ন্যায্য দাবিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনশন
ন্যায্য দাবিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনশন ছবি প্রথম আলো

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা পোষণকারী খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই তিন শিক্ষকের মধ্যে একজনকে বরখাস্ত ও দুজনকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত গত শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১২তম সিন্ডিকেট সভায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ‘উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ এনেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন (প্রথম আলো, ২৩ জানুয়ারি)।

১৮ জানুয়ারি এই তিন শিক্ষককে (বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবুল ফজল ও শাকিলা আলম এবং ইতিহাস ও সভ্যতা বিভাগের প্রভাষক হৈমন্তী শুক্লা কাবেরী) বহিষ্কারের জন্য তাঁদের চূড়ান্তভাবে কারণ দর্শাতে নোটিশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সিন্ডিকেটের অনুমতিক্রমে ‘কেন তাঁদের বহিষ্কার করা হবে না’, সেই মর্মে ইতিমধ্যে নোটিশ করা হয়েছিল এবং সেই নোটিশের জবাব ২১ জানুয়ারির মধ্যে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল।

নোটিশের বরাত দিয়ে আরও জানানো হয়, ১৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন মোতাবেক এই নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে তাঁদের অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী এই তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগনামা হলো: শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি জানানো, শৃঙ্খলাপরিপন্থী কাজ ও অসদাচরণ।

এর আগে দুই শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এই তিন শিক্ষকের অপরাধ কী? শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিকে সমর্থন জানানো? যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন-ফি কমানো এবং আবাসনসুবিধা পাওয়া শিক্ষার্থীদের আধিকার। শিক্ষকদের দায়িত্বও সেই অধিকার যেন শিক্ষার্থীরা পায়, সে পথে শামিল হওয়া। বরং এটিই অবাক করার মতো যে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র এই তিনজন শিক্ষক সে পথেই নিজেদের সম্পৃক্ততা জারি রেখেছিলেন, অথচ এর সংখ্যা অনেক বেশিই কাঙ্ক্ষিত ছিল।

বিজ্ঞাপন

গত বছরের ১ ও ২ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের বেতন-ফি কমানো, আবাসনসংকটের সমাধান, দ্বিতীয় পরীক্ষণের ব্যবস্থা করাসহ পাঁচ দফা দাবিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। এই যৌক্তিক আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেন এই তিনজন শিক্ষক এবং সেটি করেছেন তাঁদের কর্তব্য ও দায়ের জায়গা থেকেই। কারণ, তাঁরা জানেন, শিক্ষার্থী আন্দোলন শিক্ষা আন্দোলনেরই অংশ। আর এখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের বিভক্তির জায়গা খুবই কম।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটিকে শিক্ষকদের ‘উসকানি’ হিসেবে দেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন, কীভাবে একটি অধিকারভিত্তিক আন্দোলনে সংহতি ‘উসকানি’ হয়?

আমরা জানি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের বেশির ভাগই শিক্ষক। সেই শিক্ষকেরা কি আসলেই মনে করেন, শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়ার সঙ্গে হাঁটা উসকানি? বলা হয়েছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ‘রাজনীতিমুক্ত’। এর মানে কী? এখানে কোনো ধরনের দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন চলবে না? দাবিদাওয়া হলেই বহিষ্কার? চাকরি থেকে অপসারণ?

প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা ‘রাজনীতিমুক্ত’ ক্যাম্পাস ঘোষণা করে যে নিজেরাই সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চা করছেন, সে বিষয়ে নিশ্চয়ই ওয়াকিবহাল আছেন। কারণ, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বহু দিন ধরেই। স্পষ্টই বোঝা যায়, এটি ধামাচাপা দিতেই এইগুলো করা হচ্ছে।

আন্দোলন হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যায়—এ ধরনের অযৌক্তিক অবস্থান প্রশাসনিক শিক্ষকদের কোনোভাবেই মানায় না। আর এ ধারণার ওপর ভর দিয়ে যদি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলত, তাহলে তো আর এ দেশে মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে কোনো আন্দোলনই হতো না। তাহলে সেগুলোও ‘উসকানি’ ছিল? তখন এগুলোকে ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ হিসেব দেখলেও বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভিন্ন চর্চা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করে আন্দোলন ঠেকানো নয়, বরং আন্দোলনের আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসা, তাদের কথা শোনা।

তার চেয়ে জরুরি প্রশ্ন, যৌক্তিক আধিকার আদায়ের জন্য কেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করতে হয়? করতে হয় তখনই, যখন তাদের কাছে আন্দোলনের বাইরে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। আন্দোলনের আগেই কেন তাদের দাবিদাওয়া পূরণ হলো না?
সব সময় সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই তাদের মৌলিক অধিকারগুলো নিয়ে দাবি তোলে।

এটি তোলাও তাদের শিক্ষার্থী হিসেবে দায়িত্ব। সেই দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা যদি থেকে থাকে, সেটি প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জানাতে পারে এবং সেটিও তাদের প্রশাসনিক কাজেরই অংশ। কিন্তু সেটি না করে এর বিপরীতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে একধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হচ্ছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশর জন্য যেমন হুমকিস্বরূপ, তেমনি এটি স্পষ্ট লঙ্ঘন করে মতপ্রকাশের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারকেও।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যদি এভাবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মতপ্রকাশের অধিকারকে বহিষ্কারের নোটিশ দিয়ে গলা টিপে ধরতে হয়, তাহলে সেগুলো আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে থাকে না, হয়ে যায় রাজনৈতিক ক্ষমতা উৎপাদন ও চর্চার কারখানা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এটির চর্চা কমবেশি হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাঙ্ক্ষিত নয়, গ্রহণযোগ্য তো নয়ই।

বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিমুক্ত করার নামে প্রশাসনিক নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ স্পষ্টই বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনেকটাই রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে একীভূত করে দিচ্ছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যই হলো রাষ্ট্রীয় দমন-নিপীড়ন চর্চার চ্যালেঞ্জ করা।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শিক্ষকদের প্রতি অনুরোধ, ক্ষমতাচর্চার এই সংস্কৃতি বন্ধ করুন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বাঁচান। আপনাদের এই ক্ষমতাচর্চার ঝলকানিতে শুধু যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থী ও তিনজন শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আশা করছি, খুব তাড়াতাড়ি শিক্ষাঙ্গনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং যৌক্তিক দাবি–দাওয়ার প্রতি সম্মান জানাবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করে আন্দোলন ঠেকানো নয়, বরং আন্দোলনের আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসা, তাদের কথা শোনা। এই জন্যই তো আপনারা প্রশাসন। নিজেদের চাবুক মারার প্রহরীর জায়গায় নিয়ে যাবেন না।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে অনুরোধ করব, খুব দ্রুতই নিজেদের সিদ্ধান্ত পাল্টে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রক্ষা করার জন্য মনোযোগী হবেন এবং নিজেদের সবচেয়ে বেশি রাজনীতিমুক্ত রাখবেন।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। zobaidanasreen@gmail.com

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন