বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

নতুন আইনে চালকের সহকারীর পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা আছে। টেকসই মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশলগত লক্ষ হিসেবে আমরা দাবি করে আসছি, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বর্ধিত করার। একটা নতুন আইনে মাত্র পঞ্চম শ্রেণির পরই শিক্ষার্থীকে স্থায়ীভাবে কাজে উন্মুক্ত করার আয়োজন করা হয়েছে। স্কুলকালীন বয়সে হেলপার হওয়া এ শিশুশ্রমিক কীভাবে শিক্ষাকে এগিয়ে নেবে? এ আইনে শিশুশ্রম ও দুর্নীতিকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানের লাখ লাখ চালক, যাঁদের অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, তাঁদেরও ভুয়া ও জাল শিক্ষা সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে। তৈরি করেছে নতুন আরেকটা ঘুষের শাখা। সস্তা ও উদ্দেশ্যহীন আইন তৈরির বড় দৃষ্টান্ত এটি।

আইনের প্রয়োগ কাঠামোয় আস্থাহীনতা
সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তির আহত বা প্রাণহানি ঘটলে তা ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩০৪ ধারা অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে। কিন্তু দণ্ডবিধির কোন ধারায় মামলা হবে, তদন্ত কর্মকর্তা তা সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবেন। দুর্নীতি-ঘুষ ও তদবিরভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো এবং দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেশে কোনোভাবেই এ আশা রাখা যায় না যে তদন্ত কর্মকর্তা যথেষ্ট সৎ হয়ে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। একদিকে বাংলাদেশে কম বয়সী আসামিকে সুবোধ দেখিয়ে সাজা কমানোর ব্যবস্থা আছে, আবার আছে যেকোনো সাজা মওকুফের নির্বাহী ক্ষমতা। অন্যদিকে অনির্ধারিত অর্থদণ্ড রেখে ঘুষ-দুর্নীতি সহযোগে চালক ও মালিকপক্ষের একচেটিয়া সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কর্মচারী ও পুলিশের ঘুষের দর-কষাকষির সুযোগও।

রেকর্ড খরচে বাস্তবায়িত অতি নিম্নমান রাস্তা, লাইসেন্সহীন অযোগ্য চালক, রাস্তার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বেপরোয়া গতি, ফিটনেসহীন ও দুর্ঘটনাপ্রবণ ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি, বেপরোয়া চালনা, অধিক যাত্রী ও পণ্য বহনে মালিকপক্ষের চাপ, মাফিয়া রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, রাস্তার ওপরেই গড়ে ওঠা বৈধ-অবৈধ ব্যবসা, রাস্তা ব্যবহারের নাগরিকদের বিশৃঙ্খলাসহ বহু কারণে সড়ক পরিবহন হয়েছে মরণফাঁদ। অথচ আইনে এসব পক্ষকে অব্যাহতি দিয়ে শুধু চালকের শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য। আবার দেখা যাচ্ছে, চালক ও হেলপারের দৈনিক সর্বোচ্চ শ্রমঘণ্টার বিধান, এমনকি পরিবহনের দৈনিক সর্বোচ্চ কর্মঘণ্টার বিধানও রাখা হয়নি। ফলে বিষয়বস্তুর দিক থেকে আইনটি কাঠামোগতভাবেই ত্রুটিপূর্ণ।

ড্রাইভিং শিক্ষা ও লাইসেন্স প্রাপ্তিকে প্রতিষ্ঠানগত ভিত্তি না দেওয়া
দরকার ছিল অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক শিক্ষার সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে আইনি কাঠামো তৈরি করা। সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক মান রেগুলেশনের মাধ্যমে ড্রাইভিং শিক্ষার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। লাইসেন্স প্রাপ্তিকে দক্ষতানির্ভর ঘুষমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া। বলতে গেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের মানসম্পন্ন অনলাইন-অফলাইন কারিকুলাম, শিক্ষণপদ্ধতি বাংলাদেশে নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, রাস্তায় সাইনই নেই খুব একটা, নেই মোড়গুলোর প্রায়োরিটি নির্দেশনা, নেই গতি ব্যবস্থাপনা, নেই সার্ভিস লেন, মহাসড়কে ঢোকার বা বের হওয়ার লেন নেই, এমনকি নেই লেন শনাক্তকারী লাইন; নেই ওভারটেক রেখাও। আইনে এ কারিগরি ব্যবস্থাপনাগুলো নিশ্চিত করার কথা বলা হয়নি।

দুর্নীতি-ঘুষ ও তদবিরভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো এবং দুর্বৃত্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতির দেশে কোনোভাবেই এ আশা রাখা যায় না যে তদন্ত কর্মকর্তা যথেষ্ট সৎ হয়ে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। একদিকে বাংলাদেশে কম বয়সী আসামিকে সুবোধ দেখিয়ে সাজা কমানোর ব্যবস্থা আছে, অন্যদিকে অনির্ধারিত অর্থদণ্ড রেখে ঘুষ-দুর্নীতি সহযোগে চালক ও মালিকপক্ষের একচেটিয়া সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।

আধুনিক ড্রাইভিং কোর্সে অন্তত চারটি বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক শিক্ষাদান ও মূল্যায়নের বিধান রাখা হয়। ক. সড়ক নিরাপত্তার ধারণা (রোড সেফটি) খ. ট্রাফিক সাইন ও সংকেত গ. প্রায়োরিটি (যেমন-১. সবার আগে পথচারী, তারপর ইঞ্জিনবিহীন যান, তারপর গণপরিবহন এবং সর্বশেষে যাত্রী ও পণ্যবাহী) ২. তিন, চার বা পাঁচ রাস্তার মোড়ের প্রায়োরিটি ঘ. গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ ও সমস্যা সমাধান (হ্যাজার্ড প্রোটেকশন-ব্রেক ও এক্সিলারেশনের ব্যবহার)। বিআরটিএর গাড়ির ফিটনেস যাচাই মানও খুবই নিম্ন পর্যায়ের। মানহীন ফিটনেস পরীক্ষার ফলাফল রাস্তার দুর্ঘটনা। এত নিম্নমানের ফিটনেস ব্যবস্থা যে টায়ার গ্রিপের পুরুত্বটাও মাপার ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ লাইসেন্স প্রদানে এক মাফিয়া চক্রকে উপড়ে ফেলে একটি সুন্দর স্বচ্ছ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরিতে আইনটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

নাগরিক সমাজের পরামর্শ ছিল দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ির ফিটনেস যাচাই, দুর্ঘটনার তদন্ত ও মামলা দায়েরে শুধু ‘তদন্ত কর্মকর্তা’র ইচ্ছানির্ভর দুর্নীতির সহায়ক অবিচারের ব্যবস্থা বহাল না রেখে সেখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের ভেটো ক্ষমতাসহ সংযুক্ত করা। সাজা নির্ধারণেও মানা হয়নি নাগরিক দাবি। বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শুধু সামাজিক মাধ্যমে কটূক্তিকে অপরাধ বিবেচনা করে সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার বিধান আনা হয়েছে। আর একই সরকারেরই একটি নতুন আইনে সড়কে প্রাণহানিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের শাস্তি এবং অনির্ধারিত অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে। শাসকদের রাজনীতি সুরক্ষার বিপরীতে নাগরিকের প্রাণ সুরক্ষার দাম এতই নিতান্ত এ দেশে!

চালক ও পরিবহনশ্রমিকও ভালো নেই
ব্যাপক চাঁদাবাজির কারণে কম ট্রিপে বেশি মাল ও যাত্রী পরিবহনের ঝোঁক প্রাধান্য পায়। উন্নয়নপ্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে যানবাহনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশস্ত লেন, সহনীয় বাঁক, সমতল পিঠ নির্মাণ করা হয় না। সড়কে ঢোকা ও বের হওয়ার জন্য আলাদা লেন নেই, রাস্তায় সার্ভিস লেন নেই, নেই বাস বা ট্রাকের স্ট্যান্ড, সাইডের লেন ওঠানামার জন্য প্রশস্ত নয়। নেই নিম্নগতির বাহনের জন্য আলাদা রাস্তা, চুরি করতে গিয়ে রাস্তা প্রশস্ত না করে হাঁটার জায়গাও পিচঢালাই পথে দখল হয়ে পড়ে। এই সমস্যা হচ্ছে অদূরদর্শী অবকাঠামো, বাস্তবায়নকারীদের চুরি ও ব্যক্তির ব্যবসায়িক লাভের চাহিদাসহ বহুমাত্রিক হীনতার প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক আচরণের মিশ্রণ। ফলে অতি নিম্নমানের রাস্তায় অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা নেওয়া চালক নিজেও বড্ড নিরাপত্তা ঝুঁকিতে গাড়ি চালান।

যানজটে ব্যয়িত শ্রমঘণ্টা এবং পণ্য নষ্টের ফলে চাঁদাবাজি এবং যানজটে ব্যয়িত ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে একই বাস, ট্রাক দিয়ে বেশি ট্রিপ দিতে বাধ্য হন চালক। এতে এমনিতেই অনিরাপদ সড়কে যেনতেনভাবে ফিটনেসহীন গাড়ি চালিয়ে, একটানা দীর্ঘ সময় ঘুমহীন পরিশ্রান্ত চালক ও হেলপারকে গন্তব্যে পৌঁছার আর্থিক, মানসিক ও স্বাস্থ্যগত তাড়নাগুলো তাড়িয়ে বেড়ায়।

ব্যাপক গরম, দূষিত বায়ু, ধূলিময় রাস্তা, দীর্ঘ যানজট, অধিক ট্রিপের বাধ্যবাধকতা, অনিয়মিত কিংবা স্বল্প আহার, মালিকের গালিগালাজ, যাত্রীর ভিড় ও ভাড়াসংক্রান্ত টানাপোড়েন, অধিক ভাড়া আদায়ের চাপে অবসরহীন একটানা পরিশ্রম, ক্লান্তি দূর করতে ব্যাপকভাবে মাদক গ্রহণ—সব মিলিয়ে খুবই নিম্নমানের, অস্বাস্থ্যকর ও অমানবিক জীবন যাপন করে থাকেন পরিবহনশ্রমিক। যেখানে যাত্রী, পথচারী ছাড়াও সড়কে প্রাণ যায় চালক, হেলপারদেরও। পরিশেষে বলতেই হয়, আমাদের সড়কগুলো হচ্ছে প্রাণহানির এক সাক্ষাৎ উপকরণ। ত্রুটিপূর্ণ আইন দিয়ে এ সংকট থেকে বেরিয়ে আসা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক। ‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ অর্থনীতির ৫০ বছর’ গ্রন্থের রচয়িতা। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন