বিজ্ঞাপন

আসল ঘটনা কী? আসল ঘটনা সিআইএ আশির মাঝামাঝিতে শুধু মধ্য আমেরিকাতেই কন্ট্রা বিদ্রোহীদের মাদক ব্যবসায় সহায়তা করেনি, নিজ দেশের ভেতরেও বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের মাদক ব্যবসায় সহযোগিতা করেছিল। মাদক বিক্রির অর্থ অস্ত্র কেনার জন্য কন্ট্রা বিদ্রোহীদের কাছে পাঠানো হচ্ছিল। সেই টাকায় আমেরিকার অস্ত্রই কিনছিল কন্ট্রা বিদ্রোহীরা। উদ্দেশ্য সমাজতন্ত্রী ড্যানিয়েল ওর্তেগার স্যান্দানিস্তা সরকারের পতন ঘটানো। উদ্দেশ্য ওর্তেগার মাধ্যমে ও অনুপ্রেরণায় মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে যাতে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা বিকশিত না হতে পারে।

সারা দুনিয়াকে জানানো হলো ইরানের ওপর পশ্চিমের বাণিজ্য অবরোধ থাকায় ইরান-ইরাক যুদ্ধের জন্য ইরান দরকারি অস্ত্র কিনতে পারছিল না। অস্ত্র না কেনা গেলেই তো ইরাকের দখলে যেতে হবে। তাই তেলের দাম পানির চেয়েও কমিয়ে দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারের ব্যারেলপ্রতি ৩০ ডলার দামের স্বাভাবিক মান কমিয়ে মাত্র ৩ ডলারে নামিয়ে এনেছিল। ফলে বিশ্বময় তেলের দাম পড়ে গেল। তাতে সস্তায় তেল কিনতে পারায় যুক্তরাষ্ট্রের বহু অর্থ বেঁচে গেল। দরিদ্র কন্ট্রাদের তখন এই সাহায্য দেওয়া হলো। যেন মানবিক সাহায্য দেওয়া আরকি!

কিন্তু ১৯৮৬ সালে লেবাননের একটি পত্রিকার মাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেল যে যুক্তরাষ্ট্র নিজের তৈরি আইন ভেঙেই গোপনে ইরানের কাছে ৩০ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে। বিনিময়ে লেবাননে ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের হাতে ১৯৮৫ সাল হতে জিম্মি মার্কিনিদের তিনজনকে ছাড়িয়ে আনতে পেরেছে। অস্ত্র বিক্রির আয় হতে ১৮ মিলিয়ন ডলার সমমানের অর্থ-অস্ত্রও কন্ট্রাদের কাছে পাঠিয়েছ। স্যান্ডানিস্তা সৈন্যদের হাতে ভূপাতিত একটি অস্ত্রধাহী মার্কিন বিমানের ধরা পড়া বৈমানিকও জানিয়ে দেয় যে অস্ত্রশস্ত্রের চালানটি কন্ট্রাদের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।

পেছনের কারণও সবারই জানা। একদল অনুসন্ধানী সাংবাদিক আবিষ্কার করলেন যে যুক্তরাষ্ট্র কন্ট্রাদের অস্ত্র কিনতে টাকাপয়সা দিয়েছে। কিন্তু কন্ট্রারা মধ্য আমেরিকায় মাদক–বাণিজ্যে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের আইনানুযায়ী দেশটি মাদক–বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। কংগ্রেসে উঠল বিষয়টি। নৈতিকতা প্রশ্নে মহা হইচই শুরু হলো। বড় বড় মিডিয়া হাউস হয়ে সারা পৃথিবীতে বিষয়টিকে লেবু কচলানোর উপকরণ বানিয়ে ফেলা হলো। দুনিয়া জানল যুক্তরাষ্ট্র একটা ভুল করে ফেললেও নৈতিকতার প্রশ্নে আপস করে না। সমাজতন্ত্রীরা বিষয়টিকে বড়সড় একটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের বিষয় ভেবে বসল। সিআইএ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তখন হয়তো আড়ালে বসে কার্টুন ছবির চরিত্রগুলোর মতো ফিক ফিক করে হাসছিলেন।

গ্যারি ওয়েব ওহাইওর কেন্টাকির একটি অল্প পরিচিত স্থানীয় পত্রিকা স্যান হোসে মার্কারি নিউজ-এর অনুসন্ধানী সাংবাদিক। ১৯৮৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্য উপকূলে লোমা প্রিয়েতা ভূমিকম্পের পূর্বাপর প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করার কারণে সাংবাদিকতার নোবেল পুলিৎজারও জিতেছেন। ১৯৯৬ সালে কিছু সুনিশ্চিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তিনি অনুমান করেছিলেন যে লস অ্যাঞ্জেলেসে ঘেট্টোতে ক্র্যাক কোকেনের মহামারির পেছনে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা থাকতে পারে। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে এল সাপ। দেখা গেল মাদক–বাণিজ্যে সিআইএ জড়িত, রাষ্ট্রের উপরমহলও জড়িত। দেশের বাইরেই নয়, দেশের ভেতরেই টনকে টন ক্র্যাক কোকেনের বাজার তৈরি করা হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গপল্লিগুলো তখন কোকেনপল্লি। এরাই নিরাপদ টার্গেট। সমাজকর্মীদের চিৎকার-চেঁচামেচিতে কোনো প্রতিকারই মিলছিল না। কোকেন–বাণিজ্য থেকে উপার্জন হচ্ছিল মিলিয়ন নয়, বিলিয়ন ডলার। তার সবই যাচ্ছিল কন্ট্রা এবং অন্য সমাজতন্ত্রবিরোধী সশস্ত্র বিদ্রোহীদের অস্ত্র কেনা এবং অন্তর্ঘাতমূলক কাজে।

গ্যারি ঝুঁকি নিলেন। লিখতে শুরু করলেন ডার্ক অ্যালায়েন্স সিরিজ। প্রথমে সেগুলো লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএনসহ সব মাধ্যমেই সাড়া ফেলল। তিনি ডাক পাচ্ছিলেন বিভিন্ন মিডিয়ায়। তারপর যা হওয়ার তা-ই হতে শুরু করল। রাষ্ট্রপক্ষ, শত্রুপক্ষ, সিআইএ এককাট্টা হলো। সঙ্গে যুক্ত হলো বড় মিডিয়া হাউসগুলোও। পেছনে রাষ্ট্রীয় সমর্থন। প্রচারণা চলল যে গ্যারির প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নির্ভরযোগ্য নয়। তবু তাঁর অনুসন্ধান ও তথ্যকে যখন মোকাবিলা করা যাচ্ছিল না, শুরু হলো যত উপায়ে সম্ভব চরিত্রহরণ। আমলনামা ঘাঁটাঘাঁটি। দাম্পত্য ও পরিবারে সন্দেহের বীজ বপন। তবে গ্যারি স্ত্রী ও পরিবারকে সঙ্গেই পেলেন।

নিজ পত্রিকাটি ছোট আঞ্চলিক পত্রিকা। সেটি গ্যারির বিপক্ষে না গেলেও পক্ষাবলম্বন করে লড়ার মতো শক্তি-সামর্থ্য না থাকার বাস্তবতাও গ্যারি আমলে নিলেন। সেই সময়ই সাংবাদিকতায় আরেকটি সম্মানজনক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হলেন গ্যারি। কিন্তু তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করবেন বটে, তবে একান্তে। নিজের স্বাধীনতায়। তাই ছেড়ে দিলেন মার্কারি নিউজ-এর চাকরি। ২০০৪ সালে কপালে দুটি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁর লাশ মেলে। ফরেনসিক সিদ্ধান্ত, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। পত্রিকাগুলোতে তাঁর মৃত্যুও তেমনভাবে সংবাদ হয়নি। অনেক মার্কিনই মনে করেন, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। আত্মহত্যা করলে কপালে একটি গুলি করতে পারতেন, দুটি নয়। প্রসঙ্গক্রমে বলে নিই, ১৯৯৮ সালের পর ২০১১ সালে গ্যারির সাতটি প্রতিবেদন নিয়ে দ্য কিলিং গেম শিরোনামে আরেকটি বই প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত হয় হলিউডের ছবি কিল দ্যস মেসেঞ্জার। ইরান-কন্ট্রাসম্পর্কিত সাংবাদিকেরা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, সিনেমাটি শতভাগ সত্যের কাছাকাছি হয়ে উঠতে পেরেছে। বই দুটি এবং ছবিটির ভাষ্য জানা শুধু সাংবাদিকদের জন্যই নয়, সাংবাদিকতা ও সমাজবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদেরও খুব উপকারে আসবে।

রোজিনা ইসলামের প্রতিটি প্রতিবেদনের প্রথম থেকে শেষ বর্ণ পর্যন্ত পড়তাম। ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’য় তাঁর সাহস, প্রজ্ঞা, একাগ্রতা ও দায়বোধ নিত্যই গ্যারির কথা মনে করিয়ে দিত। ভয় হতো, তাঁকেও হয়তো গ্যারির মতোই বিপদে পড়তে হবে। গ্যারি জীবনের শেষ পুরস্কারটি নিতে গিয়ে বলেছিলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকের ভাবনাজুড়েই থাকে একটি বিশ্বাস ও বোধ, যেকোনোভাবেই হোক, মানুষকে সত্যটি জানাতেই হবে। কারণ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকের সত্তা ও চিত্তজুড়ে থাকে ‘জনস্বার্থ’ এবং ‘সবার সত্য জানার অধিকার’।

হেলাল মহিউদ্দীন অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন