default-image

প্রশ্ন উঠেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হাটহাজারী–কাণ্ডের পর সরকার হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তা নীতিগত, না কৌশলগত? নীতি বা আদর্শগত অবস্থান হলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের কোনো পর্যায়ে বোঝাপড়া বা সংলাপ হওয়ার কথা নয়। ২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোষিত নারী উন্নয়ন নীতি ও শিক্ষানীতির বিরোধিতা করার মধ্য দিয়ে। গণতান্ত্রিক দেশে যে কেউ যেকোনো নীতির বিরোধিতা করতে পারে, এর পক্ষে জনমত তৈরিরও চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু সংবিধানে ঘোষিত মূল নীতি বাতিল করে কোনো মত বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। কিন্তু হেফাজত এমনই এক সংগঠন, যারা ইহলৌকিক আইনকানুন, সংবিধান মানতে চায় না। তাদের ১৩ দফা দাবির মধ্যে একটিও নেই, যা কোনো গণতান্ত্রিক ও আধুনিক রাষ্ট্র মেনে নিতে পারে।

২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে শাপলা চত্বর–কাণ্ডের পরও সরকার হেফাজতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। অনেক নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছিল। মামলা হয়েছিল। এরপর আমরা দেখলাম, সেই মামলার তদন্তকাজ আর এগোয় না। আটক নেতারা একে একে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এলেন। তাই এবার হেফাজতের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার এবং পুরোনো মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত হওয়া প্রমাণ করে না যে সরকারের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

মূলত সরকার দ্বিমুখী নীতি নিয়ে এগোচ্ছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘একসময় যে হেফাজতে ইসলামকে খুশি রাখার জন্য সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেই সংগঠনটিকে নিয়ন্ত্রণে আনাই এখন নীতিনির্ধারকদের অন্যতম লক্ষ্য। আস্থাশীল নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠনটিকে আগের মতো বোঝাপড়ার মধ্যে নিতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বর্তমান হেফাজতের নেতাদের গ্রেপ্তার, চাপ প্রয়োগ এবং ভেতরে-ভেতরে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চলছে।...সরকার মনে করছে, হেফাজতে পছন্দমতো নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে সংগঠনটি পরবর্তী সময়ে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এ জন্য সরকারের একটা পক্ষ প্রয়াত আমির শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীসহ তাঁর অনুসারীদের বা অপেক্ষাকৃত উদারপন্থীদের নেতৃত্বে নিয়ে আসতে চাইছে। তবে সরকারের ভেতর আরেক পক্ষ বলছে, আনাস মাদানী বা বাবুনগরী—কোনো পক্ষকেই পুরোপুরি বিশ্বাস করা যাবে না। তাই কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। (২৮ এপ্রিল ২০২১)

প্রথম আলোর খবর থেকে আরও জানা যায়, ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে অভিযানের সময় হেফাজতের তৎকালীন আমির শাহ আহমদ শফী ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় আটকা পড়েন। সেখান থেকেই হেফাজতের নেতৃত্বের একটা অংশের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ তৈরি হয়। এরপর সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, প্রতিনিধিরা হেফাজত নেতাদের সঙ্গে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বৈঠক করেন। অন্তত তিনজন মন্ত্রী, একজন মেয়র, জন পাঁচেক সাংসদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল হাটহাজারী মাদ্রাসায়।

সরকারের মন্ত্রী-নেতা থেকে শুরু করে সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা কথায় কথায় বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজতকে ব্র্যাকেটবন্দী করেন। তাঁরা বোঝাতে চান যে নীতির দিক থেকে এই তিন পক্ষের মধ্যে খুব বেশি ফারাক নেই। কিন্তু সরকারের নীতিকৌশলের ক্ষেত্রে বিস্তর ফারাক। তারা বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে যত কঠোর, হেফাজতের বেলায় ততটাই নরম ও আপসকামী।

২০১৭ সালে হেফাজতে ইসলামের দাবি মেনে সরকার পাঠ্যবইয়ে ২৯টি বিষয় সংযোজন ও বিয়োজন করে। সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির দুটি পাঠ্যবই ছাপা হওয়ার পর জাতীয় পাঠ্যক্রম সমন্বয় কমিটির নজরে আসে যে হেফাজতের দাবি অনুসারে দুটি লেখা বাদ পড়েনি। তত দিনে প্রায় ১৫ লাখ বই ছাপা হয়ে যায়। পরে সেগুলোও বাতিল করা হয়।

এ ছাড়া সরকার হেফাজতের দাবি মেনে নিয়ে কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতি দেয়। কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি দেওয়া অন্যায় নয়। দেশের সব মাধ্যমের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারের তদারকি থাকা প্রয়োজন। তাদের পাঠ্যক্রম ও বইপত্রে রাষ্ট্র ও সংবিধানের বিরুদ্ধে কিছু থাকলে তা দেখাও সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি দিলেও সেখানে সরকারের বিধিবিধান প্রতিপালন করাতে পারেনি। স্বীকৃতি দেওয়ার পরও কওমি মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় না, জাতীয় সংগীত গাওয়া হয় না বলেও অভিযোগ আছে।

বিজ্ঞাপন

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার বা সরকারি দলের বিকল্প শক্তি হলো বিরোধী দল। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে ছায়া মন্ত্রিসভা থাকে। আমাদের দেশে অতটা আশা না করলেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কর্মসম্পর্ক থাকা উচিত। নব্বই-পরবর্তী সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনায় সে রকম আলামতও দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এরপরই সব ওলটপালট হয়েন যায়। সরকার বিরোধী দলকে সহ্য করে না। বিরোধী দলও রাজপথে সবকিছু ফয়সালা করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্র হয়ে পড়ে অকার্যকর। এসব দুর্বলতা সত্ত্বেও বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগকে বিকল্প শক্তি ভাবা হতো। আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপিকে। কিন্তু ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের পর প্রকৃত অর্থে কোনো বিরোধী দল নেই।

আরেকটি প্রবণতা লক্ষণীয়। যাঁরা যখন ক্ষমতায় আসেন, তাঁরা একে চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবেই ধরে নেন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে যদি বিএনপি আওয়ামী লীগকে ‘ধ্বংস’ করতে না চাইত, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো হোতাদের রক্ষা করতে না যেত, তাহলে দেশের রাজনীতির গতিধারা ভিন্নও হতে পারত। কিন্তু ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ মুখে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বললেও কাজে বিপরীতটিই করেছে। বিএনপি ২০০৭ সালে একতরফা নির্বাচন করার চেষ্টা করে সফল হয়নি। কিন্তু ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সেই কৌশল প্রয়োগ করে সফল হয়। এ ক্ষেত্রে তারা ঢাল হিসেবে উচ্চ আদালতের রায় এবং সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ব্যবহার করেছে।

এখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি বা জাতীয় পার্টি নয়—হেফাজতে ইসলাম। পত্রিকার পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখলে মনে হয় বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামই সবচেয়ে বড় দল এবং জুনায়েদ বাবুনগরী কিংবা মাওলানা মামুনুল হকের চেয়ে বড় নেতা নেই। অথচ হেফাজতের ঘোষণা অনুযায়ী এটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। আওয়ামী লীগ নেতারা এখন যা–ই বলুন না কেন, এই অরাজনৈতিক সংগঠনকে রাজনৈতিক দলের মর্যাদা দিতে এবং শক্তি সঞ্চার করতে তারা নানাভাবে সহায়তা করেছে। নানা রকম সুবিধা পাইয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ আছে।

আওয়ামী লীগ মনে করে বিএনপিকে মাঠছাড়া করতে পেরে তারা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী, কোনো জায়গা শূন্য থাকে না। তাই বিএনপির শূন্যস্থান পূরণ করেছে হেফাজত। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা এ কথা ভাবেননি যে বিএনপিকে মাঠছাড়া করতে গিয়ে তঁারা একদিকে হেফাজতকে বলীয়ান করেছেন, আরেক দিকে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোকে তছনছ করে দিয়েছেন। কোন্দল, কেচাল ও আত্মম্ভরিতায় আওয়ামী লীগ এখন নিজের ভার নিজে বইতে পারছে না। ফরিদপুর কিংবা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জই বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়।

সদ্য শেষ হওয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন, ‘খেলা হবে।’ নরেন্দ্র মোদিও পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন, ‘খেলা হবে।’ সেই খেলায় কে জিতবেন, কে হারবেন ২ মে জানা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির দুই প্রধান খেলোয়াড় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউ খেলার নিয়ম মানছে না। আর সে কারণেই হেফাজত আস্ফালন দেখাতে পারছে।

l সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

মতামত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন