default-image

রাষ্ট্রীয় মদদে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যা করার দুই বছর পরও সৌদি সরকার তার কূটকৌশল অবলম্বনের নীতি অব্যাহত রেখেছে। এ ধরনের বাজে নীতির কারণে উপসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দেশটি প্রভাব–প্রতিপত্তি হারাচ্ছে।

সারা বিশ্বে তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর শীর্ষ সংগঠন ওপেক এবং মুসলিম দেশগুলোর প্রধান সংগঠন ওআইসিকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুবাদে যে সৌদি আরব অর্ধশতাব্দী ধরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব–প্রতিপত্তি ভোগ করে আসছিল, সেই সৌদির এখন নিজের সচ্ছলতা ধরে রাখার জন্য নাভিশ্বাস উঠে যাচ্ছে।

সৌদি শাসকদের সাম্প্রতিক ভ্রান্ত নীতির কারণে ইসলাম ধর্মের প্রধান তীর্থভূমি ও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলখনি থাকা দেশটির ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক প্রভাব অনেকখানি কমে গেছে। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে কূটকৌশলী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের হঠকারী নীতি দেশটির প্রতি মুসলিম বিশ্বের আস্থা প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে।

বিজ্ঞাপন

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আরেক কূটকৌশলী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদের পরামর্শ মতে মোহাম্মদ বিন সালমান এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে মনে করা হয়।

মোহাম্মদ বিন সালমান লিবিয়া ও তিউনিসিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছেন এবং মিসরের সিসি ও সিরিয়ার বাশার সরকারের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তাঁর সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হলো আবুধাবিকে অনুসরণ করে হুট করে সৌদির রক্ষণশীল সংস্কৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু অতিপশ্চিমা সংস্কৃতিনির্ভর পদক্ষেপ নেওয়া।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে মিসরের নিখিল আরব প্রকল্প মার খাওয়ার এবং মিসরের নেতা গামাল আবদেল নাসেরের মৃত্যুর পর মূলত সৌদি আরবের উত্থান ঘটে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনপুষ্ট মিসর, ইরাক ও সিরিয়ার নেতৃত্বাধীন আরব লিগের প্রভাবকে ফিকে করে দিয়ে সৌদির নেতৃত্বাধীন ওআইসি সামনে চলে আসে।

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ওপেক তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিলে তেলের দাম অনেক গুণ বেড়ে যায় এবং তখন সৌদির অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হয়ে যায়। মিসর ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করার পর আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে সৌদি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

ইরানে ইসলামি বিপ্লব ও ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক অভিযানের পর সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হয়ে ওঠে। বাদশাহ আবদুল্লাহ জীবিত থাকা পর্যন্ত সৌদির প্রভাব–প্রতিপত্তি অটুট ছিল। তবে তাঁর মৃত্যুর পর নতুন বাদশাহ সালমান ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তাঁর উচ্চাভিলাষী পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী করা হয়।

তবে প্রথম থেকে মোহাম্মদ বিন সালমানই কার্যত সৌদির শাসনভার নিয়েছিলেন। তিনি ক্ষমতায় এসেই তাঁর আমিরাতি পরামর্শদাতা বিন জায়েদের পরামর্শে ইয়েমেনে অন্যায় যুদ্ধ শুরু করে দেন। তিনি বলেছিলেন, ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতিদের কয়েক সপ্তাহের লড়াইয়ে তিনি হারিয়ে দেবেন। কিন্তু সে লড়াই অনন্তকালের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে এবং তাঁর হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষ এখন ধুঁকে ধুঁকে মরছে।

২০১৭ সালে মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথায় লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। এটি তাঁর জন্য উল্টো ফল ডেকে আনে। ওই বছরই মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স মনোনীত হওয়ার পর বেপরোয়া
হয়ে ওঠেন। নিজের ক্ষমতা কণ্টকমুক্ত করতে তিনি নিজের বিরোধী ক্ষমতাধর সব যুবরাজ ও কর্মকর্তাকে আটক করেন। এমনকি তাঁদের নির্যাতনও করেন। তখন থেকেই তিনি যাঁকে বিরোধী বলে মনে হয়েছে, তাঁকেই গ্রেপ্তার করেছেন। ২০১৮ সালে তুরস্কে সৌদি দূতাবাসে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে তাঁর নির্দেশেই হত্যা করা হয়।

এসব কিছু মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে পড়ে যাওয়ায় সৌদি জনগণের জীবনমান নিচে নামতে শুরু করেছে। জনগণের মধ্যে সরকারের ওপর ক্ষোভ বাড়ছে। আঞ্চলিক দেশগুলোও আগের মতো সৌদিকে সমীহ করছে না। আগামী নির্বাচনে যদি ট্রাম্পের পরাজয় হয়, তাহলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে যে বিরাট সংকটে পড়তে হবে, তা প্রায় নিশ্চিত। এ কারণে এখন তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য মোহাম্মদ বিন সালমান সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনকে দিয়ে আগে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ড ফিরিয়ে না দেওয়া ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরব স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপন করবে না—বাদশাহ সালমান এখনো এই সিদ্ধান্তে অটল আছেন। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মোহাম্মদ বিন সালমান এই কাজ করে যাচ্ছেন।

কিন্তু মোহাম্মদ বিন সালমানের কারণে সৌদির যে পতনের ধারা শুরু হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল—কেউই ঠেকাতে পারবে বলে মনে হয় না।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মারওয়ান বিশারা আল–জাজিরার জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য পড়ুন 0