আবহমানকাল থেকে মানুষ ইউনিভার্সিটিতে যায় পড়তে, আর এখন ইউনিভার্সিটি যাচ্ছে বিভিন্ন এডুকেশন প্রোগ্রাম নিয়ে মানুষের দোরগোড়ায়। এরই নাম অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশন। বাংলাদেশ ডিজিটালি অনেক দূর এগিয়েছে সত্যি, কিন্তু অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশন সেক্টরে আমরা এখনো আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। এ জন্যই বৈশ্বিক অনলাইন এডুকেশন ইন্ডাস্ট্রিতে (যার বাজারমূল্য ২০২৬ সালের মধ্যে ৩৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ধরা হচ্ছে) আমাদের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। এটি খুব সহজেই গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সের পর দেশের তৃতীয় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদি আমরা সম্ভাবনাময় এই খাতে যথাযথ গুরুত্ব দিই। আমাদের নীতিনির্ধারকদের এখনই অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশন পলিসি নিয়ে চিন্তা করতে হবে এবং সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন সেক্টরে ‘এডুকেশন বাংলাদেশ’কে প্রতিনিধিত্ব করে, তার জন্য যাবতীয় পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে।

প্রথমেই আমরা অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশন বিষয়ে একটু জেনে নিই। যেকোনো ধরনের পাঠদানপদ্ধতিকে আমরা ডিজিটাল এডুকেশন বলতে পারি, যদি সেটা আইসিটি বা ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে পরিচালিত হয় এবং তার যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করে। যেহেতু ব্লেন্ডেড ও অনলাইন এডুকেশন আইসিটি ছাড়া সম্ভব নয়, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের একধরনের ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতি বলা যেতে পারে। তবে নিশ্চিতভাবেই ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতি মানে শুধু অনলাইন নয়। এই ক্রান্তিকালে বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশনে অভ্যস্ত হওয়া মোটেও সহজ নয়। প্রাতিষ্ঠানিক পলিসি এবং প্র্যাকটিসের অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল এই পরিবর্তনে, যেমন: ডিজিটাল কম্পিটেন্সি, পেডাগজিক্যাল নলেজ, সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলিং, বিভিন্ন লেভেলের ইন্টারেকশন, এনগেজমেন্ট, অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতি, সাপোর্ট স্ট্রাকচার ইত্যাদি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশের বেশির ভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছে। তারপরও তারা এর জন্য অনলাইন ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতিকেই দায়ী করে। এই ব্যর্থতার

মূল কারণগুলো কী, তা একটু অনুসন্ধান করা যাক:
আনলার্নিং শিখতে অনীহা: ২০২১ সালের মার্চে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত আইপিএস সামিটে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত প্রফেসর ক্রিস ডিডি যোগ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, কীভাবে আনলার্নিং শিখতে হয়, সেটাই বিশ্বব্যাপী শিক্ষার ডিজিটালাইজেশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ সব সময় সেসব কালচারের বিরোধিতা করে, যেগুলোয় তারা অভ্যস্ত নয়। সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ প্রচলিত ক্লাসরুমে শিক্ষাদান এবং গ্রহণে অভ্যস্ত। রাতারাতি নতুন শিক্ষাদানপদ্ধতিতে অভ্যস্ত হওয়া তাদের জন্য সহজ নয়।

নিম্নগতির ইন্টারনেট

উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ সমস্যা ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতির বাস্তবায়নে মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলছে। ২০২১ সালের মে মাসে করা একটি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশ মোবাইল ইন্টারনেটের ক্ষেত্রে ১৩৪তম এবং ব্রডব্যান্ডের ক্ষেত্রে ৯৬তম অবস্থানে রয়েছে। মোবাইল ইন্টারনেট দেশের প্রায় সব জায়গায় পৌঁছালেও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের বিস্তার খুবই কম। বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্পিড ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতির জন্য মোটেও সন্তোষজনক নয়। তাই সারা দেশে ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতি নিশ্চিত করতে অন্তত থ্রিজি স্থিতিশীল ইন্টারনেট নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশনের প্রতি মানুষের বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি:

অনেকের ধারণা, অনলাইন ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতিতে কোনো পড়াশোনা ছাড়াই সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব। আমেরিকার জর্জিয়া টেক ইউনিভার্সিটি থেকে অনলাইনে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের সময় আমার বিষয়টি অনেক চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছিল। আসলে সমস্যাটি অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশনের নয়, বরং সমস্যা শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির অনলাইন ডিগ্রি এবং স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অনলাইন ডিগ্রির মান অবশ্যই সমান হবে না।
আর্থসামাজিক অবস্থা: জরিপে জানা গেছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল ১০ থেকে ১৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর ল্যাপটপ বা পার্সোনাল কম্পিউটার আছে। এ ছাড়া করোনা মহামারিতে অনেকের মা-বাবার চাকরি চলে গেছে। অনেকে তাদের পার্টটাইম কাজ হারিয়েছে। আবার অনেক মেয়েশিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে দুর্দশা আরও বাড়িয়েছে নিম্নগতির ইন্টারনেটের উচ্চমূল্য। সরকারের এই পরিস্থিতি নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সঠিক পরীক্ষাপদ্ধতির অনুপস্থিতি:

অনলাইন পরীক্ষার বৈধতা যাচাই ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিখ্যাত ইউনিভার্সিটিগুলো সামষ্টিক পরীক্ষার (মিড বা সেমিস্টার ফাইনাল) চেয়ে চলমান পরীক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সামষ্টিক পরীক্ষার জন্য একটি প্রোগ্রামের শুধু কয়েকটি কোর্স (১২টির মধ্যে ২ থেকে ৩টি) বিবেচনায় নেয়। জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থীর কাছে ন্যূনতম একটি অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস আছে। সুতরাং মোবাইলনির্ভর অনলাইন প্রক্টরিং সিস্টেম এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

ভালো মানের সফটওয়্যার এবং দক্ষ জনবলের সংকট: আমরা প্রায় সবাই সফটওয়্যারের পাইরেটেড কপি ব্যবহার করে বড় হয়েছি এবং তাই প্রায়ই অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে সফটওয়্যার ব্যবহার করতে অনীহা প্রকাশ করি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি ইউনিভার্সিটি মাত্র গত বছরই তাদের শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল দিয়েছে। সার্বক্ষণিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং সাপোর্টের জন্য দক্ষ জনবলের অভাব এ পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব:

ডিজিটাল শিক্ষাদানপদ্ধতি কাজের ডিজিটাল রেকর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করে। আমরা স্মার্ট এডুকেশন টাইপের সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ফিডব্যাক, গবেষণার কাজ, প্রশিক্ষণ, সামগ্রিক প্রেজেন্টেশন ইত্যাদিসহ ৮ থেকে ১০ বিষয়ে শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবে মাসিক প্রতিবেদন জমা নিতে পারি। এতে একদিকে যেমন শিক্ষকদের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়, অন্যদিকে শিক্ষার মান প্রথাগত ক্লাসরুম শিক্ষার থেকেও উন্নত হয়।

সাপোর্ট সিস্টেমের অপ্রতুলতা:

যেহেতু ডিজিটাল শিক্ষাপদ্ধতির ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি খুব বেশি নয়, তাই লার্নিং ডিজাইনার এবং লার্নিং টেকনোলজিস্টের মতো ধারণাগুলো আমাদের কাছে খুব বেশি পরিচিত নয়। লার্নিং ডিজাইনার কোর্স টিচারের সঙ্গে বসে কারিকুলাম আপডেট, প্রেজেন্টেশন, ইন্টারেকটিভ ভিডিও এবং মূল্যায়নের পদ্ধতি বিবেচনায় নিয়ে কোর্সটি ডিজাইন করেন, অন্যদিকে লার্নিং টেকনোলজিস্ট এলএমএসে কোর্সটি সুন্দরভাবে সাজিয়ে থাকেন এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এ-সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেন। লার্নিং ডিজাইনার এবং লার্নিং টেকনোলজিস্ট ছাড়া অনলাইনে ক্লাস পরিচালনা শিক্ষকদের জন্য তুলনামূলকভাবে অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের প্রতি অনীহা:

ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার দূরত্ব নিরসনের পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাদার নৈতিকতা বিকাশের জন্য প্রতিনিয়ত প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্টের কোনো বিকল্প নেই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের শিক্ষকেরা অনেকেই এ বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে থাকেন। তাই বিষয়টি তাঁদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট এবং পদোন্নতির সময় বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

প্রয়োজনীয় পলিসি ও সংশ্লিষ্ট প্র্যাকটিসের অভাব: কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং এর দৃশ্যমান বাস্তবায়নের অভাব আমাদের অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন সম্প্রতি ডিজিটালি শিক্ষাপদ্ধতিকে অব্যাহত রাখতে ব্লেন্ডেড লার্নিংয়ের জাতীয় কাঠামো তৈরিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অনলাইন শিক্ষাপদ্ধতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার সঙ্গে ইউনিভার্সিটিগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

করোনা মহামারি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষ এখন কমবেশি অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছে। আমাদের এর ওপর ভিত্তি করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। যদি অনলাইন ডিজিটাল এডুকেশনকে আমরা সঠিকভাবে সময়মতো বুঝতে পারতাম, আজ আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে হতো না, অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষককে চাকরি হারিয়ে রাস্তাঘাটে আম-কাঁঠাল বিক্রি করতে হতো না, আর শিক্ষার্থীদের অযথা মানসিক বিষণ্নতায় ভুগতে হতো না। সারা বিশ্ব আজ ডিজিটালাইজেশনের দিকে ঝুঁকছে, তাই যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই রূপান্তরের সঙ্গে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারবে না, তারা অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে। আমরা যত তাড়াতাড়ি এটা বুঝতে পারব, ততই দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে।

ড. মো. আকতারুজ্জামান ডিজিটাল শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং পরিচালক, ব্লেন্ডেড লার্নিং সেন্টার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন