তালিকা প্রণয়নের দায়িত্ব অর্থমন্ত্রীর, সাংসদেরা কেন তাঁকে নাম দেবেন? যে জেগে ঘুমায়, তাকে ঘুম থেকে জাগানো যায় না। হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বহু আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর রুল জারি করে পুঁজি পাচারকারীদের নাম জানতে চেয়েছেন। রুল মোতাবেক দুদকের আইনজীবী দায়সারাভাবে একটি তালিকা বেঞ্চে পেশ করায় মাননীয় বিচারপতিদের তিরস্কারের সম্মুখীন হয়েছিলেন। আদালত তাঁকে ওই তালিকা ফেরত দিয়ে আন্তরিকভাবে তদন্ত করে আরও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের মন্তব্য, পুঁজি পাচারকারীরা জাতির দুশমন।

এর কিছুদিন পর গত ১৮ নভেম্বর ঢাকায় ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন, তিনি নিজ উদ্যোগে কানাডার টরন্টোর ‘বেগমপাড়া’ সম্পর্কে একটি গোপন জরিপ চালিয়ে ২৮টি নমুনা দেখেছেন যে রাজনীতিবিদেরা নন, বেগমপাড়ার বাসিন্দাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হচ্ছে সরকারি চাকরিজীবীরা। এই ২৮ পরিবারের মধ্যে ৪টি রাজনীতিবিদদের, বাকিগুলো সরকারি কর্মকর্তা ও তৈরি পোশাকমালিকদের। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর থেকে অর্থমন্ত্রী এ তালিকা সংগ্রহ করতে পারেন না?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট থেকে কয়েক দফায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, দুদক ও সিআইডির কাছে পুঁজি পাচারকারীদের নামধাম সরবরাহ করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। সাম্প্রতিক কালে সাড়া জাগানো পুঁজি পাচারকারী পি কে হালদারের কাহিনি কিংবা পাপুলের কাহিনি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী খোঁজখবর রাখেননি কেন? ২০১৮ সালে পানামা পেপারস ও প্যারাডাইস পেপারসে ৮২ জন বাংলাদেশি পুঁজি পাচারকারীর নাম প্রকাশিত হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীর কাছে তাঁদের নাম নেই? ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সমস্যার সঙ্গে পুঁজি পাচার সমস্যা ওতপ্রোতভাবে জড়িত—খবরটা তাঁর জানা নেই? তিনি অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর একের পর এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিয়ে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা দিয়ে চলেছেন এবং খেলাপি ঋণ সংকটকে কার্পেটের তলায় লুকিয়ে ফেলেছেন। যেখানে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ বাড়ছে, সেখানে তিনি সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনেই ঘোষণা দিয়েছেন যে সমস্যাটি গুরুতর নয়!

আসল সমস্যা দুর্নীতি দমন, খেলাপি ঋণের মারাত্মক বিস্তার ও তা থেকে উদ্ভূত পুঁজি পাচার দমনে অর্থমন্ত্রী আদৌ আন্তরিক কি না, সেই প্রশ্ন না উঠে পারে না পুঁজি পাচারের মূল রয়ে গেছে দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের বেলাগাম বিস্তারের মধ্যে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পথ ধরে সেনা শাসক জিয়া রাষ্ট্রক্ষমতা জবরদখলের পর তিনি তাঁর কেনাবেচার রাজনীতির স্বার্থে এবং সামরিক-সিভিল আমলাদের আনুগত্য ও সমর্থন বজায় রাখতে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতিকে বুঝেশুনে আশকারা দিয়েছিলেন।

১৯৭৩ সাল থেকে দুর্নীতি ক্রমেই বিস্তার লাভ করলেও বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে দুর্নীতি ছিল ব্যতিক্রমী আচরণ—রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে তখনো ওটা নিয়মে পরিণত হয়নি। কিন্তু জিয়া নিজেকে সততার পরাকাষ্ঠা হিসেবে জাহির করলেও তাঁর আশকারা পেয়েই তাঁর শাসনামলে দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন করেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে পরাজয়ের আগে তদানীন্তন বাংলা ছিল সারা ভারতবর্ষে সবচেয়ে সমৃদ্ধ কৃষি অর্থনীতি এবং কুটির শিল্পজাত পণ্য রপ্তানির অঞ্চল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বেধড়ক পুঁজি লুণ্ঠন, পুঁজি পাচার এবং ঔপনিবেশিক লুটেরা শাসন-শোষণের শিকার হয়ে পরবর্তী ১০০ বছরে ওই সমৃদ্ধ অর্থনীতি অবিশ্বাস্যভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।

মার্কিন ইতিহাসবিদ ব্রুক এডামস জানাচ্ছেন, ১৭৫৭ সালের পর বাংলা থেকে ইংল্যান্ডে কাঠের জাহাজে পুঁজি পাচার এত বিপুলভাবে বেড়ে গিয়েছিল যে ওই জাহাজগুলো লন্ডন বন্দরে মাল খালাস করার জন্য প্রায় তিন মাস অপেক্ষা করতে হতো। এই লুণ্ঠনপর্বকে ইতিহাসবিদেরা এখন ‘দ্য বেঙ্গল লুট’ নামে অভিহিত করে থাকেন। বলা হচ্ছে ওই লুণ্ঠিত পুঁজি ইংল্যান্ডের ‘প্রথম শিল্পবিপ্লবে’ তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছিল। ১৮৫৮ সালে সরাসরি ব্রিটিশ শাসন চালু হওয়া সত্ত্বেও ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচার থেকে মুক্তি মেলেনি বাংলার। ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলা ব্রিটিশ প্রভুদের ভারত বিভাগের শিকার হয়ে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরের ২৪ বছর আবারও বেধড়ক শোষণ, লুণ্ঠন, পুঁজি পাচার এবং সীমাহীন বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। এই ২১৪ বছরের পুঁজি লুণ্ঠন ও পুঁজি পাচারের শিকার হয়ে রিক্ত-নিঃস্ব হওয়ার কারণেই ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘আন্তর্জাতিক তলাবিহীন ঝুড়ি’। এই পুঁজি পাচারকারীরা প্রতিবছর ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি ডলার পুঁজি বিদেশে পাচার করছেন বলে মার্কিন গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির গবেষণায় উদ্‌ঘাটিত হচ্ছে।

ড. মোমেনের বক্তব্য থেকে আভাস মিলছে, বর্তমানে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশের দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, বিভিন্ন পর্যায়ের আমলা ও পেশাজীবী গোষ্ঠী প্রধান পুঁজি পাচারকারীর ভূমিকা পালন করছেন। সপরিবার বিদেশে গিয়ে উন্নত পুঁজিবাদী দেশে পরবর্তী সময়ে দিন গুজরানের খায়েশে মত্ত হয়ে এই নব্য পাচারকারীরা এখন অহর্নিশ পুঁজি পাচারে মেতে উঠেছেন। বৈদেশিক বাণিজ্যে আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েসিং পুঁজি পাচারের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি, আর রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং রপ্তানি আয় জমা না দিয়ে বিদেশে রেখে দেওয়া পুঁজি পাচারের সবচেয়ে ‘পপুলার মেথড’।

এই পুরোনো পদ্ধতিগুলোর পাশাপাশি এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের বহুল ব্যবহৃত হুন্ডি পদ্ধতিতে রেমিট্যান্স প্রেরণের অভ্যাস পুঁজি পাচারকারীদের একটি সহজ বিকল্প উপহার দিয়েছে। হুন্ডি পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রা যেহেতু বিদেশেই থেকে যায়, তাই কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রতিবছর হুন্ডিচক্রে প্রবেশ করছে, তার হদিস পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফরমাল চ্যানেল বা ইনফর্মাল চ্যানেল, যেভাবেই রেমিট্যান্সের অর্থ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হোক, তার সুফল পাচ্ছে অর্থনীতি। কিন্তু যে হুন্ডি ডলার বিদেশেই রয়ে যাচ্ছে, সেগুলো কিনছে দুর্নীতিজাত কালোটাকার মালিকেরা এবং ব্যাংকের ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ার ‘কালচার’ সৃষ্টিকারী ব্যবসায়ীরা। মার্জিনখোর রাজনীতিক বলুন, দুর্নীতিবাজ আমলা বা পেশাজীবী বলুন, রাঘববোয়াল ঋণখেলাপি বলুন, ডাকসাইটে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি বলুন—হুন্ডি ডলারের সহায়তায় ক্রমে গড়ে উঠছে টরন্টোর বেগমপাড়া কিংবা মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোমগুলো।

এত বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ সত্ত্বেও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো যে বড়সড় সংকটে পড়ছে না, তার পেছনেও রেমিট্যান্স থেকে উদ্ভূত বিশাল আমানতপ্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত ১৫ মাসে হুন্ডি পদ্ধতি বিপর্যস্ত হওয়ায় দেশের ফরমাল চ্যানেলের রেমিট্যান্সপ্রবাহে যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, সেটা মহামারির সংকটকালেও আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে সতেজ রাখছে। মহামারির কারণে পুঁজি পাচারও অনেকখানি শ্লথ হয়ে যাওয়ায় বর্তমান অর্থবছরে কালোটাকা সাদা করায় বিরাট উল্লম্ফন ঘটেছে। মহামারির মরণছোবল নিয়ন্ত্রণে আসার পর আবারও পুঁজি পাচার পুরোদমে শুরু হয়ে যাবে। অতএব, পুঁজি পাচার দমন করতে হলে দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনকে আন্তরিকতার সঙ্গে দমন করতেই হবে। নয়তো শুধু পুঁজি পাচারকারীদের তালিকা পেলেও সরকার পুঁজি পাচার শ্লথ করতে পারবে না।

ড. মইনুল ইসলাম অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়