বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে এই নেতিবাচক অবস্থানের মধ্যেও মন্দের ভালো একটি উপাদান আছে। রাজনীতির প্রধান এই দুই প্রতিপক্ষ—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউই কমিশন গঠনের আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। অতীতেও তারা তা প্রয়োজনীয় মনে করেনি এবং আইন তৈরির চেষ্টাও করেনি। আইন না থাকলে তাদের যে কিছুটা সুবিধা হয়, সেটা বোধ হয় নতুন করে বলার অবকাশ নেই। অবশ্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য কমিশনকে পর্যাপ্ত ক্ষমতা দেওয়ার পরও যে কমিশন ও সরকার সব সময় নির্বাচনী আইন মেনে চলেছে, সে কথাও বলা যাচ্ছে না। কেন বলা যাচ্ছে না, তার একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় বর্তমান কমিশনের একজন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সাম্প্রতিকতম এক বক্তব্যে।

২২ সেপ্টেম্বর মাহবুব তালুকদার বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া নির্বাচন নিয়ে চলমান অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। নিজ কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনে বহু দলের অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের কারণ বিশ্লেষণ করে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ অনিবার্য। ভোটারদের নির্বাচনবিমুখতাও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। তিনি বলেন, এই সবকিছুর সঙ্গে নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনা জড়িত। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সার্বিকভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর নির্ভর করে না। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।

প্রধান দুই প্রতিপক্ষ—আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কেউই কমিশন গঠনের আইনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। অতীতেও তারা তা প্রয়োজনীয় মনে করেনি এবং আইন তৈরির চেষ্টাও করেনি। আইন না থাকলে তাদের যে কিছুটা সুবিধা হয়, সেটা বোধ হয় নতুন করে বলার অবকাশ নেই।

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের কথায় স্বীকারোক্তি আছে যে মানুষ নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় আস্থা হারিয়ে ফেলায় এখন নির্বাচন শুধু যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হয়েছে তা-ই নয়, ভোটাররাও ভোটবিমুখ হয়ে পড়েছেন। নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার দায় মেনে নিয়েও তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া অবস্থা বদলানো সম্ভব নয়। তিনি যে এবারই প্রথমবারের মতো এই কঠিন বাস্তবতার কথা বললেন, তা নয়; দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সব কটি নির্বাচনের পর তিনি এ ধরনের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন, যা তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক দল কিংবা নাগরিক গোষ্ঠীগুলোর কেউই তাঁর বক্তব্যকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি। হতে পারে ক্ষমতাসীন দলের দাপটের মুখে এ ধরনের অপ্রীতিকর বিষয়ে কথা বলে কেউই সরকারের রোষানলে পড়তে চাননি। সংসদে ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন এবং জাসদের প্রয়াত নেতা মইন উদ্দীন খান বাদল নিজেরা কীভাবে ভোট ছাড়াই বিজয়ী ঘোষিত হয়েছিলেন, সে প্রশ্ন করে তিরস্কৃত হয়েছিলেন, সে কথা আমরা সবাই জানি।

নতুন কমিশন গঠনের সময় ঘনিয়ে আসায় এখন আর বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই। সুতরাং আলোচনা শুরু ও সম্ভাব্য সমাধানের একটি প্রস্তাব তুলে ধরার জন্য বিবৃতিদাতা বিশিষ্ট নাগরিকদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। তাঁদের বিবৃতিতেও বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন ব্যবস্থায় মানুষের আস্থা ফেরাতে নির্বাচন কমিশন এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে, যেটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়।’ প্রশ্ন হচ্ছে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর উপায় কী? সেই সমঝোতা বা জাতীয় ঐকমত্যের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার কোনো আগ্রহ ও আন্তরিকতা আছে কি?

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার শর্ত ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ঐকমত্য নির্বাচনের জন্য কতটা জরুরি, তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। এ সমঝোতার কারণেই গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হলেও ১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচন কলঙ্কচিহ্ন হয়ে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে কোনো আইন তৈরি ছাড়াই রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর অধীনে নির্বাচন মোটামুটি সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। বিপরীতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে যখনই মতানৈক্য হয়েছে, তখনই তা সমস্যার জন্ম দিয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেনের কথায়, ‘ক্ষমতাসীন দলের গঠিত নির্বাচন কমিশন দ্বারা ও ক্ষমতাসীন দলের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।’ ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট এবং ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে বিরোধের মূলেও আছে রাজনৈতিক সমঝোতার তোয়াক্কা না করে একতরফা পদক্ষেপ গ্রহণ। আর সমঝোতার অর্থ যে শুধু আনুষ্ঠানিক সংলাপ নয়, পারস্পরিক আস্থা অর্জনের বিষয়, তা-ও বলার অপেক্ষা রাখে না।

তা ছাড়া শুধু নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতাই কি আমাদের একমাত্র চাওয়া? দেশে আমরা কী ধরনের গণতন্ত্র চাই, সেটাও নির্ধারণ করা জরুরি। স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল কি হাইব্রিড গণতন্ত্র? রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার মতো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীশাসিত ব্যবস্থা? সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য কি শুধু নির্বাহী বিভাগের কাজগুলো অনুমোদন করা? সংসদের কাছে মন্ত্রীদের জবাবদিহির আবশ্যকতার বিষয়েও কি সমঝোতার অবকাশ নেই?

শুধু নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতাই কি আমাদের একমাত্র চাওয়া? দেশে আমরা কী ধরনের গণতন্ত্র চাই, সেটাও নির্ধারণ করা জরুরি। স্বাধীনতার লক্ষ্য ছিল কি হাইব্রিড গণতন্ত্র? রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থার মতো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীশাসিত ব্যবস্থা? সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের লক্ষ্য কি শুধু নির্বাহী বিভাগের কাজগুলো অনুমোদন করা?

সাখাওয়াত হোসেন উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে নির্বাচন কমিশন গঠনে যেসব সংস্কার হয়েছে, সেগুলোর নজির টেনে আমাদেরও আইন করার প্রয়োজনের কথা বলেছেন (‘উপমহাদেশের অভিজ্ঞতায় ইসি গঠনে নতুন ভাবনা’, প্রথম আলো, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১)। তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমান পদ্ধতিতে শাসক দলের প্রভাবে নির্বাচন কমিশন নিয়োগের পর থেকে যে বিতর্ক হচ্ছে, তা অবসানে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কমিশন গঠনের বিকল্প নেই।’ কিন্তু কার্যকর বিরোধী দলহীন সংসদ, যেখানে অর্থবহ বিতর্কের কোনো নজির নেই; সেখানে ভারসাম্যহীন আইন তৈরির আশঙ্কাই কি প্রবল নয়? কথিত সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসনে একতরফা সিদ্ধান্ত আরোপের যে ঝুঁকি, তা যে রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়িয়ে দেবে না, তার নিশ্চয়তা কী? তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপের সিদ্ধান্তে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সদস্যদের মতামতও যে নাকচ হয়ে গিয়েছিল, তা নিশ্চয়ই আমরা বিস্মৃত হইনি। একতরফা সিদ্ধান্তের খেসারতই কি বর্তমান সংকটের কারণ নয়?

এ পটভূমিতে মাহবুব তালুকদারের মন্তব্য, রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া এ অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। ‘নির্বাচন ব্যবস্থার সর্বনাশ সাধনের জন্য বিপুলভাবে সমালোচিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদাও এখন সব দলের ঐকমত্যের কথা বলছেন। ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছেন, নতুন কমিশন হওয়া উচিত সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। এসব বক্তব্য উপেক্ষণীয় নয়। নির্বাচন কমিশন গঠনে আইনের দাবি বা আলোচনার আগে তাই রাজনৈতিক সমঝোতার কথাটিও বলা দরকার। অন্যথায় প্রত্যাশিত ফল না–ও মিলতে পারে এবং তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশিও হতে পারে।

কামাল আহমেদ সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন