বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

লেখক মুশতাক আহমদ, সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল কিংবা কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে, এমন কোনো কাজ করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। ব্যক্তিগতভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত মনে করলে তিনি মানহানির মামলা করতে পারতেন। তারপরও ডিজিটাল আইনে মামলা দিয়ে লৌহপ্রাচীরের ভেতরে আটকে রাখা হলো। এর মধ্যে মুশতাক গত ফেব্রুয়ারিতে কারাগারেই অসুস্থ অবস্থায় মারা যান। ছয়বার তিনি জামিনের আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। আর একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম বাসা থেকে অফিসে যাওয়ার পথে অপহৃত হন। কয়েক মাস পর তাঁর খোঁজ মেলে বেনাপোল সীমান্তে; প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় বিনা পাসপোর্ট আইনে। এরপর এক সাংসদের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তিনি বর্তমানে জামিনে আছেন। এখনো মামলার খড়্গ ঝুলছে। কার্টুনিস্ট কিশোরও জামিন পেয়েছেন। কিন্তু তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়েছে।

এর আগে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, যঁারা আইনের অপব্যবহার করেছেন, তঁাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা যায়নি। ২৯ ডিসেম্বর ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) বার্ষিক সাধারণ সভায় তিনি বলেছেন, ‘আপনারা হয়তো জিজ্ঞাসা করবেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার রোধে কী পদক্ষেপ নিয়েছি? গত বছরই ইউনাইটেড নেশনসে ডায়ালগ শুরু করেছি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার বন্ধে করণীয় কী হতে পারে, সেটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বেস্ট প্র্যাকটিস যাতে হয়, আইনের ক্ষমতাবলে বিধিতে সেসব রাখা যাবে, যাতে আইনের অপব্যবহার না হয়।’

আইনমন্ত্রী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধে জাতিসংঘে মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করছেন। কিন্তু ২০১৮ সালে আইনটি জারির সময় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে যেসব আপত্তি তোলা হয়েছিল, তা আমলে নেননি। সাংবাদিকেরা যেহেতু জাতিসংঘের মতো শক্তিশালী নন, সে কারণে তঁাদের সঙ্গে আলোচনারও প্রয়োজন বোধ করেন না আমাদের নীতিনির্ধারকেরা।

আইনমন্ত্রী যখন সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেছেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না, তখন বাস্তব অবস্থা কী? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন আর্টিকেল নাইনটিনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ২০২০ সালের চেয়ে ২০২১ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। সাংবাদিকেরাও বেশি মামলা-হয়রানির শিকার হয়েছেন। তঁাদের তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছিল ৬৩১টি, এর মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২১৩টি। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১৭২টি মামলায় আসামি হয়েছেন ৩১২ জন, যাঁদের মধ্যে সাংবাদিক ৭০ জন।

অন্যদিকে ২০২১ সালে (জানুয়ারি-নভেম্বর) মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে ৪৪২টি। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের সংখ্যা ৪৬২। এর মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে ২২৫টি, আসামি ৪১৭। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৩২টি মামলায় আসামি ৬৮ জন। এ সময় মানহানি ও হয়রানিমূলক হামলা হয়েছে ৩৮টি এবং ভুক্তভোগী সাংবাদিক ১৩৩ জন। আর্টিকেল নাইনটিনের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে আটক আছেন ২৬ জন।

দেখার বিষয় হলো, যে ২৬ সাংবাদিক বর্তমানে কারাগারে আটক আছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের আইনমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়ার আগেই গ্রেপ্তার করেছিল কি না? এর আগে আইসিটি আইন ও মানহানি মামলার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। সরকার বলছে, পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমতি ছাড়া মানহানি মামলায় কোনো সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা যাবে না, কিন্তু মামলা হওয়ামাত্র পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রধান আপত্তির বিষয় হলো এই আইনের ১৪টি ধারাই হলো অজামিনযোগ্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একবার মামলা করে কাউকে জেলে পাঠালে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন।

আইনমন্ত্রী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার রোধে প্রয়োজনে বিধি সংশোধনের কথা বলেছেন। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে আইনের যথেচ্ছ ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু আমরা মনে করি, আইনটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, অপব্যবহার হবেই। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কোনটি হুমকি কিংবা কার কথা অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবে, সেই বিচার কে করবেন? পুলিশ না আদালত? সুনামগঞ্জের ঝুমন দাশ তো ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরকে স্বাগত জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন, তারপরও তঁার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা ঠুকে ১০ মাস তঁাকে জেলে রাখা হয়েছিল। অতএব শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা না করে সরকারের উচিত আইনটি পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া। ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে যেসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, প্রচলিত আইনেই তার বিচার করা সম্ভব। এ জন্য ডিজিটাল আইনের প্রয়োজন নেই।

  • সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

    [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন