default-image
>কাজী কামরুজ্জামান। মুক্তিযোদ্ধা ও অধ্যাপক। জাপান–কোরিয়া–ফিলিপাইন–ইন্দোনেশিয়া–শ্রিলঙ্কা–নেপাল ও বাংলাদেশ মিলে গঠিত এশিয়া–প্যাসিফিক অ্যালায়েন্স ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট সংস্থার বর্তমান সভাপতি। দেশে শিশুশল্য চিকিৎসার প্রতিষ্ঠাকারী। তাঁর নামে বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক সোসাইটি প্রতিবছর গোল্ডমেডেল পুরস্কার দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্ট, ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ, ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল নার্সিং কলেজ, ৫০০ শয্যার পাবনা কমিউনিটি হাসপাতাল। বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ চিহ্নিত ও প্রতিকারে অগ্রণী এবং হার্ভার্ড স্কুল অব পাবলিক হেলথসহ বেশ কটি পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণাকাজে জড়িত। করোনা মাহামারি মোকাবিলায় সমন্বয়হীনতা দূর করায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কাজী কামরুজ্জামান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফ

প্রথম আলো: মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই আপনি জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন। আর্সেনিক দুর্যোগ, বন্যা মোকাবিলায় নেতৃত্ব পর্যায়ে কাজ করেছেন। এই সময়ে হাসপাতাল খোলা রেখে কাজ করছেন। বর্তমান করোনা মোকাবিলাকে কীভাবে দেখছেন?
কাজী কামরুজ্জামান: প্রথমত এটা একটা জাতীয় দুর্যোগ। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, তা নিয়ে আমাদের সাফল্যজনক মডেল আছে। আমরা আইলা–সিডর–বন্যা মোকাবিলায় সফল। আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ আছে। এই আইনের শুরুতে বলা আছে, ‘যেহেতু দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব সহনীয় পর্যায়ে আনিয়া সার্বিক দুর্যোগ লাঘব করা, দুর্যোগ–পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন কর্মসূচি অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা, দুর্দশাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রদান করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার কার্যক্রমকে সমন্বিত, লক্ষ্যভিত্তিক ও শক্তিশালী করাসহ দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কাঠামো গড়িয়া তুলিবার নিমিত্ত বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়।’ সে অনুযায়ী কি দর্যোগ মোকাবিলাকাঠামো কাজ করছে? আইনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের শুরুতে বলা আছে, ‘(১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তিবর্গকে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নীতিমালা ও পরিকল্পনা প্রণয়নে এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদানের নিমিত্ত জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাউন্সিল নামে একটি কাউন্সিল থাকিবে।’ এই কাউন্সিলে প্রধানমন্ত্রীসহ প্রায় সব মন্ত্রণালয়, সব বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ অনেকেই থাকবেন। তাঁদের কাজ হবে, ‘(‌ক) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নীতিমালা ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান’ এবং তার বাস্তবায়নে সম্ভব যা কিছু তা করা। আর এটা হবে ‘বহু সংগঠনভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি’। এর অধীনে সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে জেলা–উপজেলা–পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি’ এবং ‘দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় গ্রুপ’ গঠনের কথা বলা আছে। এ ধরনের কমিটি গঠিত থাকবারও কথা। অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সমন্বিতভাবে কাজের পদ্ধতি তৈরি করা আছে। কিন্তু সেটার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। এই আইন অনুযায়ী কাজ করা গেলে করোনাভাইরাসজনিত দুর্যোগে আমরা আরও কার্যকরভাবে মানুষকে সাহায্য করতে পারব।

প্রথম আলো: বাংলাদেশে করোনা মোকাবিলার ধরন কি কোনো মডেল অনুসরণ করছে?
কাজী কামরুজ্জামান: মডেল পরের কথা, সমন্বয়হীনতার কারণে মানুষের বিপদ বাড়ছে। প্রথমে আইইডিসিআর মনে করেছে তারা একাই পারবে। কিন্তু সেটা হয়নি। বাস্তবক্ষেত্রে, মাঠপর্যায়ে যাঁরা চিকিৎসা দিচ্ছেন, তাঁদের দরকার পড়ছে। তাঁদের ওপরই চাপ বেশি। চিকিৎসকদেরও একটা বক্তব্য আছে। করোনা মোকাবিলার কাজে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জড়িত। তাঁদের মধ্যে সমন্বয় ততটা দেখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক রকম বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি বলছেন আরেক রকম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যোগাযোগ সব বন্ধ করে দিলেন, শিল্পমন্ত্রী হাঁটাপথে পোশাকশ্রমিকদের ঢাকায় আনা ঠেকালেন না। আবার তাঁরা হাঁটাপথে ফিরে যাচ্ছেন। সরকার গুজব ছড়ানোর জন্য অনেককে গ্রেপ্তার করে, কিন্তু পোশাকশিল্পের মালিকেরা যে গুজবের কায়দায় এত লোককে ডেকে আনলেন, তাতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি যে বহুগুণে বেড়ে গেল, তার জন্য কতজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে? দৃষ্টান্ত হিসেবে তাঁদের পরিচয় প্রকাশিত হবে না কেন? সরকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তার জন্যই সমন্বয় দরকার। অসুখের পাশাপাশি খাদ্য ও জীবনযাত্রার যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা সমন্বয় দাবি করে। প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই সমন্বয় জরুরি।

প্রথম আলো: ত্রাণের বেলায়ও সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। লকডাউন করা হলে কি ত্রাণের দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায় না?
কাজী কামরুজ্জামান: এখন ভিক্ষার কায়দায় ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। ১০ টাকা কেজিতে চাল দেওয়া হচ্ছে। ওই ১০ টাকা মানুষের হাতে দিতে হবে। অর্মত্য সেনও বলেছেন, নগদ টাকায় সহায়তা দেওয়া বেশি কাজের। জাতিসংঘও ত্রাণের অন্তত ২৫ শতাংশ টাকায় দিয়ে থাকে। রোহিঙ্গাদের বেলায়ও তা–ই হয়েছে। তাতে চাহিদা ও সরবরাহে ভারসাম্য থাকে, তৃণমূলের উৎপাদকদের আয় চালু থাকে। সরকারের কাছে, এনজিওদের কাছে, স্থানীয় সরকারে, উপজেলায়, ইউনিয়নে সবার কাছে তালিকা আছে, ভিজিএফ কার্ড দেওয়া আছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিতেও সরকারের সব প্রতিনিধি, এনজিও ও সিভিল সমাজের প্রতিনিধিদের থাকার কথা। এই তালিকা সমন্বয় এবং নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ত্রাণকাজ ফলপ্রসূ হতো, যা স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে তৃণমূলে করতে হবে। জীবনযাত্রাকে যুদ্ধকালীন অবস্থার মতো রেশনিংয়ের মাধ্যমে চালাতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে সরকারের ২৬টি প্রশাসনের কর্মকর্তা আছেন, তাঁরা স্থানীয় সরকার ও সিভিল সমাজকে নিয়ে আরও ভালোভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবেন।

প্রথম আলো: ভাইরাস মোকাবিলা ও ত্রাণকাজে দ্বিধা ও সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে।
কাজী কামরুজ্জামান: সবকিছু ভীষণভাবে কেন্দ্রীভূত। তাই যখন দুর্যোগ দেখা যায়, তখন প্রথম দিকে অচলাবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। এই অপ্রস্তুতির জন্য সমস্যা মহিরুহ আকার ধারণ করে। আমাদের হাসপাতালগুলো আগে স্বায়ত্তশাসিত ছিল। ভারত–পাকিস্তানে সেভাবেই চলে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার জবাবদিহি যদি স্থানীয়ভাবে হতো, তাহলে তারা নিজেরা প্রস্তুতি নিতে পারত, মানুষও আরও বেশি সেবা পেত। আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো অনেক ভালো। দারুণ সুন্দর। ৬০ ভাগ রোগী সরকারি চিকিৎসকের কাছে যায়। কমিউনিটি ক্লিনিক তৃণমূল পর্যায়ে আছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিটি বাড়ির দরজায় যেতে পারেন। কিন্তু বিকেন্দ্রীকরণ ও সুযোগ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে এগুলোর কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলে না। এই দুর্যোগের পরে বিষয়টি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে, যাতে পরেরবার আরও ভালোভাবে তৈরি থাকতে পারি।

প্রথম আলো: ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ফ্রন্টলাইনে আছেন চিকিৎসকেরা। অনেকে রোগী ফিরিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগও উঠছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
কাজী কামরুজ্জামান: চিকিৎসকেরা নিজেরা অসুস্থ হয়েও কাজ করছেন। গত বছরের ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে গিয়ে ২৮ জন চিকিৎসক ও নার্স মারা গেছেন। এবারও চিকিৎসকেরা আক্রান্ত হয়েছেন। সুস্থ হয়ে ফিরে আবার রোগী দেখছেন। এমন উদাহরণ সামনে রাখা দরকার। শুরুতে আমরা পিপিই পাইনি, নিজেরা জোগাড় করে সেবা চালু রেখেছি। সরকারি–বেসরকারি দুই রকম হাসপাতালই এখন খোলা আছে। বেসরকারি পর্যায়ে অনেক জায়গায় অন্তত জরুরি বিভাগ খোলা আছে। আমাদের হাসপাতালে গত কয়েক দিনেও কয়েক শ রোগী ভর্তি হয়েছে বিভিন্ন অসুখ নিয়ে। গতকালও আটটি অপারেশন হয়েছে। চিকিৎসকদের তাই একাধারে সমালোচনা করা ঠিক নয়। তাঁদের ধমক না দিয়ে বরং উৎসাহিত করা দরকার। চিকিৎসকদের মনোবল ও অনুপ্রেরণা ধরে রাখা এখন খুবই জরুরি। অনেক চিকিৎসক রাতের রাস্তায় অনিরাপদে বাড়ি ফিরতে ভয় পাচ্ছেন, কোনো যানবাহন নেই। তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া দরকার।

প্রথম আলো: আমরা কতটা আশাবাদী হতে পারি?
কাজী কামরুজ্জামান: আশাবাদ মানে হচ্ছে সঠিক পরিকল্পনা এবং তার আন্তরিক বাস্তবায়ন। করোনায় লাখো মানুষ আক্রান্ত হলেও মারা যাচ্ছে কয়েক হাজার। মানুষ তার নিজস্ব ইমিউনিটি সিস্টেম নিয়ে বাঁচতে পারে। এটাই আশার কথা। যত দিন প্রতিষেধক আবিষ্কৃত না হচ্ছে, তত দিন ভয় থাকবেই। সেই ভয় কাটানোর জন্যই সরকার, বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজের সমন্বিতভাবে কাজের পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে এখনই। সব মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যের ও পরীক্ষার সব বিভাগের লোকবলকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো যায়, যাতে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয় ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনা না দেয় এবং নাগরিক সমাজের শক্তিকে সরকারের সাহায্য জনগণের সাহায্যে নিয়োজিত করা যায়।

প্রথম আলো: ভাইরাসের সমস্যাটা কত দিন থাকতে পারে? আমরা কি শুধু এক দেশে মোকাবিলা করে নিরাপদ থাকতে পারব?
কাজী কামরুজ্জামান: ধরুন আমরা খুব ভালোভাবে করোনা মোকাবিলা করলাম। তারপরও ভয় থাকবে। বিশ্বায়িত পৃথিবীতে আমরা বিচ্ছিন্ন নই। বিশ্বের সব দেশে যদি করোনা নির্মূল না হয়, বিশেষ করে যেসব দেশে আমাদের শ্রমিকেরা যান, তাঁরা যদি ঠিকভাবে মোকাবিলা না করেন, তাহলে আবারও ভাইরাস দেখা দিলে, আবারও বিদেশ থেকে লোক আসবে। আবারও সংক্রমণের ঝুঁকি দেখা দেবে। তাই অন্যান্য দেশের সঙ্গে এক পরিবারের মতো করে করোনা মোকাবিলায় কাজ করে যেতে হবে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
কাজী কামরুজ্জামান: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন