মে দিবস এলে অশ্রু আর কাজলের কথা মনে পড়ে। অশ্রু আর কাজল যেন দুই বোন, একজন ঝরলে আরেকজনও গলে যায়। আশা আর অপেক্ষার সমাধি হওয়া রানা প্লাজার কথা মনে পড়ে। আশা আর স্বপ্ন যেন দুই নয়ন, একসঙ্গে তাকিয়ে থাকে।

সেই ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসের কথা। নারায়ণগঞ্জ ইপিজেডের একটি কারখানায় মজুরি, ছুটি ও অন্য দাবিদাওয়া নিয়ে শ্রমিক বিক্ষোভ ও পুলিশের গুলি মিলিয়ে বিরাট আন্দোলন হয়। বেসরকারি তদন্তে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনার কথা জানা গেলেও সরকার স্বীকার করে মাত্র দুজনের কথা। সে ঘটনার সময় অনেকবার সেখানে যাই। সূত্র ধরে ধরে এক সন্ধ্যায় মাসদাইর এলাকার এক বস্তির ঘরের সামনে গিয়ে হাজির হই। আমাকে বলা হয়েছিল, কারখানার ভেতরে শ্রমিক হত্যার সাক্ষী এক মেয়েকে এখানে পাব। মধ্যবয়সী এক নারী মেয়েটিকে নিয়ে এলেন। যতই প্রশ্ন করি, মেয়েটি চুপ। মধ্যবয়সী নারীটি পাশেই দাঁড়ানো। মেয়েটির মাথায় হাত রেখে তিনি বলেন, ‘ক মা, কী দেখচস। ক না। ওনারা সাম্বাদিক, ক।’

অশ্রুধোয়া কাজলে রক্তের ইতিহাস
এর মধ্যে একজন হারিকেন দিয়ে গেল। মেয়েটি চোখ তুলে তাকাল। চোখের কাজল ধুয়ে ধুয়ে গালের ওপর দিয়ে দুটো নদীর মতো গড়িয়ে নামছে। বুঝলাম, এখন ও কথা বলবে। বলবে দুঃখ আর যন্ত্রণার ইতিহাস। তার ওই অশ্রুধোয়া কাজলে আর শ্রমিকদের গুলিবিদ্ধ দেহ থেকে গড়ানো রক্তে লেখা সেই ইতিহাস। যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত ও শোষিত মানুষেরা বলে এসেছে যে ইতিহাস। মে দিবসের গায়ে সেই অশ্রু আর রক্তেরই দাগ।

২৬ এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসে। সেদিনও এই করোনার সময়ের মতো হাজারো শ্রমিকের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছিল। সেখানে মৃত মানুষের মুখ দেখেছি, কোনো কোনো মেয়ের চোখের নিচে ধুয়ে যাওয়া কাজলের দাগ। সাভারের নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনসের কথা মনে আছে? সেই যে আগুনে পুড়ে অনেকে মারা গিয়েছিল। তিনতলার জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছিল সুমাইয়া নামের পরির মতো এক মেয়ে। পড়ে রক্তাক্ত হয়। খবর পেয়ে আশুলিয়ার ইটভাটায় কাজ করা মা আসেন। কোথাও সাহায্য না পেয়ে মেয়েকে নিয়ে বাসে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহ রওনা হন। বাসের ভেতরই; রক্ত থামাতে চার-পাঁচটি ওড়না ভিজে যায়। মেয়েটি পরে ভুল চিকিৎসায় মারা যায়, মায়ের সব সঞ্চয় শেষ হয়। তাজরীনে আগুন লাগার আগে তোলা সুমাইয়ার একটা ছবি আছে। চোখে গাঢ় করে কাজল দেওয়া নিষ্পাপ কিশোরী তাকিয়ে আছে। শাস্তি হয়নি কারও।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের উন্নতির সিঁড়ির ধাপে ধাপে রক্ত আর কাজলের আল্পনা। তৃতীয় দুনিয়ার সব দেশের প্রবৃদ্ধির চাকা সেভাবেই ঠেলে নেয় শ্রমিকেরা। অর্থনীতির তত্ত্বে তাদের শ্রম-ঘামের কথা থাকলেও ফিনকি দিয়ে বেরোনো রক্ত আর পোড়া কিংবা পিষে যাওয়া হাড়-মাংসের কথা নেই। সেগুলো মিনি-মাগনা পাওয়া যায়; তাই দাম নেই।

বাংলাদেশ প্যারাডক্সের উত্তর: সস্তা শ্রম
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে ভালো ভালো কথা বলা হয়। বলা হয় অর্থনৈতিক জাদুর কথা, দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্সের কথা। এই উন্নতি কী ও কতটা, করোনার দুর্যোগে ক্ষুধা ও চিকিৎসাহীনতার মৃত্যুর টালিখাতায় তা লেখা আছে। এই উন্নতি, জাদু, প্যারাডক্সের গোড়ায় আর কিছু নয়, শ্রমিকের রক্ত আর অশ্রু। দেশের ধনসম্পদ কম, বাড়তি একটা জিনিসই আছে, সস্তায় কাজ করতে চাওয়া বিশাল এক তরুণ জনগোষ্ঠী—সোহাগ করে যাকে বলা হয় পপুলেশন ডিভিডেন্ট। আর আছে বিপুল বেকারত্ব।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বেকারত্ব কোনো অনিয়ম নয়। বেকারত্ব এখানে পোষা হয় চাহিদা ও জোগানের তত্ত্ব মেনে। বেকারত্ব অতটা বাড়ানো যাবে না, যতটা হলে বড় আকারের অসন্তোষ হয়। আবার অতটা কমানোও যাবে না, যতটা হলে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যায়। শ্রমিকের জোগান যত বেশি বেকারত্ব মালিকপক্ষের জন্য তত আরামদায়ক, ততই মজুরি কমানোর সুযোগ। পুঁজিবাদে তাই বেকারত্ব এবং শ্রমিকের রক্ত আর অশ্রুর ঘাটতি হয় না। উদীয়মান অর্থনীতি মানে উদীয়মান দাসশ্রমের কারবার, রাষ্ট্র যার ম্যানেজার। আইএলও’র হিসেবে তিন বছর আগে বিশ্বে আধুনিক দাসত্বের ফাঁদে আটকা শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি। বাংলাদেশের অনেক শিশুশ্রমিক, মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া অনেক নারী–পুরুষ, গৃহকর্মে নিয়োজিত নারীরাসহ কত কত খাতে শ্রমিকেরা দাসোচিত জীবনে আছে তার প্রকৃত সংখ্যা কোনও পরিসংখ্যানেই আসে না।

করোনাজনিত মন্দায় বেকারত্ব এবং শ্রমিক নিপীড়ন ভয়ানক বাড়ছে। লকডাউনের মধ্যে শ্রমিকদের যেভাবে পোকামাকড়ের কায়দায় বারবার গ্রামে ও শহরে তাড়িয়ে নেওয়া হলো, সেটাই বোঝায় তাঁদের সামনের জীবন। বিশ্বব্যাপী মন্দায় যে শ্রমিকেরা কাজ হারাবেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নেই। তারওপর আসছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, তারা নেবে শ্রমিকের জায়গা। তাদের অসুখ হয় না, তারা প্রতিবাদ করে না, মজুরি লাগে না।

পোশাক খাত, জাহাজভাঙা শিল্পেরই যখন এই অবস্থা, তখন ইমারত নির্মাণশ্রমিক, দিনমজুর, গ্রামীণ শ্রমজীবী, গৃহ খাতের কর্মীদের কী হবে? কী হবে প্রবাসী শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ যদি ফিরে আসেন; আর যাঁরা এসেছেন তাঁরা যদি ফেরত যেতে না পারেন? ভারত ও বাংলাদেশে শ্রমিক ছাঁটাই, লে-অফ শুরু হয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের অবস্থা আরও খারাপ।

বণিক সভ্যতার মরুভূমির বেদুইনেরা
শ্রমিকদের প্রলেতারিয়েত বলে, মুক্তির যোদ্ধা বলে দেখেছিলেন কার্ল মার্ক্স। তারা আধুনিক উৎপাদন বোঝে, মেহনতিদের আপন মনে করে। শৃঙ্খলের সবচেয়ে বড় গিঁটে যারা আটকা, সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যদি মুক্ত হয়, তাহলে গোটা সমাজই মুক্ত হয়; রাশিয়ার লেনিন তা করে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের মতো দেশে শ্রমিকেরা ধর্মীয় জমায়েত আর আঞ্চলিক কমিউনিটির সীমা টপকে শ্রেণিগত বৃহৎ সংহতিতে এখনও পৌঁছায়নি। আগেকার পাটকলশ্রমিকের ঐক্যের অবস্থাও এখন নেই। সেটা যাতে না হয় তার জন্য শিল্প পুলিশ থেকে শুরু করে গোয়েন্দা, দালাল, মাস্তান সব আছে। কিছু হলেই এই শ্রমিক গ্রামে ফিরে যায়, ঘুরে দাঁড়িয়ে শহরের শক্ত মাটির দখল নেয় না।

এই সর্বহারা শ্রমিক তথা প্রলেতারিয়েতের একটু ওপরে জমছে আরেকটা বঞ্চিত শ্রেণি—প্রিক্যারিয়েত। বণিক সভ্যতার শূন্য মরুভূমি ঘিরে ধরছে যেন চারপাশ। অসহ্য অসন্তোষ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে লাখো কোটি আধুনিক বেদুইন—শিক্ষিত বেকার তরুণ। কাজের সন্ধানে তারা সীমান্ত, সাগর, জঙ্গল পেরোচ্ছে। এরাই আবার যোগ দেয় সামাজিক অসন্তোষে—আন্দোলনে। এরা কেউ শিক্ষিত বেকার, কে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কেউ ছোট চাকুরে, কেউবা চুক্তিভিত্তিক, কেউবা ফ্রিল্যান্সার। ছোটোখাটো দক্ষতা ও জ্ঞান নিয়ে কিছুটা নিশ্চয়তা ও সম্মান তারা চায়। অথচ অর্থনীতির এদিক-সেদিকে এদের মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। গত শতকে যেমন প্রলেতারিয়েত ছিল পুঁজিবাদ ও স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়ের সামনের সারিতে; এখন তাদের জায়গা নিয়েছে প্রিক্যারিয়েত তথা শহুরে নিম্নবর্গ। এরা সাধারণ যুবজনতা। এদের বড় অংশটারই ভদ্রস্থ চাকরি চাই, একটু সম্মান আর একটু উন্নতির জন্য এরা তৃষ্ণার্ত। এরাই আরব বসন্ত করে, এরাই তাহরির থেকে তাকসিম স্কয়ারে জড়ো হয়। কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী এদের বলছেন বিপজ্জনক শ্রেণি। বিপদটা তিনি শাসকদের দিক থেকে দেখেছেন, সাধারণের চোখ দিয়ে দেখেননি। এরা এখন এক সম্ভাবনাময় শ্রেণী—বাংলাদেশের কোটা সংস্কার ও সড়কে নিরাপত্তা আন্দোলনে এই প্রিক্যারিয়েতরাই ছিল আগুয়ান।

কিন্তু দুঃখিত, তাদেরও আশা নেই। করোনার পরে বঞ্চনার অর্থনীতি আরও নিষ্ঠুর হবে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত তরুণ বেকার থাকবে এবং জীবনমান পড়ে যাবে কোটি কোটি মানুষর। যদি না মানুষ নতুন ও উন্নত বন্দোবস্তের জন্য নিয়ম বদলাতে বাধ্য করে রাষ্ট্রকে। প্রলেতারিয়েত আর প্রিক্যারিয়েত হলো সোনার কাঠি–রুপার কাঠি। এই দুই বঞ্চিতরা এক হলেই দুনিয়া মানবিক হবে আরেকটু, নচেৎ নয়। সেই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে হাজির হয়েছে এবারের মে দিবস। লকডাউনের জন্য অশ্রমিক অনেক মানুষও এবার দারিদ্র্যে, বেতনহীনতায়, অভাবে পড়েছেন। শ্রমিক জীবনের দুর্দশার সঙ্গে প্রিক্যারিয়েতেরও পরিচয় ঘটছে।

রক্ত আর কাজলের গল্প তাই আরও তীব্র হবে, ট্র্যাজিক হবে। আবার সোনার কাঠি ও রুপার কাঠির মিলনে ভবিষ্যত জ্বলে উঠতে পারে। মানুষের অসাধ্য কিছু নাই।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক
faruk.wasif@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন