default-image

নারীর স্নেহ-ভালোবাসায় কে না ঠিকানা পেয়েছে? কিন্তু হিম্মত চেয়ারম্যানের মায়ের ঠিকানাটায় কিছুতেই পৌঁছানো যাচ্ছে না। ‘কথা দিছ কিন্তু আইবা তোমরা’—সেই দেওয়া কথাটার গায়েবি সুতার টানে আমরা খুঁজে চলেছি হিম্মতের মায়ের বাড়ি। যতই খুঁজি ততই ঘুরেফিরে আমরা এক নদীর বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে পড়ি। সেখানে একেকটি খেয়া পারাপার মানে একেকজন অদ্ভুত গল্পের চরিত্রের সঙ্গে দেখা হওয়া। কে জানে, হিম্মতের মা-ই হয়তো আটিপাড়ার মাঠের পারে বাঁশঝাড়ের ছায়ায় বসে গায়েবি ইশারা করে আমাদের এসব দেখিয়ে দেন!

খুঁজতে খুঁজতে দেখা হয় ভূত-প্রেতভরা গাছ কাটার ওস্তাদ লোক মহলুদ্দিনের সঙ্গে। দেখা গেল, বৃদ্ধ পরশ আলী আর আমানত আলী মাথায় দুধের কলসি নিয়ে একটুও না টলে চলেছেন চান্দহর ঘাটের দিকে। সাদা জোব্বা আর কালো কোট পরা তাঁদের কলসি বহন এক দেখার মতো দৃশ্য। নদীর ওপারে আজ তাঁদের বেয়াই বাড়িতে দাওয়াত। সেই ঘাটেরই একটু দূরে শর্ষে মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন বৃদ্ধা সোমত্ত বানু আর তাঁর বেয়াইন জোনাকি বেওয়া। চারদিকের জমিতে খাবার খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ধানশালিক, জালালি কবুতর, ফিঙে, সাদা শালিকের দল। আকাশে চক্কর খাচ্ছে কয়েক শ কবুতর। বিকেলের রোদে বাঁশের খুঁটিতে বসে ইগলের মতো রাজকীয় কালো ডানা শুকাচ্ছে কয়েকটি পানির পানকৌড়ি। আমরা এসে পৌঁছাই কেরানীগঞ্জের চর চান্দহরের ঘাটে।

বিজ্ঞাপন

মাঠের মহারানি

ছাগলের পাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সোমত্ত বানু। মুখে বলিরেখা, বয়স ও মেহনতের ছাপ। হাসলে মনে হয় এককালে কী সুন্দরীই না ছিলেন তিনি। নাকে নাকছাবি, দুই কানে সোনার দুল, ফুল ছাপা শাড়িতে মুখে ফুটে উঠেছে প্রাচীন গরিমার আভা। ধলেশ্বরীর পারে তখন রীতিমতো মেজবানি বসে গেছে। খণ্ড খণ্ড জমিকে ধানের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। বর্ষায় জায়গাটা ডুবে থাকে, তারপরে হয় শীতের রবিশস্য। এ বছর রবিশস্যে লোকসানি গেছে কৃষকের। কিন্তু আশা, ধানে তার উশুল হবে।

এই যে দেখছি, ধান রোয়া হবে। তার আগে শর্ষে, অড়হর, ডাল, কপি তোলা হচ্ছে। এসবের মধ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ নারী-পুরুষ-শিশু দুপুরের আহারে বসেছে। বাড়ি থেকে পাঠানো পাতিলভরা ভাত, ডাল, মাছের শুঁটকির তরকারি, এটা–ওটা।

সোমত্ত বানুর সঙ্গে কথা বলতে দেখে চলে এলেন তাঁর বেয়াইন জোনাকি বেওয়া। হাসতে হাসতে বলেন, ‘ছবি তুলবার দেইখা ভাবলাম, সরকার চাকরি দিব নাকি।’ তাঁরা শুনেছেন, আশপাশের গ্রামে ভূমিহীনেরা জমি পাচ্ছে, কিন্তু তাঁদের গ্রামের কেউ এখনো পায়নি। ‘জমিজমা আমাগো যা আছে মাশাল্লা চলবো, তয় গ্রামের অভাবী মানুষদের কথা কই আরকি।’ জোনাকি বেগমের ছেলেরা ‘বিদ্যাশ’ ছিল, করোনার সময়ে ফিরে এসেছে। জোনাকি ভাবেন, ‘বুদ্দি কইরা চললে দ্যাশেই ভালো মতন কর্ম কইরা খাওয়া যায়।’ ছেলেদের মনে হয় আর পাঠাবেন না বাইরে।

আমরা বিক্রি হইবার নাইগ্যা বইসা রইছি ভাই

ধলেশ্বরীর তীরের ওপারটা চর চান্দহর আর এপারটা চান্দহর বাজার। ঘাটের কাছে বিরাট এক গাছ বিরাট শক্ত শিকড় মেলে দাঁড়িয়ে আছে। তার নিচে ইটের স্তূপের ওপর হাঁটু দ করে বসে আছে তিন লোক। তাদের পিঠের দিকে নদী, পিঠের ওপর শীতবিকেলের রোদ। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম দেখে ডাক দিল একজন, ‘ভাই, এদিকে কী কাজে আইছেন?’ যে আগে কথা বলে সে সক্রিয় চরিত্র। বাকি কথা তিনিই এগিয়ে নেবেন, ‘ভাই, আমরা বিক্রি হইবার নাইগ্যা বইসা রইছি। সারা দিন ঘুরলাম, কিন্তু বিক্রি হইবার পারি নাই আইজ। বান্দুরা গেছি, সাহরাইল গেছি, দোহার গেছি। কোথাও আজ কাজ নাই। খালি ঘুরতেছি।’

এই দেশে দিনমজুরদের কাজের জন্য ভাড়া করে নিয়ে যাওয়াকে বলে বিক্রি হওয়া। বিক্রি হবার আশায় পাবনার চলনবিল এলাকা থেকে এখানে এসেছে ওরা ছয়টি যুবক। কী পারে না তারা—ধান বুনতে পারে, মাটি কাটতে পারে, ইটখোলায় ইট বানাতে বা পোড়াতে পারে, ইমারত বানানোয় জুগালি খাটতে পারে। দৈনিক ৭-৮ শ থেকে হাজার টাকায় বিক্রি হতে রাজি তারা। গত দুদিন বান্দুরায় ধান রুয়ে দুই হাজার টাকা করে কামিয়েছে একেকজন। কিন্তু আজ কোনো কাজই জুটল না। ৫০-৬০ মাইল এলাকা ঘুরে হয়রান হয়ে এখন পরাজিত সেনার মতো বসে আছে নদীর কিনারে। তাদের শীতরাত কাটবে বাজারের কোনো দোকানের খালি চৌকিতে।

শাহীন আলম এদের নেতা। ‘রাতে ঘুমায়া আবার সকালে বইসা থাকবো বিক্রি হবার নাইগ্যা। না হলে আর কী করবো, বাড়ি চইল্যা যাব। পনেরো দিন পর সরিষা কাটবো, তারপর ধান নাগাবো।’

এই এলাকা তাদের ভালো লাগে। তাদের দেশে টাকা নাই, কাজ নাই। কথা শুনে এক মুরব্বি পাশ থেকে বলে উঠলেন, ‘এই দেশে যে আসে সে আর যায় না।’ পরিষ্কার কামানো মুখের লোকটি হাসতে হাসতে বললেন, ‘এই দেশের মানুষের মনে আর মাটিতে রস বেশি, সবদিকেই রস। খানা-খাদ্য ভালো হয়, খায়া চেহারা ভালো হয়।’

ইনি চান্দহর বাজারের স্থানীয় মানুষ। তিন পুত্র বিদেশে থাকে, তবু দুশ্চিন্তা। কোভিড-১৯-এর কারণে ভয়, যদি ফেরত পাঠিয়ে দেয়?

বিজ্ঞাপন
default-image

ভূতের গাছের গাছি

খেয়াঘাটে ততক্ষণে নৌকা এসে গেছে। এক জোড়া নবদম্পতি, শিশু কোলে মাসহ ৭-৮ জন যাত্রী। বিস্তর দড়িদড়া, গাছ কাটার লম্বা করাত, লাঠি-কুড়াল-দাসহ নানান রকম দেশাল হাতিয়ার বাঁধা সাইকেল নিয়ে নৌকায় যে লোকটি উঠলেন, সাইকেলের বদলে ঘোড়ায় চড়ে এলে তাঁকে দিব্যি ওয়েস্টার্ন সিনেমার অ্যাকশন হিরো বলা যেত। মাথায় রেক্সিনের ছাদঅলা টুপি, ঠোঁটের ওপর পাতলা গোঁফ। নৌকায় ওঠামাত্রই মাঝি তাঁর হাতে গুলের শিশি তুলে দিল। আঙুলের মাথায় গুল মাখিয়ে মুখের ডানে-বামে ঘষে নিলেন। ক্যামেরা দেখে উৎসাহ দিয়ে মহলুদ্দিন বললেন, ‘ছবি তুলবেন? ড্রেস আছে তো, পইরা নেই?’ কী ড্রেস? ‘গাছের কামের ড্রেস।’ গাছ কাটতে ওঠার জন্য মোটা চামড়ার বিশেষ পোশাক আছে তাঁর। আজ ১৫০০ টাকায় কেটে এসেছেন নাছিরের কাঁঠালগাছ।

তবে এই পেশায় মুশকিলও আছে। সব গাছ তো আর নিরীহ না। তিনি বলেন, প্রাচীন গাছগুলোতে দেও-দানো থাকে, কাটার আগে তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। তাঁর ভাষায়, ‘দেবতা থাকলে আমরা বুঝি। করাত ঠেকালেই গাছ কাটার যে শব্দ আহে না, সেইটা হয়। যদি সন্দেহ লাগে, তখন আমরা নিজে পরীক্ষা কইরা দেখি, আছে কি নাই। তখন সেলাম-ভক্তি কইরা আগাই। আল্লাহর রহমতে কখনো কোনো সমস্যায় পড়ি নাই।’ বাড়িতে কে আছে জানতে চাইলে সুন্দর হেসে বলেন, ‘আছে, তোমার ভাবি আছে!’

নৌকা ঘাটে এসে গেছে ততক্ষণে। আমরা পিছিয়ে পড়েছি, মহলুদ্দিন আপন মনে কথা বলতে বলতে সাইকেল ঠেলছেন। ‘এখন বাসায় গিয়া গা-গোসল দিয়া ক্ষেতে যামু, ক্ষেতে সরিষা আছে।’

যখন পথই গন্তব্য

ঢাকার কাছে কেরানীগঞ্জের এই জায়গাটার নাম হযরতপুর। ধলেশ্বরী নদীর পারে গরুর বিরাট হাট বসে সেখানে। হাটের যে ঘাট, তার মাইলখানেক ভাটিতে ধলেশ্বরীতে মিশেছে আমাদের ছোট নদী কালীগঙ্গা। মোহনায় এখনো ডলফিনের দেখা মেলে। বর্ষায় এমনকি নৌকায় লাফিয়ে ওঠে মাছ। নদীপথ ধরে গেলে এদিকে সদরঘাট ওদিকে নবাবগঞ্জ-দোহারের বিপুলা পদ্মার জলরাশি। আর সড়কপথে গেলে হযরতপুর, আটিপাড়া, রুহিতপুরের ছোট ছোট সেতু। আদিমতায় হেলান দিয়ে আধুনিকতার দিকে মুখ করে থাকা বাড়িঘর, দোকানপাট, বিল-জলাশয়। গাছের ছাউনির সুড়ঙ্গ দিয়ে চলে গেছে সেই সুন্দর পাকা রাস্তা। এ পথেরই এক মোড়ে তিনটি বিখ্যাত জনপদের সীমান্ত—কেরানীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ আর সিঙ্গাইর।

এখনো এই এলাকার কৃষকেরা দারুণ অতিথিবৎসল। মানুষ যদি মানুষ ও প্রকৃতির আশ্রয় কখনো খুঁজতে যায়, তাহলে কেরানীগঞ্জ তাদের গন্তব্য হতে পারে। মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে গতি আছে সত্য, কিন্তু ঢাকার বছিলা থেকে দোহারের প্রাচীন স্থাপনা কিংবা পদ্মা নদীর তীরে যাওয়ার সবচেয়ে মনোরম অভিজ্ঞতাময় পথ এটাই।

হিম্মতের মায়ের পরান

নদীর পাড় ধরে ধরে চলছি হিম্মতের মায়ের বাড়ি। হিম্মতের মাকে পেয়েছিলাম গত সপ্তাহে, রাস্তা মেরামতের শ্রমিকদের জন্য রান্নাবান্না হচ্ছিল, তার তদারক করছিলেন। চারজন নারী ছিলেন চুলার পাড়ে, একজনের কপালে সিঁদুর। হঠাৎ হঠাৎ মন্দির আর বাড়ির সামনে জবা ফুলের গাছ দেখে বোঝা যায়, জায়গাটায় হিন্দু-মুসলমান মিলায়া-ঝিলায়ে থাকে। হিম্মতের মায়ের সঙ্গে একটু পর দেখা হলে তিনিও বলবেন, ‘কয়দিন আগে হাসপাতালে আছিলাম না? তখন হিন্দু মাইয়ারা চিক্কুর পাইড়া কানছে আমার জন্য। আমি অগলেরে দেইখা রাখছি না? আমার কাছে সব সমান।’

এতক্ষণে ফোনে পাওয়া গেল এই মহীয়সীকে। বলেন, ‘ঘুমাইছিলাম, তোমরা আহ না ক্যান?’ বলি যে হারিয়ে গেছি আমরা। এখন দাঁড়িয়ে আছি সেরু মিয়ার বাজারে, বামে নদীটা দেখা যায়। উনি বলেন, ‘হায় রে, আমি তো ওদিক দিয়াই হাঁইটা আইলাম, একটু চোক্ষের ডাক্তার দেখাইতে গেছিলাম হেই পাড়ে। কাউরে জিগায়া আটিপাড়া মাঠে আইয়া পড়ো।’

সেরু মিয়ার বাজারটা সন্ধ্যাবেলায় কেমন ছমছম করে। ৪০-৫০টা কাঠের দোকান, করাতকল। সারি সারি লাল ও হলুদ চেরাই কাঠ খাড়া করে রাখা, যেনবা কোনো দুর্গ। সেই দুর্গ থেকে পলায়ন করে আটিপাড়ার মাঠে অবশেষে পৌঁছানো গেল। বাচ্চারা তখনো খেলছে ফুটবল কিংবা ব্যাডমিন্টন খেলা। আকাশে একটা বিমান বিকেলের রোদে তার গা, পেছনের ধোঁয়ার রেখা—সব আগুনের মতো দেখাতে দেখাতে চলে যাচ্ছে। মাঠের পাড়ে লেবুর বাগান।

একটা লাঠি দিয়ে মাটি ঠুকতে ঠুকতে তিনি এলেন। মুখে প্রাচীন দাদিমাদের মতো পানের সুবাস। তিনি সেই ধরনের নারী, সন্তানের বা স্বামীর নামেই যাঁদের পরিচয়। অনেক দিন পর কেউ যদি তখন তাঁদের নাম জিজ্ঞাসা করেন, তখন থতমত খান, যেন মনে করার চেষ্টা করেন। তারপর সলাজ মুখে নামটা বলেন। এই যেমন হিম্মতের মায়ের নাম মর্জিনা। পাওয়ামাত্রই আমাদের জড়িয়ে ধরলেন। মুখে-মাথায় হাত বোলালেন। মাঠের পাশের বাড়ি থেকে তাঁর মেয়েকে ডেকে বের করে বললেন, ‘দ্যাহো, তোমার ভাই-বোন লইয়া আসছি।’

গ্রামদেশে যেখানেই যাই, এভাবে মায়ায় পড়ে যাই। অন্ধকার পথে চলে আসতে আসতে মনে হচ্ছিল যেন, আপন কাউকে পেছনে ফেলে আসছি। মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে যত দূর দেখা যায়, তত দূর তিনি মায়াচোখে আমাদের সঙ্গে পাহারা দিয়ে চলছেন।

এই জগৎটা অচিরেই লোপ পাবে। মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে রাস্তা চওড়া হচ্ছে। চান্দহর ঘাটে হচ্ছে সেতু। আবাসন কোম্পানিগুলো চতুর্দিক থেকে এগিয়ে আসছে। কৃষি জগতের মায়ার জায়গায় আসবে ব্যবসাবুদ্ধি আর তার মানিকজোড় রাজনৈতিক হিংসা। উন্নয়ন নিলে বিচ্ছিন্নতা ফ্রি।


●ফারুক ওয়াসিফ: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। rotnopahar@gmail.com

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন