বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কলকারখানায় কিংবা কুটিরশিল্পে হাজারো শিশুকে অক্লান্ত শ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে হয়। আমাদের দেশে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের শ্রমিক হিসেবে এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাগানো বেআইনি। তবুও অনেক কাজে শিশুশ্রমিক দেখা যায়। অনেকেই আসে ‘কিছু খেয়ে–পরে বাঁচতে হবে’ বলে। এভাবে শিশুশ্রম কত শিশুর নিষ্পাপ শৈশব কেড়ে নিয়েছে। এর দায় কার? দুই দশক ধরে শিশুশ্রম বেড়েই চলছে। বিশ্বজুড়ে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ২০২০ সালে ১৬ কোটি অতিক্রম করেছে। সরকারি হিসাব মতে, আমাদের দেশে ৩৪ লাখ শিশুশ্রমে ও ১২ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিযুক্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে সব রকম শিশুশ্রম বন্ধ করার তাগিদ আছে। কিন্তু আদৌ কার্যকর হবে কি?

কদিন আগের কথা। ‘একটা ময়ূর নিয়ে যান, একটা প্লেন নিয়ে যান’—এভাবে জয়পুরহাট রেলওয়ে স্টেশনের উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে চিল্লিয়ে গ্যাসের বেলুন বিক্রি করছে এক শিশু। ওই শিশু বেলুন বিক্রেতার নাম সোহেল। তার বাড়ি জয়পুরহাট জেলা সদরের টুকুর মোড়ে। সে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। পরিবারে দুই ভাই আর মা–বাবা। তার বাবা চা–বিক্রেতা। ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়া তার জন্মগতভাবে পরিবার থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা। কিন্তু তারপরও সে ছোট্ট ছেলে। সে থাকার কথা তার পাড়া কিংবা মহল্লার খেলার সাথীদের সঙ্গে। হই-হুল্লোড় আর উল্লাসে সারা বাড়ি দৌড়ে বেড়ানোর কথা। ব্যাগে বই, খাতা ও কলম নিয়ে স্কুলের শ্রেণিকক্ষে থাকার কথা। বিশ্রামরত অবস্থায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, দিনে কত টাকার বেলুন বিক্রি করো? সে আমার প্রশ্নের উত্তরে বলে, পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকার বেলুন বিক্রি করি। তার কথা শুনে একটু আশ্চর্য হয়ে বললাম এত টাকা প্রতিদিন উপার্জন করো, তাহলে খুব সুখেই আছো। সে হঠাৎ চুপ করে থেকে বলে, আমি প্রতিদিন ৫০ টাকার মতো পাই আবার কোনো দিন পাই না। কারণ জানাতে গিয়ে বলে, অন্যের বেলুন সে বিক্রি করে দেয়। তার বিনিময়ে সে ওই ৫০ টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালায়। ঈদের স্কুল ছুটির কারণে সে প্রতিদিন বেলুন বিক্রি করে টাকা জমিয়ে নিজের জন্য নতুন পোশাক আর মায়ের জন্য শাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখছে।

শিশু মানেই পরিবারের আদরের সাত রাজার মানিক–রতন। শিশু মানেই মা–বাবার ভবিষ্যৎ আলোর বাতি। দেশের সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই মানবসম্পদ আজ কোন পথে? স্বাধীনতার ৫১ বছরে আমরা কি শিশুশ্রম বন্ধ করতে পেরেছি? ছিন্নমূল পথহারা শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পেরেছি? উত্তর হচ্ছে, না, পারিনি। বড় বড় দালানকোঠা নির্মাণ হয়েছে, কোটিপতিদের সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠেছে, কিন্তু সেই গ্যাসের বেলুন বিক্রি করা শিশুশ্রমিক সোহেলের মতো হাজারো শ্রমিক তাদের স্বপ্নগুলো আকাশে উড়িয়ে বেড়াচ্ছে। দিনের পর দিন তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে তাদের ঈদ নেই, উৎসবও নেই।

দেশের শিশুশ্রম কমিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন সুনির্দিষ্টভাবে আইনের প্রয়োগ ও কঠোর শাস্তির বিধান। ১৯৯০ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে (১৯৮৯) স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী প্রথম রাষ্ট্রগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন করা হয় বটে, কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। কারণ স্বল্প মজুরিতে অধিক মুনাফা পাওয়ার আশায় আমাদের দেশের পুঁজিবাদীরা শিশুশ্রম বন্ধে অনীহা প্রকাশ করে। যার ফলে শিশুশ্রম জিইয়ে রাখে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অসচেতনতা ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতায় শিশুদের শ্রমে ঠেলে দিয়ে দেশ কখনো উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে না। শিশুশ্রম বন্ধে রাষ্ট্রকে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

রাশেদুজ্জামান রাশেদ
সংবাদকর্মী
[email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন