অন্তুদের এই গল্পের শেষ নেই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের একজন শিক্ষার্থী বলছিলেন, ‘হলে না থাকলে হয় বাসা ভাড়া দিতে পারি না, আবার বাসা ভাড়া দিলে খাইতে পারি না। হলের ডাবল সিটের রুমে ওঠার জন্য ৬ হাজার ও চার সিটের জন্য ৩ হাজার টাকা লাগে। এক বড় ভাই ৩ হাজার টাকা জোগাড় করতে খেতে কাজ করেছেন। আমাদের রাবিতে হলের প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই “না খেতে পারার” গল্প আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাসে ৫ হাজার টাকা লাগে। প্রায় ৬০ ভাগ অভিভাবকই টাকা পাঠাতে পারেন না। আমি নিজেই একদিন রাস্তার পাশ থেকে ফেলে দেওয়া বার্গার খেয়েছি।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাবিনা আক্তার বলেন, ‘দেড়টার মধ্যে আমাদের হলগুলোতে খাওয়া শেষ করতে হয়। যেদিন স্যার একটায় ক্লাসে আসেন, সেদিন ক্লাস শেষে দেখি, ছেলেমেয়েগুলো কেমন দৌড়ে দৌড়ে হলে যায়। কারণ মিস হলে অনেকেরই রাত ছাড়া খাবার জুটবে না।’

২.

২৩ মার্চ, বুধবার। বর্তমান চিলমারী উপজেলার সাবেক হেডকোয়ার্টার, শাখাহাতির চর। সবাই ঘাটবর্তী বরই গাছে তলায় খেয়ার অপেক্ষায়। তাইজুদ্দীন (৮০), মিন্টু মিয়া (৭০) মকবুল (৬৫) সহ কয়েকজন। এরা সবাই রক্তের সম্পর্কের ভাই-চাচা-খুড়া।

‘মাইনসের বাড়িত কাম করি খাই। তবুও বাজার করার ধরন হামার আলাদা। পহেটত যে টেকা থাকে তার গোটালে (তার পুরোটাই) খরচ করি আসি। মনে করো আগোত ৫শ টেকা নিয়া বাজারত গেছি। আগে যা জিনিসপত্র কিনবের পাছি, তার অদ্ধেক কিনি নিয়া আসা লাগে এলা। খরচ ৫শ টাকারে করি, কিন্তু জিনিস অদ্ধেক’—বলছিলেন জিয়ার আমলে চিলমারী ছেড়ে যাওয়া নীলফামারীর ডোমারের সোনারায়ের তাইজুদ্দীন।

মকবুল হোসেনের বাড়ি এখন রংপুরের মিঠাপুকুরের ভাংনিতে। তিনি চলেন ‘হাতের ওপর’। মানে দিনমজুর। ‘কয়দিন বিপদত পড়ি এক দেড় বছরে তিনপোয়া মাংস কিনছি। ৬ মাস আগোত দুধ-টুধ কিনছিনো, হাট-বাজার করি আরাম পাইছনো বাহে’—বললেন মকবুল।

আগের চাইতে অর্ধেক বাজার করেন আবুল কালাম (৮০)। বাড়ি শাখাহাতিচর। তিনজনের সংসার। সপ্তাহে দুই দিন জোড়গাছ হাটে বাজার করেন। তিনি সয়াবিন তেল কেনার বদলে বাড়িতে সরিষা বেটে তরকারিতে দেন। আনাজ তাঁর নিজ খেতেই যা পান, তাই দিয়েই চলে।

৩.
অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী ভালো পোশাক পরা লোকদের টিসিবির লাইনে দেখেছেন বলে জানিয়েছেন। টিসিবির লাইন ধরতে পড়িমরি করে ছুটে যাওয়ার একটা ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল। অথচ ব্রিটেনে ৩২ জনের গোল্ডেন ভিসার খবর প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছে। বাংলা ট্রিবিউন ১২ ফেব্রুয়ারি টিসিবির ট্রাকের ছবি দিয়ে জানিয়েছে, পরিচিত কাউকে দেখলেই মুখ লুকাচ্ছেন মধ্যবিত্তরা।

চাল-ডাল-তেলসহ সবকিছুর দামে আগুন। অন্য আরেকটি পত্রিকার শিরোনাম; ‘৫০ হাজার টাকাতেও সংসার চলছে না।’ এ দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি কর্মচারীরাও তো মাসে ওই টাকা বেতন পায় না। তাহলে বাকিদের কী অবস্থা?

‘একটি ক্ষুধার্ত বছরের কাছে ইহারা সমস্ত সংকোচ বলি দিয়াছে।’ —লিখেছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সেই সংকোচ বলি দেওয়ার দিন কি তাহলে ফিরে এল? কিন্তু সেটা তো ছিল তেতাল্লিশের মন্বন্তর।

৪.
‘বাঙ্গালাদেশে যে সকল দুর্বৃত্ত জাতি’ শিরোনামে ১৯১৬ সালে বাংলা পুলিশের ডিআইজি এফ. সি. ডালি একটি বই লিখেছিলেন। সেখানে মেদিনীপুরের ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে ‘তুঁতিয়া মুসলমান’ সম্প্রদায় সম্পর্কে এক সিভিলিয়ান ওমালি ‘জন্মাবধি চোর ও ডাকাইত’ বলে উল্লেখ করেছেন।

অথচ ডিআইজি ডালি বলছেন, ‘যখন রেশম ব্যবসার উন্নতি ছিল তখন তুঁত গাছের চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করত; এরা পরে কৃষি কাজ করে, দড়ি বানিয়ে, মাছ ধরে, দোকানদারি করে এবং রাজমিস্ত্রির কাজ করে জীবন চালায় আর এদের মধ্যে কিছু লোক পাকা চোর ও ডাকাত।’

মানে হলো, যখন তুঁত গাছের চাষ বা রেশম ব্যবসা বন্ধ হয়, তখন এরা চুরি ডাকাতি শুরু করে। তাহলে কারা এই রেশম উৎপাদকদের দোকানি আর ডাকাতে পরিণত করল?

ব্রিটিশরা ছিয়াত্তরের মন্বন্তরেও আগের বছরের চেয়ে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপির হার যেখানে ছিল ৩.৩ শতাংশ। আর ৭৪ সালে অভাবের বছর ছিল ৯.৬ শতাংশ। তাই জিডিপি কি কিছু বলে?

ব্রিটিশ আমলে দুর্ভিক্ষের নামে যে বছরগুলোতে আমাদের ওপর গণহত্যা চালানো হতো, তা দেখে খোদ ব্রিটিশ অফিসাররাই বলতেন, এরা না খেয়ে থাকে তবু কেড়ে খায় না কেন?

২২ মার্চ। পানি কলের সামনে পানি না পেয়ে গভীর নলকূপের সামনে আত্মহত্যা করেন দুই সাঁওতাল কৃষক। অভিনাথ মারাণ্ডি ও রবি মারাণ্ডি। একজন মরেন ২৩ মার্চ। আরেকজন ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসে।

নাহিদ হাসান রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাবেক সভাপতি।
[email protected] com