২.

পুতিনের লক্ষ্য ছিল বিপুল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যেই কিয়েভ দখল করে অবাধ্য জেলেনস্কি সরকারকে হটিয়ে সেখানে একটি ‘রাশিয়ার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন’ (অর্থাৎ তাঁবেদার) সরকার বসিয়ে দিয়ে অভিযানের সমাপ্তি ঘটানো। তাঁর পরিকল্পনা সফল হয়নি। ছয় সপ্তাহের যুদ্ধে, ইউক্রেনে ব্যাপক আক্রমণ চালিয়েছে রাশিয়া, বেশ কিছু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ৪০ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়ে দেশ ত্যাগ করেছে, যার বড় অংশ নারী ও শিশু। কিন্তু তাতে প্রতিরোধ ভেঙে পড়েনি।

জাতিসংঘের হিসাবে কমপক্ষে ১ হাজার ৪১৭ জন ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিক যুদ্ধে নিহত হয়েছে, যার মধ্যে শতাধিক শিশু রয়েছে। ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাংশে, বিশেষত মারিউপোল শহরে সংঘাত ও মানবিক সমস্যা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাশিয়ার তথ্যানুযায়ী গত ১৫ মার্চ পর্যন্ত তাদের ১ হাজার ৩৫০ জন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮২৫ জন। তবে গার্ডিয়ান পত্রিকা জানায়, রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ৯ হাজার ৮৬১ জন রুশ সেনা প্রাণ হারিয়েছেন বলে স্বীকার করেছে। যুদ্ধে ইউক্রেনীয় সৈন্যদের প্রাণহানির সংখ্যা বিভিন্ন তথ্যমতে দুই সহস্রাধিক।

বিপুল রক্তপাতের পর পুতিন এখন পরিকল্পনা পরিবর্তন করে শুধু পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস এলাকা দখলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মারিউপোলসহ আশপাশের এলাকা অধিকারের ফলে আজভ সাগরের উপকূল থেকে ইউক্রেন সম্পূর্ণ বিতাড়িত হবে এবং তাদের একমাত্র বন্দর থাকবে ওদেসা। ওদেসা দখলের জন্যও ব্যাপক বোমা ও গোলাবর্ষণ করছে রুশ বিমান ও নৌবাহিনী।

সশস্ত্র যুদ্ধ থামলেও সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে আগেই। ছেড়ে যাওয়া বুশা শহরে চার শতাধিক মৃতদেহ আবিষ্কারের পর এখন গণহত্যার অভিযোগও উঠছে। গোলাগুলি থামলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া হবে বলে মনে হয় না

৩.

রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া হয়েছে কিছুটা কৌতূহলোদ্দীপক, কিছুটা বিভ্রান্তিকর। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এ-সংক্রান্ত প্রথম প্রস্তাবে বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত থাকে। রাশিয়া এতে প্রীত হয় বেশ। দ্বিতীয়বারের প্রস্তাবে বাংলাদেশ ইউক্রেনের পক্ষে ভোট দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো এতে সন্তুষ্ট হয়। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রথম প্রস্তাবে রাশিয়ার নাম করে নিন্দা প্রস্তাব এসেছিল, বাংলাদেশ তাই ভোট দেয়নি। পক্ষান্তরে, দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল মানবিক বিষয়াদি নিয়ে, তাই বাংলাদেশ পক্ষে ভোট দিয়েছে। কোনো দেশ যদি আগ্রাসন চালায় আরেকটি দেশের বিরুদ্ধে, তাহলে তার কি নাম ধরে নিন্দা করা যাবে না?

গত ৩০ মার্চ সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়া আমাদের পক্ষে ছিল, তাই আমরাও তাদের পাশে থাকব।’ এ নিয়ে কারও কারও প্রশ্ন, এতে পশ্চিমের দেশগুলো আমাদের ওপর বিরূপ হবে কি না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তো এ–ও বলেছেন যে, ‘তারা যদি কোনো অন্যায় করে, সেটা আমরা মানব না।’ সার্বভৌম একটি দেশকে আক্রমণ করা অন্যায় কি না, সেটা তো নিশ্চয়ই বিবেচনার বিষয়।

তবে বাংলাদেশের বিজ্ঞ বিশ্লেষক ও অধ্যাপকদের একাংশকে দেখলাম, মূল ইস্যু থেকে সরে গিয়ে তাঁরা গত ৭০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র কতগুলো দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা করেছেন। ইউক্রেনের কাজকর্মে রাশিয়ার নিরাপত্তাস্বার্থ ক্ষুণ্ন হচ্ছে, এ নিয়েও আক্রান্ত ইউক্রেনকেই তাঁরা প্রকারান্তরে দোষারোপ করেছেন। এক স্বনামখ্যাত অধ্যাপক হিসাব করে বলেছেন রাশিয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে যে দেশগুলো বা ভোটদানে বিরত থেকেছে, তাদের মোট জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫২ শতাংশ। তাই বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষ আক্রান্ত ইউক্রেনের পক্ষে নয়, বরং আক্রমণকারী রাশিয়ারই পক্ষে, সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে এসেছেন তিনি।

৪.

এ যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে দুটো শিক্ষণীয় বিষয় আছে। এক. দুটি অসমশক্তির প্রতিবেশীর মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক চিরকাল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘকাল সুসম্পর্ক বজায় ছিল। রাশিয়ার দেওয়া নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার নিশ্চয়তা প্রদানের পরিপ্রেক্ষিতেই ইউক্রেন তার বিপুল পরিমাণ আণবিক অস্ত্র রাশিয়াকে সমর্পণ করে। রাশিয়ার দেওয়া এই নিশ্চয়তা গত ৩০ বছরে তাসের ঘরের মতো উড়ে গেছে।

দুই. ন্যূনতম প্রতিরোধ-সক্ষমতা, জাতীয় ঐক্য এবং দৃঢ় সংকল্প থাকলে দুর্বল প্রতিবেশীও সবলের আগ্রাসনকে রুখে দিতে পারে। তবে বন্ধু থাকতে হবে, যে দুর্বলের হয়ে যুদ্ধ না করলেও প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ দিয়ে সহযোগিতা করবে। পশ্চিমের সহযোগিতায় দুর্বল ইউক্রেন প্রবল পরাক্রমশালী রাশিয়াকে অনেকটা রুখে দিতে পেরেছে। কিয়েভ দখলের আশা ছেড়েছে মস্কো। রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধোত্তর বিশ্বে শক্তিমান দেশের দুর্বল প্রতিবেশীদের ন্যূনতম প্রতিরোধ-সক্ষমতা অর্জনে তাই সচেষ্ট হতে হবে।

এ যুদ্ধের একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে ৭৫ বছরের শান্তিবাদ ছেড়ে জার্মানির আবার অস্ত্রসজ্জার সিদ্ধান্ত। জিডিপির ২ শতাংশের বেশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে জার্মানি। যুদ্ধরত ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহও করেছে তারা এত দিনের প্রচলিত প্রথা ভেঙে। ইউরোপের নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে এ পরিবর্তন কী প্রভাব রাখে, তা দেখা যাবে আগামী দিনগুলোয়।

৫.

যুদ্ধ শুরু হয়েছে যখন, শেষও হবে। কিন্তু রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের শেষ কোথায় বোঝা দায়। বিজেপিপন্থী ভারতীয় সাংবাদিক স্বামীনাথন গুরুমুরথি বিষয়টি চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। তাঁর ভাষায়, ইউক্রেনকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছে না দেশটিকে কীভাবে রক্ষা করা সম্ভব। যুদ্ধ শুরু করে রাশিয়া এখন বুঝতে পারছে না শেষটা কোথায় করতে হবে। আর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইউক্রেন বুঝতে পারছে না এ থেকে বের হবে কী করে। রাশিয়ার প্রাথমিক উদ্দেশ্য যদি সফল হতো, যুদ্ধটা তাহলে থেমে যেত তখনই। এখন যুদ্ধ শেষ করতে হলে পুতিনকে অবশ্যই কিছু দৃশ্যমান অর্জন নিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে মুখ রক্ষার জন্য। দনবাস এবং আশপাশের এলাকায় যদি পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে রাশিয়া, তাহলে পুতিনের পক্ষে যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব। তবে পুতিনের এরূপ দখলদারিকে স্বীকৃতি দেওয়া ইউক্রেন বা পশ্চিমা বিশ্ব কারও পক্ষেই সম্ভব বলে মনে হয় না।

সশস্ত্র যুদ্ধ থামলেও সবকিছু আগের অবস্থায় ফিরে যাবে—এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে আগেই। ছেড়ে যাওয়া বুশা শহরে চার শতাধিক মৃতদেহ আবিষ্কারের পর এখন গণহত্যার অভিযোগও উঠছে। গোলাগুলি থামলেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া হবে বলে মনে হয় না। রাশিয়ায় যে অর্থনৈতিক দুর্যোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করলে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর জন্য ভ্লাদিমির পুতিন নতুন করে কী করবেন, তা অনুমান করা দুরূহই থেকে যাবে।

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন