default-image

আজি আমি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তোমাদের উদ্দেশে দুটি কথা লিখছি। যখন আমার এ চিঠি তোমাদের হাতে পৌঁছাবে, তখন হয়তো আমি আর তোমাদের মাঝে থাকব না। নামহীন-গোত্রহীন ঘাসফুলের মতো তোমাদের দৃষ্টির অগোচরে চলে যাব।
অঙ্গার হয়ে অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে চাই। তোমরা হয়তো জানো না, আগুনে পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে বেঁচে থাকা কী কষ্ট! মনে হয়, মরে গেলেই বেঁচে যেতাম। রাত-দিন নির্ঘুম কাটাতে হতো না, যন্ত্রণায় চিৎকার আর আর্তনাদ করে সময় অতিবাহিত করতে হতো না, আমার কারণে কারও নির্ঘুম রাত কাটাতে হতো না, মায়ের অশ্রু বারবার গড়িয়ে পড়ত না, যন্ত্রণায় এদিক-ওদিক করে কাতরাতে হতো না।
তোমাদের কি সাফিনের কথা মনে পড়ে? ওর বয়স মাত্র আড়াই বছর। তাকেও তোমরা পেট্রলবোমায় পুড়িয়ে দিলে। তার শরীরের ১৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার বাবা আগুন নেভাতে গেলে তাঁর হাতও পুড়ে যায়, মায়ের কপালে আঘাত লাগে। সাফিনের ভুবনভোলা হাসি, ছোট ছোট বায়না, খেলার পুতুল—সব অনাদরে পড়ে আছে। সাফিনের নরম তুলতুলে শরীরে এখন হাত দেওয়া যায় না, স্নেহের পরশ বোলানো যায় না। কবি বিহারী লাল চক্রবর্তীর মতো বলতে ইচ্ছে করছে, ‘সর্বদাই হু হু করে মন/ বিশ্ব যেন মরুর মতন/ চারিদিকে ঝালাপালা/ উঃ কি জ্বলন্ত জ্বালা/ অগ্নিকুণ্ডে পতঙ্গ পতন।’ কিছুদিন আগেই এই শিশুটির শরীর গরম পানিতে পুড়ে গিয়েছিল। উফ! একেই বোধ হয় নরকযন্ত্রণা বলে।
আজ এই পরিস্থিতিতে ভাষাশহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও দেশের সংগ্রামী নেতা আপনারা কোথায়? কবি কাজী নজরুল ইসলাম আপনার বিদ্রোহ কবিতা আর অগ্নিবীণা কোথায়? আপনি তো বলেছিলেন, ‘যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,/ অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না-/ বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/ আমি সেই দিন হব শান্ত।’ আপনি আসুন আর দেখে যান। আর কবি সুকান্ত আপনি কোথায় আছেন? আপনি লিখেছিলেন-‘প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল/ এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ আপনার এ অঙ্গীকার কোথায় গেল? আজ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় আমার ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা, ‘এ দুর্ভাগা দেশ হতে হে মঙ্গলমল/ দূর করে দাও তুমি সর্ব তুচ্ছ ভয়।’
লেখক: নাগরিক, রামপুরা, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন