ঢাকার দিয়াবাড়িতে আখ বিক্রির হাট।
ঢাকার দিয়াবাড়িতে আখ বিক্রির হাট। প্রথম আলো ফাইল ফটো

হরিয়ান রেলস্টেশনের পাশে রাজশাহী চিনিকল। তখন বিকেল। তাতেই সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা। মাঠে কিশোরেরা ফুটবল খেলছে। ফটক দিয়ে প্রবেশের পর ছবি তুলতেই স্থানীয় এক ব্যক্তির (৩৫) সঙ্গে দেখা। গল্পচ্ছলে বললেন, চিনিকলের লোকেরা সারা দিন আড্ডা দেন। মিল চালু থাকার কথা সকাল ৭টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত। কিন্তু চলে ২/৩ ঘণ্টা। একেকজন ১০-২০ বছর ধরে আছেন, বদলি নাই। তাঁরা এখন মালিক সেজে গেছেন।

মিলের সুনসান নীরবতা মেনে সোজা রাস্তা ধরে ব্যবস্থাপকের কোয়ার্টার। যেতে যেতে দেখা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিরাপত্তা প্রহরীর (৬৫)। তিনি ২ বছর আগে রাজশাহী জুট মিলে প্রহরী ছিলেন। সেটি বন্ধ হওয়ার পর এখানে কাজ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘৫ জনের কাজ ১৫ জন দেখায়। মিলের উন্নতির বিল তুলে নেয়, কাজ করে না। আগের ম্যানেজার মিলের নারকেল-কামরাঙা পর্যন্ত বাজারে বিক্রি করেছেন। মিলের জমিতে দর্শনার মতো অন্য ফ্যাক্টরি দেওয়া গেলে মিল লাভবান হতো।’

কথা শেষ করে সোজা রাস্তা ধরে হাঁটছি। মাগরিবের সমাহিত ভাব চলে এসেছে। পুকুরে মাছের খেলা দেখছেন ব্যবস্থাপক আবদুস সেলিম। চিনিকলগুলোর লোকসানের কারণ হিসেবে বললেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, উপজাতগুলো ব্যবহারের উদ্যোগ বাস্তবায়িত না করা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা।

২.

চিনিকলে বিক্রি হয়নি ৮ কোটি টাকার চিনি, বেতন বন্ধ ৪ মাস। এটাই হলো চিনিকল সংবাদ। চিনিকলগুলো সাধারণত উত্তরবঙ্গে অবস্থিত, রাষ্ট্রের অনুন্নত অংশে। অথচ কাঁচামালভিত্তিক চিনিকলগুলোর সংখ্যা তো বাড়ছেই। মানে তারা লাভ করছে। তাহলে চিনি অবিক্রীত থাকে কেন? চিনিকলগুলো লাভে নেই কেন? পাকিস্তান আমলে লাভে ছিল কেমন করে? প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জিতত কেমন করে?

বিজ্ঞাপন
default-image

‘আখচাষ ও রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিশিল্প: সংকট কেন?’ শিরোনামে সর্বজনকথা একটি সংখ্যায় মোশাহিদা সুলতানা ও কল্লোল মোস্তফা কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। চিনি আমদানি উদারীকরণ, আখের বাজারে নিয়ন্ত্রণহীনতা, সরবরাহে ঘাটতি, চাষের জমি হ্রাস ও কৃষকের অনীহা, ফলন কম হওয়া, চিনি আহরণের অতি নিম্নহার, ব্যবস্থাপনাগত সংকট, পরিবহনের সংকট, কারখানার প্রসেস লস, টেকনিক্যাল পারফরম্যান্সের সমস্যা, ঋণের সুদ পরিশোধের দায় ও চিনি বিক্রির যথাযথ উদ্যোগের অপ্রতুলতা প্রভৃতি।

মানে এখানে সংকট কয়েক স্তরের। চাষি পর্যায়ের সংকট তার একটি। চাষিকে নগদে মূল্য পরিশোধ করা, উচ্চফলনশীল ও অধিক চিনিযুক্ত বালাইপ্রতিরোধী জাতের আখের আবাদ বাড়ানো, সময়মতো কৃষি উপকরণ ও জমি ইজারা না দিয়ে নিজ ব্যবস্থাপনায় চাষের চেষ্টা করা। চিনি উৎপাদনের মোট খরচের ৪০ ভাগ খরচ হয় কাঁচামাল বাবদ, যা প্রতি কেজিতে খরচ হিসাবে যোগ হয়। চিনি কম আহরিত হওয়ার পেছনে আখে চিনির হার, খেত থেকে পরিবহনের সমস্যা ও কারখানায় তুলনামূলক কম চিনি আহরিত হওয়া দায়ী। ইক্ষু গবেষণা সংস্থার কথা হলো, চাষিরা কোন জাতের আখ চাষ করবেন, তা দেখভালের দায়িত্ব মিল কর্তৃপক্ষের।

চোখের সামনে দর্শনার কেরু চিনিকল লাভজনকভাবে চলছে। এটাই এখন উদাহরণ। রাজশাহী চিনিকলের ব্যবস্থাপকও তেমনটি বললেন, ‘২০১৫ সালে ঠাকুরগাঁও ও নর্থবেঙ্গল চিনিকলের জন্য যথাক্রমে ৪২৪ ও ৩২৫ কোটি টাকা ডিস্টিলারি, অ্যালকোহল, ভিনেগার, বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু এখন দীর্ঘসূত্রতার জন্য ২৮০০ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে।’ উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলে ৭৩.৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে কো-জেনারেশন পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুগার রিফাইনারি স্থাপনের প্রকল্পটি নেওয়া হয়। বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত ৪০ হাজার মেট্রিক টন রিফাইন চিনি ও ৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে মিলের আয় বৃদ্ধি হতো ও চিনির উৎপাদন খরচ কমে আসত। যেমন দর্শনা চিনিকল ২০১২-১৩ সালে চিনি উৎপাদন করে ৩৫.২৭ কোটি টাকা লোকসান করলেও ঝোলাগুড় থেকে অ্যালকোহল উৎপাদন করে ৫৭.৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। অন্যান্য চিনিকলগুলোতে ডিস্টিলারি স্থাপন করা হলে ঝোলাগুড় থেকে অ্যালকোহল, ভিনেগার, মোসালেজ কুকিজ ও ছোবড়া ব্যবহার করে ৫০-১০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

মাড়াই মৌসুম ছাড়া সারা বছর শ্রমিকেরা বসে থাকেন। এতে শ্রমের সর্বোচ্চ ব্যবহার হয় না। কিন্তু মজুরি ঠিকই দিতে হয়। চিনিকল লাভজনক হওয়ার প্রধান শর্ত বছরে অন্তত ১২০ দিন মাড়াই মৌসুম হওয়া। কিন্তু ৪০-৮০ দিনের বেশি তা হয় না। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের মোট ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৫টির নিজস্ব বড় বাণিজ্যিক খামার আছে। সেগুলো হলো কেরু, সেতাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, নর্থবেঙ্গল ও রংপুর চিনিকল। এগুলোতে সারা বছর কাজ চালানোর জন্য আখের পাশাপাশি বিটের আবাদ করা যায়। এতেও উৎপাদন খরচ কমে।

বিজ্ঞাপন
বিদ্যুতের ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, সময়ের অপচয় প্রভৃতি কারিগরি মানদণ্ডে ভারতের তুলনায় যথেষ্ট পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রতি টন আখ মাড়াইতে ভারতের সময় অপচয় ৮%, রংপুরের ১১.৮৯% ও জয়পুরহাটের ১১.৪৯%।

আখ থেকে চিনি কতটুকু আহরণ হবে, তা নির্ভর করে যান্ত্রিক সক্ষমতার ওপর। যেমন ছোবড়ায় চিনি থেকে যাওয়া। রস ছাঁকুনির পর্যায়ের লসটুকু প্রেসমাডে চলে যায়। চিনি ক্রিস্টালে পরিণত করার বেলায় কিছু ঝোলাগুড়ে চলে যাওয়া আর কিছু বাষ্পের সময় নষ্ট হয়। বাংলাদেশে এই হার ৩ থেকে ৩.৫ শতাংশ। যেখানে ভারতে লসের হার ১.৯২৫ শতাংশ। আর দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশে এই লসকে বাড়িয়ে দেখানো হয় আরও।

বিদ্যুতের ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, সময়ের অপচয় প্রভৃতি কারিগরি মানদণ্ডে ভারতের তুলনায় যথেষ্ট পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রতি টন আখ মাড়াইতে ভারতের সময় অপচয় ৮%, রংপুরের ১১.৮৯% ও জয়পুরহাটের ১১.৪৯%। বিদ্যুৎ অপচয় (কিলোওয়াট) ভারতের ২১, রংপুরের ২৩.৭৫ ও জয়পুরহাটের ১৬.১১ আর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ টনপ্রতি ভারতে ৩০ রুপি, রংপুরে ২৭৯.০৫ টাকা ও জয়পুরহাটের ২৫০.৩১ টাকা।

সাধারণত একটি চিনিকলের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ২০ বছর। গত শতাব্দীর ৩০-৬০-এর দশকে স্থাপিত চিনিকলগুলো আয়ুষ্কাল শেষ হয়েছে ২০-৪০ বছর আগেই। বয়লার, টার্বো, অল্টারনেটর, মিল টারবাইন, কেইন প্রিপারেশন ডিভাইস, মিলিং প্ল্যান্ট, সেন্ট্রিফিউগাল মেশিন ও ফিলটার স্টেশন মেরামত না করে এই লস কীভাবে ঠেকানো যাবে। এ ছাড়া চিনির কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচের ৫ ভাগের ১ ভাগ হচ্ছে ঋণের সুদ। আর খুচরা যন্ত্রাংশ ক্রয়, উপজাত বিক্রি, কমিশন-বাণিজ্য, ওজনে কারচুপি ও যানবাহন পরিচালনার দুর্নীতি রোধ করা গেলে চিনিকলগুলো নতুন পথ দেখাবে। শিল্পহীন উত্তরবঙ্গে শিল্প বলতে থাকা চিনিকল কয়টাই তো। কিন্তু আমরা কি তা চাই?

নাহিদ হাসান: রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি।

nahidknowledge@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0