শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা ভাবা যায়

করোনার দুঃসময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত শিক্ষা। এ ক্ষতি টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যাবে না। বিদ্যা যেমন অমূল্য ধন, তেমনি এই ক্ষতিও অমূল্য। শৈশব-কৈশোর হলো বাকি জীবনের ভিত। ভিত দুর্বল হলে বাড়ির মতোই মানুষের ভবিষ্যৎও দুর্বল হয়ে পড়বে, অপূরণীয় ক্ষতি হবে জাতির। অন্তত পাঁচ কোটি জীবন এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গড়ে ওঠার পর্বে এ কেবল সিলেবাসের পড়ার ক্ষতি নয়, পরীক্ষায় বসতে না পারার লোকসান নয়, এদের প্রত্যেকের জীবনে এ সময় প্রতিটি বছর, প্রত্যেক দিনই শরীর-মনের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবনের অভাব নিছক অনলাইনের ক্লাস পূরণ করতে পারে না।

তা ছাড়া যে ক্ষতি গৃহবন্দী জীবনে ঘটছে, তার প্রভাব সময়ের গণ্ডিতে বন্দী থাকবে না, এর ধকল চলবে আজীবন, তা-ও যদি অভিভাবক-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার যথার্থ সংবেদনশীল সক্রিয়তা ওদের সহায়ক হয়। তেমন সচেতনতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, কারণ এ সমাজে সে রকম দূরদর্শী বিচারবোধের অভাব পদে পদেই দেখা যায়। তাই বন্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে বন্দিজীবনের ক্ষত কারও কারও জীবনসঙ্গী হওয়ার শঙ্কা থাকবে।

দৃঢ়তার সঙ্গে বলব, শিশু থেকে তরুণদের কেবল অনলাইন ক্লাসের ওপর বছরেরও বেশি ছেড়ে রাখলে জাতি সুবুদ্ধির পরিচয় দেবে না। এ নিয়ে ভাবতে হবে, মনে করি সময়ক্ষেপণ করার আর সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

করোনার সংক্রমণ চলছে, শীতে বাড়ার কথা থাকলেও করোনা সেভাবে সীমা লঙ্ঘন করেনি। টিকাও আসছে, তবে ধরে নেওয়া ভালো যে সবার জন্য টিকা পাওয়া, ঠিকভাবে দেওয়া সময়সাপেক্ষ হবে। টিকা নিতে জনসচেতনতা বাড়িয়ে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতেও সময়ের প্রয়োজন। এ-ও ভাবা দরকার, শীতের শেষে এ অণুজীবের সংক্রমণ আপনিই কমবে, তেমন ভাবার কোনো বাস্তব কারণ নেই। কারণ, আমাদের দেশে করোনা এসেছিল শীতের পরে বসন্তে, মার্চ মাসে প্রথম সংক্রমণের খবর মেলে। আর চূড়ায় উঠেছিল জুন থেকে আগস্ট মাস, অর্থাৎ গরম ও বর্ষায়। বরং ভাবা ভালো ভবিষ্যতে আরও অনেক দিন কোভিড-১৯ এবং তার অসংখ্য বিকল্প শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আমাদের চলতে হবে। ফলে এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে।

প্রথম কথা হলো, উন্নত বিশ্ব বা শীতপ্রধান দেশের তুলনায় গোড়া থেকে আজতক আমাদের অবস্থা ভালো। দ্বিতীয়ত, এ রোগের প্রকোপ প্রধানত শহরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। দুই ঈদে ব্যাপক হারে মানুষের গ্রামে যাতায়াত, জনসমাগম তৈরি বা মেলামেশা সত্ত্বেও সংক্রমণ বিস্তারের তেমন কোনো খবর আসেনি। পরীক্ষা না করার বা কম হওয়ার যুক্তিও ধোপে টিকবে না, কারণ করোনাসদৃশ রোগে মৃত্যুর যেসব খবর পাওয়া যায়, তা হিসাবে ধরলেও আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু নয়। তৃতীয়ত, যে কারণেই হোক উপমহাদেশে সংক্রমণের তুলনায় মৃত্যুহার কখনোই ১ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে ওঠেনি, যদিও দেশে অনেক রোগে মৃত্যুহার এর চেয়ে বেশি, বার্ষিক প্রাণহানির সংখ্যাও বেশি। চতুর্থত, এখন চিকিৎসা, ওষুধ এবং সচেতনতা তিনটিই প্রথম পর্যায়ের তুলনায় অনেক ভালো।

এমনিতেই বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় সারা বিশ্বে এগিয়ে আছে, করোনার প্রাথমিক দোলাচল ও দুর্নীতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে। মনে করার কারণ আছে যে এখন মহামারি সামলানোর সক্ষমতা আমাদের বেশ ভালো।

এমনিতেই বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় সারা বিশ্বে এগিয়ে আছে, করোনার প্রাথমিক দোলাচল ও দুর্নীতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেছে। মনে করার কারণ আছে যে এখন মহামারি সামলানোর সক্ষমতা আমাদের বেশ ভালো। এ-ও বলা ভালো, কিছু আপসের কৌশল নিয়ে আপত্তি থাকলেও দুঃসময়ে সাহসী নেতৃত্বের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ওপর ভরসা রাখা যায়। ওপরের কথাগুলো করোনাকে হালকাভাবে নেওয়ার জন্য বলছি না, স্বাস্থ্যবিধি মানার বাধ্যবাধকতা ও কঠোরতা নিয়ে কোনো রকম শৈথিল্যের সুপারিশও করছি না। কেবল সবিনয়ে বলব, ঝুঁকির তুলনায় ক্ষতির পরিমাপ করে দেখা জরুরি। পাঁচ কোটি শিশু-কিশোর ও তরুণের জীবন অর্থাৎ ভবিষ্যৎ জীবনের গঠন থামিয়ে রেখে জীবন বাঁচানোতে সবটা গুরুত্ব দিয়ে আমরা ভুল করছি কি না, ভেবে দেখার সময় এসেছে।

ভেবে দেখার জন্য আমি কয়েকটি প্রস্তাব দিতে চাই। প্রথমেই বলব, সংক্রমণের ভিত্তিতে সারা দেশের ম্যাপিং হওয়া প্রয়োজন। যেসব অঞ্চলে বা জেলায় গত তিন সপ্তাহে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে, সেগুলো স্কুল খোলার জন্য চিহ্নিত করা যায়, এটিই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ঘোষণার মান–হার। দ্বিতীয়ত, দেশে শিক্ষাব্যবস্থায় মূল ত্রিধারা ছাড়াও অর্থনৈতিক কারণেও বৈষম্য বিদ্যমান। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গ্রাম–জীবনের মতোই শহরের তুলনায় সুবিধাবঞ্চিত। পরীক্ষামূলক খোলার জন্য প্রথমে করোনা সংক্রমণে সুবিধাজনক অবস্থান ও শিক্ষাসহ সব দিকের তুলনায় সুবিধাবঞ্চিত গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা ভাবা যাবে বলেই আমার ধারণা।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন হলো, বিপুল ছাত্র ও তুলনায় স্বল্প শিক্ষকের বাস্তবতায় কীভাবে স্বাস্থ্যবিধির তিন আবশ্যিক শর্তের অন্যতম ‘দূরত্ব রক্ষা’ মানা যাবে? আমি বলব, আমরা সাহসীও হব, সৃজনশীলও হব। প্রথমে আমরা স্কুলের কথা ভাবি। প্রতিটি স্কুলে চার পর্বে ক্লাস হতে পারে, এ জন্য শিক্ষার্থীদের চার দলে ভাগ করা হবে। সপ্তাহের ৬ দিনে (শুক্রবার ছাড়া) ক্লাস হবে প্রতিদিন দুই পর্বে। যেহেতু স্কুলে পানি ছাড়া কিছুই খাবে না শিক্ষার্থীরা, তাই একটি পর্ব তিন ঘণ্টা স্থায়ী হবে। পানি শিক্ষার্থী নিজেই আনবে, তবে স্কুলও ব্যবস্থা রাখবে শিক্ষকদের জন্য ও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে।

প্রথম পর্ব হতে পারে শীতকালের জন্য (মার্চ পর্যন্ত) সকাল ৮টা ৩০ থেকে ১১টা ৩০। দ্বিতীয় পর্ব দুপুর ১২টা থেকে ৩টা। উভয় পর্বের শিশুরা ভরপেট ভাত খেয়েই স্কুলে আসবে, সঙ্গে আনবে খাওয়ার পানি। বর্তমান বাংলাদেশে ভাত জোটে না এমন পরিবার খুবই কম বলেই আমার ধারণা। আঞ্চলিক প্রশাসনের সহযোগিতায় সেসব পরিবার আগেই চিহ্নিত করা দরকার, যাতে তাদের সরকারি ত্রাণ দেওয়া সম্ভব হয়। শিক্ষা গ্রহণ বা শিক্ষার্থীর আহার দেওয়ার জন্য বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের মতো বেসরকারি উদ্যোগকেও কাজে লাগাতে হবে।

তৃতীয়ত, এই সুবাদে শিক্ষিত তরুণদের নিয়ে জাতি গঠনে জরুরি দায়িত্ব নেওয়ার ব্রিগেড বা শিক্ষাকর্মীর ব্রতী দল তৈরি করা যায়। এরা স্কুলের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষকদের সহায়তা দেবে। জানি, আমাদের মানুষ দুর্নীতি করে, ফাঁকিও দেয়, কিন্তু আবার তেমনভাবে মানবিক কাজে ডাক দিলে, তেমন আত্মত্যাগের সুযোগ পেলে তারা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে, জান বাজি রেখে কাজ করতে দ্বিধা করে না এমন দৃষ্টান্ত প্রচুর। ভাষা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, আইলা-মঙ্গা, জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি সব ক্ষেত্রেই এমন বহু নজির তরুণেরা স্থাপন করেছে। আজ দুর্যোগপূর্ণ সময়ে সুস্থ সবল শিক্ষিত তরুণদের অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। কেননা আমরা পাঁচ কোটি শিশু-তরুণের জীবনের মূল্যবান সময়কে বন্ধ্যা যেতে দিতে পারি না।

করোনানিয়ন্ত্রিত আছে এমন গ্রামাঞ্চলে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ যদি সফল হয়, তবে ধাপে ধাপে শহরেও অর্থাৎ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলাও সম্ভব হবে।

শুরুর কথাটা দিয়ে শেষ করতে চাই। শিক্ষা খাত সত্যিই যেন উপেক্ষিতও হয়েছে। করোনার ধকল সামলানোর জন্য শিল্প ও কৃষি খাতে প্রণোদনা দেওয়া হলেও শিক্ষায় বেসরকারি খাতের মুষ্টিমেয় কিছু স্কুল ব্যতীত সাধারণ বাংলা মাধ্যম স্কুল-কলেজের যে বেহাল অবস্থা হয়েছে, তা যেন বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। একটি তথ্যে জানা যাচ্ছে, গত ১০ মাসে সারা দেশে প্রায় আড়াই হাজার বেসরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ শিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা উপেক্ষা করার মতো নয়। এই দুঃসময়ে বেসরকারি স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক সম্পূর্ণ বেকার হয়েছেন, অধিকাংশ হ্রাসকৃত হারে বেতন পাচ্ছেন এবং পরিবার নিয়ে কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন। মনে রাখতে হবে যা অমূল্য, তা আদতে বহু মূল্যবান, তাকে রক্ষা করাও জাতীয় কর্তব্য।

  • আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

মন্তব্য করুন