দুই. দৈনিক কালের কণ্ঠ–এ প্রকাশিত সংবাদ, ‘স্কুল ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন: সংঘর্ষে অভিভাবক সদস্যের মৃত্যু’। শিরোনামে ঝালকাঠি সদর উপজেলার কীর্ত্তিপাশা ইউনিয়নের বেশাইনখান শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মারামারিতে নবনির্বাচিত এক অভিভাবক সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে বেশাইনখান গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

তিন. শেষ সংবাদটি সবার জানা, সব পত্রিকারই শিরোনাম হয়েছে, প্রথম আলোর লিড নিউজে বলা হয়েছে, ‘দিনভর সংঘর্ষ, প্রাণ গেল পথচারীর’। রাজধানীর ঈদের কেনাকাটার প্রাণকেন্দ্র নিউমার্কেট এলাকায় গত সোমবার রাতের পর গতকাল মঙ্গলবারও দিনভর সংঘর্ষ হয়েছে। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিপণিবিতানের দোকানমালিক ও কর্মচারীদের এই সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে আহত নাহিদ হোসেন নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ জানতে পারছি, মুরসালিন নামের আরও একজন দোকানকর্মীর মৃত্যুর খবর। দুটি প্রাণ ঝরে গেল এ ঘটনায়।

তিনটি সংবাদেরই একটি সাধারণ যোগসূত্র আছে এবং তা হলো তিনটি সংবাদই অপমৃত্যুসম্পর্কিত। অপমৃত্যু বলছি এ কারণে, সন্দ্বীপে স্পিডবোটডুবিতে নিহত কিশোরী প্রবাসী বাবাকে চট্টগ্রামে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরছিল। ঝালকাঠির ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ ও নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা জানান, সোমবার বেশাইনখান শহীদ স্মৃতি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচনে অভিভাবক সদস্য পদে সর্বোচ্চ ভোটে মো. শাহ আলম হাওলাদার নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়া এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি প্রার্থীকে সমর্থন করাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। আর ঢাকায় নিউমার্কেটের ঘটনায় নিহত নাহিদ হাসান, মাত্র ২০ বছরের এক তরুণ, তিনি ছিলেন কুরিয়ার সার্ভিসের ডেলিভারিম্যান। বুধবার গভীর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া মুরসালিনও ২৫ বছরের যুবক। তিনি নিউ সুপার মার্কেটে রেডিমেড কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী হিসেবে চাকরি করতেন

ঢাকার নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যে যুদ্ধ হলো। প্রথমে বলা হচ্ছিল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মধ্যে খাওয়ার দোকানে বচসার কথা। আবার কেউ কেউ এখন বলছেন, ঢাকা কলেজে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন নিউমার্কেটের দখল নিতে চায়। আর দক্ষিণের মেয়রও দখল বজায় রাখতে চান। এ কারণেই মারধরের শুরু। এ কারণেই সম্ভবত পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেনি

তিনটি ঘটনাতেই মাতম উঠেছে পরিবারগুলোয়। স্পিডবোট দুর্ঘটনায় তিন সন্তান হারানো মায়ের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, ‘ও আঁর কইলজারা...আঁর তিনো মানিক শেষ, আঁই কী লই থাকমু?’ একই মাতম চলছে কামরাঙ্গীরচরে নাহিদ ও বেশাইনখান গ্রামে তারাবিহর নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় নিহত শাহ আলমের বাড়িতে। নাহিদ সাত মাস আগে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী ডালিয়ার ‘আই লাভ ইউ নাহিদ’ লেখা মেহেদিরাঙানো হাতের হৃদয়গ্রাহী ছবি ছেপেছে দ্য ডেইলি স্টার

কেন ঘটনাগুলো ঘটেছে

ঘটনাগুলো কোনো দৈবদুর্বিপাক নয় বা হঠাৎ ঘটেনি, এর প্রতিটিই মানবসৃষ্ট। সন্দ্বীপের দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে প্রথমে কালবৈশাখীর কথা বলা হলেও এখন বেঁচে যাওয়া যাত্রীর বয়ান থেকে জানা যাচ্ছে, কালবৈশাখীতে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় পড়েনি। চালক বোটের সঙ্গে জেলেদের জালের রশি আটকানোর পর বোট থেকে লাফ দেয়। পরে স্পিডবোটে পানি ঢোকে এবং যাত্রীরা নদীতে লাফ দিতে বাধ্য হয়। এ কারণে প্রাণহানি ঘটে।

সন্দ্বীপের যাতায়াতব্যবস্থা

এক যুগের বেশি সময় আগে সদরঘাট, চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে সন্দ্বীপে যাওয়ার ব্যবস্থা প্রত্যাহারের পর থেকে সন্দ্বীপবাসীর কষ্টের শেষ নেই। যাতায়াতের সীমাহীন কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দায়িত্ববোধের, যাত্রীসেবার মানসিকতার অভাব। যথাযথ সেবা ও নিরাপত্তা প্রদান ছাড়াই ভাড়া বাড়ানোর মহোৎসব চলছে। সারা দেশে যাতায়াতব্যবস্থায় সরকারের উপস্থিতি লক্ষ করা গেলেও সরকার এখানে অনুপস্থিত। সন্দ্বীপের তরুণেরা এ সমস্যা সমাধানে সোচ্চার হলেও জনপ্রতিনিধিরা নির্বিকার। অথচ এ ধরনের সমস্যা সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের সর্বাগ্রে থাকার কথা।

জানা গেছে, এ রুটে স্পিডবোট চালনার কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। গুপ্তছড়া ঘাট দিয়ে স্পিডবোটে প্রতিদিন দু-তিন হাজার যাত্রী সন্দ্বীপ-কুমিরা মাত্র ১৬ কিলোমিটার পথ ৩০০ টাকায় যাতায়াত করে। সন্দ্বীপ রুটে বিআইডব্লিউটিএর জাহাজ ‘আইভি রহমান’-এ ভাড়া কম হলেও ওঠানামার বিপত্তির কারণে সাধারণ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডবোট ব্যবহার করে।

স্কুল–কলেজের ম্যানেজিং কমিটি

স্কুল–কলেজের ম্যানেজিং কমিটিগুলোর রাজনৈতিকীকরণের কথা সবার জানা। পাঠদানের দায়িত্বের চেয়ে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে স্কুল–কলেজের নির্মাণকাজের টেন্ডার, বিভিন্ন নামে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে আদায়কৃত ফিস, নোট বই প্রকাশকদের দেওয়া ‘সম্মানী’ ইত্যাদির ভাগ–বাঁটোয়ারা। তাই প্রকৃত শিক্ষানুরাগীর পরিবর্তে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিরা এখন এসব কমিটি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এবং এসব হানাহানি হচ্ছে।

নেপথ্যের চাঁদাবাজি

ঢাকার নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের ছাত্রদের মধ্যে যুদ্ধ হলো। প্রথমে বলা হচ্ছিল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মধ্যে খাওয়ার দোকানে বচসার কথা। আবার কেউ কেউ এখন বলছেন, ঢাকা কলেজে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন নিউমার্কেটের দখল নিতে চায়। আর দক্ষিণের মেয়রও দখল বজায় রাখতে চান। এ কারণেই মারধরের শুরু। এ কারণেই সম্ভবত পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

কী করা যায়

সন্দ্বীপে যাতায়াতে দুর্ঘটনা এটা প্রথম নয়; পাঁচ বছর আগে একই মাসে পারাপার হতে গিয়ে লালবোট দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। আগের হত্যাকাণ্ডের হোতাদের শাস্তি বা নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ কোনোটাই দেওয়া হয়নি। উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে মামলাটি। এ মামলায় শাস্তি ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলে সাম্প্রতিক ও ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। সন্দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, সব রকম আবহাওয়ায় নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে হেলিকপ্টার, হোভারক্রাফটের মতো আধুনিক যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সন্দ্বীপকে নৌবন্দর হিসেবে ঘোষণা করে এর রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যমান নিয়মনীতি অনুসরণ করে ঘাট পরিচালনা করতে হবে। ঘাটে একচেটিয়া ইজারাদারির অবসান ঘটিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের ও দীর্ঘ মেয়াদে চট্টগ্রাম–নোয়াখালী সংযোগ সেতুর ব্যবস্থা করতে হবে। স্কুল ও কলেজের ম্যানেজিং কমিটিগুলোর বিরাজনৈতিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। স্কুল ও কলেজের ম্যানেজিং কমিটিগুলোর সভাপতি ও সদস্য হওয়ার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করতে হবে।

সারা দেশে বিপণিকেন্দ্র ও পরিবহনব্যবস্থায় চাঁদাবাজি এখন মহামারির আকার ধারণ করেছে। দল ও মত, সরকারি ও বেসরকারি–নির্বিশেষে সব চাঁদাবাজকে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ জন্য সবার আগে পুলিশ বাহিনীকে সংস্কার করতে হবে। কেননা, পুলিশ সরাসরি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বা এর মদদদানে অভিযুক্ত।

দ্রুততম সময়ে উপরিউক্ত তিনটি দুর্ঘটনার তদন্ত, বিচার, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি ও নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অপমৃত্যু ছাড়াও দুর্ঘটনাগুলোর আরও যোগসূত্র আছে। তা হলো দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব। দুর্নীতি এখন যে প্রাণসংহারী হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা ওপরের দুর্ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট। তাই এখন আমাদের রবার্ট ক্লিটগার্ড কথিত দুর্নীতির ভারসাম্যে (করাপ্ট ইকুইলিব্রিয়াম) আঘাত হানতে হবে। দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদ, জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপর্যায়ের আমলাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারকে কেবল টেন্ডার ও বিদেশে প্রশিক্ষণ থেকে ফিরিয়ে জনকল্যাণ নিয়োগ করতে হবে এবং তা করতে হবে এখনই।

আমরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই, ইচ্ছেমতো যাকে খুশি তাকে ভোট প্রদানের, ইচ্ছেমতো পোশাক পরার, নিজ নিজ ধর্মাচরণের স্বাধীনতাসহ আরও হরেক রকমের স্বাধীনতা চাই। কিন্তু অপমৃত্যুর এ স্বাধীনতা আমরা চাই না।

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান: সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন