default-image

কারাবন্দী অবস্থায় একজন লেখক ও উদ্যোক্তার মৃত্যু সচেতন সংবেদনশীল মানুষ মাত্রকেই বিচলিত করেছে। সে কথা এড়িয়ে অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া মুশকিল। সবাই জানি, দেশের চলমান উন্নয়নের কথা বড় মুখ করে বলা যায়। স্বল্পোন্নত দেশের ভুক্তি থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পর্যায়ে আছে দেশ। কোভিড সত্ত্বেও কোনো মেগা প্রকল্প বন্ধ হয়নি। তৈরি পোশাক রপ্তানি, কৃষি উৎপাদন ও রেমিট্যান্স কমেনি, বরং বাড়তির দিকেই আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ তহবিল আরও বেড়েছে, প্রায় ১১ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য আমাদের আছে।

তাই বলে কি সমস্যা নেই? আছে। এর মধ্যেই দুর্নীতি, আর্থিক কেলেঙ্কারিও চলছে, ধনী-দরিদ্রে ব্যবধান বেড়েই চলছে, দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে মানুষের মান নেমে গেছে, তারই নিদর্শন হলো ব্যাংক লুট, জমি-নদী দখল, ধর্ষণ ও শিশু-নারী-প্রান্তিক জনের নির্যাতন, ইয়াবার বিস্তার, প্রতারণা-ছলনার প্রাদুর্ভাব ইত্যাদি। গণতন্ত্রের মান কি নামেনি? নির্বাচন ও নির্বাচিতের মান যাচাই করলে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বিনষ্টের কথাই মনে আসবে। ক্ষমতার দাপটে-দুর্নীতিতে আইনের শাসন অধরাই থেকে গেল। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সম্পাদক পরিষদের আগাম শঙ্কা সত্যে প্রমাণিত হলো। বন্দী অবস্থায় মুশতাক আহমেদের রহস্যজনক মৃত্যু সরকারের ওপর চাপ তৈরি করেছে বৈকি। সরকারের কোনো কাজ নিয়ে একজন নাগরিক সমালোচনা বা কটাক্ষ করলে কোন যুক্তিতে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে, স্পষ্ট নয়। রাষ্ট্র ও সরকারকে একাকার করে ফেললে গণতন্ত্র থাকে কি? ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি আরও খোলামেলাভাবে আলোচিত হওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

সরকারের আত্মসন্তুষ্টি কাম্য নয়, কাম্য হলো আত্মবিশ্বাস। সরকারের তাহলে নির্বাচন এবং ভিন্নমত, দল ও ব্যক্তিকে নিয়ে নার্ভাস হয়ে অতি রক্ষণশীল তথা দমনমূলক ভূমিকায় প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার দরকার পড়ে না। যতই এ অবস্থা চলবে, ততই রাজনৈতিক কর্মী ও দলের পরিবর্তে প্রশাসন ও নানা বাহিনীর ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা বাড়বে। তাদের সেই ভূমিকায় জবরদস্তি ও দমন-পীড়নের উপাদান থাকবেই।

আমরা জানি, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ এবং মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির হুমকি এখনো রয়েছে। কেবল সমাজই তাদের অনুকূল নয়, খোদ ক্ষমতাসীন দলেও এরা আশ্রয় নিয়েছে। আর রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সংগ্রামে বহুকালের সমালোচনার মুখ বন্ধ করার কৌশল থেকে দলটি যখন রাজনীতিতে ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে, তখন অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দেশ নির্মাণে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম এবং সাফল্যের কী পরিণতি হবে? আজ শীর্ষ পর্যায়ের কিছু নেতা ও বিভিন্ন স্তরে কোনোমতে অস্তিত্ব বাঁচিয়ে টিকে থাকা গুটিকয় নেতা-কর্মীর মধ্যেই এই চেতনা সীমিত। ফলে বাংলাদেশের যে সামাজিক রূপান্তর ঘটে চলেছে, তা কেবল আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ও বিশ্বায়নের প্রভাবের ফল নয়, দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তির রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কারণেও ঘটছে বটে। এতে সমাজে রক্ষণশীলতা ও ধর্মান্ধতার বিস্তার সহজ হয়েছে। এ পরিস্থিতি সমাজে সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারেরও অনুকূল।

আইনের নিজস্ব গতির দোহাই দিয়ে সরকার দায় এড়াতে পারে না। বোঝা দরকার মতামত প্রকাশ ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকে এক করা হলে সত্যিকারের বিপদ ঠেকানো মুশকিল হবে। আপাতত কাজ হলো এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত কারাবাস ও মৃত্যুর ঘটনা চিরতরে বন্ধ এবং অবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল করা

এর একটি প্রতিফল হলো কোনো মানবিক সংকটকালে বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় নাগরিক সমাজের অনেকেই ভূমিকা গ্রহণে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। কিন্তু এ সময় বিবেকের কণ্ঠস্বর তো জরুরি, নয়তো মানবিক সমাজের পরিচয়ই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এতে ক্ষমতাসীন দলের বান্ধব হিসেবে পরিচিত বুদ্ধিজীবী-নাগরিকেরা জনপরিসরে জায়গা হারাতে থাকবেন। এই পরিণতি আখেরে সরকারের জন্য কি মঙ্গলজনক হবে?

এটা কেমন বাস্তবতা যে দেশের ইতিহাসে এযাবৎ সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছে যে সরকার, তাকে ক্রমাগতই জবরদস্তির পথে হাঁটতে হবে! এখন তো পরিস্থিতি ১৯৭৩-৭৪-এর মতো নয় যে নানামুখী অন্তর্ঘাত ছাড়াও সদ্য যুদ্ধফেরত তরুণদের রাতারাতি কিছু করার বাঁধভাঙা আবেগপ্রবণ তৎপরতা সামলাতে হচ্ছে? এ-ও নয় যে সেনাবাহিনীতে নানামুখী দ্বন্দ্ব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামর্থ্য সীমিত, পরাজিত শক্তির বিস্তর ঘাঁটি কার্যকর রয়েছে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত, প্রশাসনে শৃঙ্খলা রয়েছে, ভান্ডারে অর্থের জোগান যথেষ্ট, শেখ হাসিনার ক্ষমতা ও নেতৃত্ব প্রশ্নাতীত। মোটাদাগে আন্তর্জাতিক পরিসরে তাঁর ও দেশের ভাবমূর্তি ইতিবাচক রয়েছে। তাঁর জন্য সনাতন শক্ত শাসকের ভাবমূর্তি অপ্রয়োজনীয়।

শক্ত হাতের নেতৃত্ব হয়তো সহজেই অনেক বাধা পেরিয়ে সফল হয়, কিন্তু আমাদের তো যেতে হবে দীর্ঘ পথ, তাই তাঁকে টিকতে হবে লম্বা সময়। তার জন্য সমাজ যেন আপন শক্তির উৎসগুলো চিনতে ও কাজে লাগাতে পারে, তার সুযোগ থাকা চাই। সমাজ, দল, রাজনীতি যদি স্থবির ও তামাদি হয়ে পড়ে, নবায়ন-রূপান্তরের সামর্থ্য হারায়, তাহলে কাঠামো-স্থাপনা ও অর্থনৈতিক-বৈষয়িক উন্নয়নও সেই সমাজ ও দেশের অবক্ষয় ঠেকাতে পারবে না। তার লক্ষণ কিন্তু এখনই বোঝা যাচ্ছে। একদল মানুষ ঝকঝকে বাড়ি বানাচ্ছে, চকচকে গাড়ি চড়ছে, ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছে, দুহাতে খরচও করছে, সেই সঙ্গে দুর্নীতি, দখল, মাদক, ধর্ষণ, খুনসহ অপরাধ থামছে না। লাগাম টানতে হলে দক্ষ নিরপেক্ষ কার্যকর প্রতিষ্ঠান চাই, সেখানে চাই কর্মীদের মর্যাদা নিয়ে কাজের মুক্ত পরিবেশ। তা নিশ্চিত হতে পারে যদি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি চলে আইনের ভিত্তিতে, হুকুম তামিলের মাধ্যমে নয়।

বিজ্ঞাপন

আইনের শাসনের পথে আমাদের আসতেই হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারও রক্ষা করতে হবে। বুঝতে হবে কারাবন্দী মানুষের মৃত্যুকে কেবল শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে উপেক্ষা করা যায় না। তদন্তে কী তথ্য মিলবে আমরা জানি না, কিন্তু যদি অসুস্থতাজনিত মৃত্যুও হয়, তবু তো তা স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র তো তাঁকে স্বাভাবিক জীবন থেকে দীর্ঘ ১০ মাস ধরে বঞ্চিত করে রেখেছিল। তাই আইনের নিজস্ব গতির দোহাই দিয়ে সরকার দায় এড়াতে পারে না। বোঝা দরকার মতামত প্রকাশ ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকে এক করা হলে সত্যিকারের বিপদ ঠেকানো মুশকিল হবে। আপাতত কাজ হলো এ রকম অনাকাঙ্ক্ষিত কারাবাস ও মৃত্যুর ঘটনা চিরতরে বন্ধ এবং অবিলম্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারা বাতিল করা।

আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন