মন্ত্রী যৌথ বিবৃতি প্রচার করেন। তাতে সার্বিক সহযোগিতার বিভিন্ন দিকের উল্লেখ রয়েছে। বৈঠকের পর দুই দেশের সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব সরাসরি চীনের সমালোচনায় বিরত হননি। পম্পেও বলেন, ‘আমাদের নেতারা ও নাগরিকদের স্বচ্ছ দৃষ্টিতে এটাই ধরা পড়ছে যে চীনা কমিউনিস্ট পার্টি গণতন্ত্রের বন্ধু নয়। তারা আইনের শাসনের তোয়াক্কা করে না। স্বচ্ছতা চায় না। ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে মুক্ত, অবাধ ও সমৃদ্ধিশালী দেখতে চায় না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা খুশি যে শুধু চীনা কমিউনিস্ট পার্টিই নয়, সব ধরনের বিপদের মোকাবিলায় ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।’ প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপারও চীনের সমালোচনা করে বলেন, দুই দেশের সহযোগিতার মূল লক্ষ্য আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা এবং ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে মুক্ত রেখে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র বিস্তৃত করা। রাজনাথ সিং এরই রেশ টেনে বলেন, প্রতিরক্ষাক্ষেত্রের এই সহযোগিতা আত্মনির্ভর ভারত গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো–অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্টের লক্ষ্যও প্রধানত চীন। পূর্ব লাদাখের গলওয়ান–সংলগ্ন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এই চুক্তিতে গতি সঞ্চারিত হয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নতমানের নজরদারি উপগ্রহ মারফত পাওয়া যাবতীয় গোয়েন্দা তথ্য ভারত পাবে। এর ফলে উচ্চ প্রযুক্তির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মারফত শত্রুপক্ষকে প্রত্যাঘাত অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করা যাবে। ‘বেকা’ সইয়ের পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং হায়দরাবাদ হাউসে বলেন, এ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার গতি খুবই আশাপ্রদ। তিনি বলেন, দুই দেশ যৌথভাবে কী কী সমরাস্ত্র তৈরি করতে পারে, তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি ও সুস্থিতি রক্ষায় দুই দেশই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করও বলেন, ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এ আলোচনার সিংহভাগজুড়ে ছিল। তিনি বলেন, ‘তিনটি কারণে এই বৈঠক গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, আমরা এক অনিশ্চিত পৃথিবীতে বাস করছি, যার জন্য বেশির ভাগ দেশ পররাষ্ট্রনীতিতে নিরাপত্তাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। আমরা তো দিচ্ছিই। দ্বিতীয় কারণ, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গত দুই দশকে থিতু হয়েছে। দুই দেশই অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। তাই জাতীয় নিরাপত্তার দিকে বেশি নজর দিতে পারছে। তৃতীয়ত, এই সময় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা যখন বেশি প্রয়োজনীয়, তখন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র অনেক ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার ক্ষমতা অর্জন করেছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার ক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত পার্থক্য সৃষ্টি করার যোগ্য।’

যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের মধ্যে ‘টু প্লাস টু’ বৈঠক চলাকালে চীন তার প্রতিক্রিয়া দিতে দেরি করেনি। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন বেজিংয়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বিদেশ সফরে গিয়ে চীনকে আক্রমণ করাটা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে নতুন কিছু নয়। বারবার তিনি এমন করছেন। ওয়েনবিন বলেন, চীনের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। পম্পেও ঠান্ডাযুদ্ধের মানসিকতা থেকে এখনো বেরোতে পারেননি। ওই মানসিকতা থেকে বের হওয়া জরুরি। ভারত সফরের পর পম্পেও যাবেন শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও ইন্দোনেশিয়ায়। তাঁকে সতর্ক করে ওয়েনবিন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশের সঙ্গে চীনের বিভেদ সৃষ্টি করবেন না। তাতে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

মন্তব্য পড়ুন 0