নির্বাচন

আওয়ামী লীগের ভেতরের কোন্দল

বিজ্ঞাপন

গত সপ্তাহে ঠাকুরগাঁও থেকে বাসে ঢাকায় আসছিলাম। ভোর ছয়টায় যে বাস ঢাকা পৌঁছানোর কথা, সেটি এল সাড়ে নয়টায়। দিনের আলোয় রাস্তার দুই পাশজুড়ে বিভিন্ন ধরনের পোস্টার-ব্যানার চোখে পড়ল। আগামী সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের পোস্টারই বেশি। তাঁরা এলাকাবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনের জন্য দোয়া চেয়েছেন। শুধু পোস্টারে নয়, মুঠোফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েও কেউ কেউ আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করে লিখেছেন, ‘আপনার সহযোগিতা চাই।’

নতুন মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ার অর্থ, আগের মনোনয়নপ্রাপ্ত তথা বর্তমান সাংসদের প্রতি অনাস্থা। বর্তমান সংসদে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। সবাই হয় আওয়ামী লীগের টিকিটে অথবা সমর্থনে নির্বাচন করে জয়ী হয়েছেন। কিন্তু পাঁচ বছর পর এসে দলের ভেতর থেকেই অনেকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী হিসেবে যাঁরা জয়ী হয়েছেন, তাঁদেরও কারও কারও বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ-অসন্তোষ রয়েছে। প্রথম আলো ‘নির্বাচনের রাজনীতি’ নামে ধারাবাহিকভাবে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে, তাতে বর্তমান সাংসদদের বিরুদ্ধে দলের একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর নাম এসেছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, সাংসদদের মধ্যে যাঁরা ভালো কাজ করেছেন, তাঁরা মনোনয়ন পাবেন। যাঁরা ভালো কাজ করেননি, যাঁদের নিয়ে এলাকায় বদনাম ও বিতর্ক আছে, তাঁরা মনোনয়ন পাবেন না। এরপর থকেই দলটির ভেতরে-বাইরে গুঞ্জন শুরু হয়, কে মনোনয়ন পাবেন, কে পাবেন না। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) একটু নড়েচড়ে বসে। ব্যবসায়ী ও বিরোধী দলের নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন সাংসদকেও দুদকে তলব করা হয়। বলাবলি হচ্ছে দুদক যাঁদের তলব করেছে, আগামী নির্বাচনে তাঁরা মনোনয়ন পাচ্ছেন না। অবশ্য দুদক সত্যিই দুর্নীতিবাজদের ধরতে চায় কি না, তা হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই জানা যাবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা শুরু থেকেই বলে আসছেন, আগামী নির্বাচন ২০১৪ সালের মতো হবে না। দলটি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে
বিএনপি নির্বাচনে আসবে ধরে নিয়েই। জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনেই দলীয় প্রার্থী দেবে, এরশাদ এমন কথা বললেও অন্তরালে আওয়ামী লীগের
কাছ থেকে আগের চেয়ে বেশি আসন নেওয়ার জন্য দর-কষাকষি করছেন।

এ অবস্থায় স্থানীয় আওয়ামী লীগে চাপান-উতোর শুরু হওয়া স্বাভাবিক। কোথাও কোথাও স্থানীয় সাংসদদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাংশ। যেমন, বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনের সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর নেতৃত্বকে দলের জন্য অনিরাপদ ও বিপজ্জনক দাবি করে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে জেলা আওয়ামী লীগের একটি পক্ষ। তাঁরা এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর বিরুদ্ধে ২৪ দফা দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ দেন। তাতে বলা হয়, ‘গত কয়েক বছর ধরে বরগুনার আওয়ামী লীগে জেলা সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু দলকে পারিবারিকীকরণ করে সীমাহীন দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যহার এবং দলের ত্যাগী ও প্রকৃত নেতা-কর্মীদের কোণঠাসা করে ভোগবাদী অপরাজনীতির সূচনা করেছেন। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বরগুনায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির দীর্ঘদিনের সুনাম ও পরিচ্ছন্ন ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, তাঁর পরিবার এবং তাঁর অপকর্মের সহযোগী কতিপয় নেতার এই অপকর্মের দায়িত্ব গোটা দল কিছুতেই কাঁধে নেবে না।’

উল্লেখ্য, দক্ষিণাঞ্চলের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এর আগে খাদ্য উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ৩০ বছর ধরে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি।

এদিকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও  জামায়াতে ইসলামীকে প্রতিষ্ঠা করার অভিযোগ এনে দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সাংসদ মনোরঞ্জন শীলকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে বীরগঞ্জ-কাহারোল আওয়ামী ঐক্য পরিষদ। বুধবার বিকেলে বীরগঞ্জ-কাহারোল আওয়ামী ঐক্য পরিষদের সভাপতি হামিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে তাঁকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। সেখানে বক্তৃতা করেন বীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকারিয়া, সাবেক সাংসদ ও উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম, সাবেক সাংসদ আবদুল মালেক সরকার, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আবু হোসাইনসহ আওয়ামী লীগের নেতারা। এর আগে একটি বিক্ষোভ ও ঝাড়ু মিছিল বীরগঞ্জ উপজেলার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন থেকে প্রায় ১১ হাজার নেতা-কর্মী বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন।

বহু আসনেই সাংসদদের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধ এখন ‘ওপেন সিক্রেট।’ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দফায় দফায় বৈঠক করে, হুমকি-ধমকি দিয়েও এই বিরোধ যে মেটাতে পারছে না, তারই কিছুটা আভাস পাওয়া গেল বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায়। সেখানে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘দলের নেতা-কর্মী যাঁরা আছেন, তাঁদের যদি স্থানীয় সংসদ সদস্য বা দলের নেতাদের প্রতি কোনো বক্তব্য থাকে, সেটা লিখিত আকারে দলকে জানাতে পারেন। কিন্তু সেটা না করে এলাকায় দলের সংসদ সদস্যদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা, তাঁদের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করা, এটি দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী। সবাইকে দলের নিয়ম মেনে চলতে হবে, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করা যাবে না।’ (প্রথম আলো, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮)

নির্বাচন সামনে রেখে দলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন হবে বলে মনে হয়। অনেকেই মনে করেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিরোধের পেছনে কোনো না কোনো প্রভাবশালী নেতার ইন্ধন আছে। একজন প্রভাবশালী নেতা সাংসদের পক্ষে অবস্থান নিলে অন্যজন তাঁর বিরোধী গ্রুপকে সমর্থন করেন। এই ধারা চলে আসছে বহু বছর ধরেই। দলের সাংগঠনিক নেতারা সভানেত্রীর কাছে যেই প্রতিবেদন দিয়েছেন, তাতে প্রকৃত চিত্র থাকে বলে মনে হয় না। অন্যান্য অঞ্চলের সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব বরগুনা ও পীরগঞ্জের মতো বিস্ফোরণোন্মুখ না হলেও অনেক স্থানেই ঝড়ের আলামত পাওয়া যাচ্ছে।

গত বছরের ১৪ জানুয়ারি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় স্থানীয় নেতারা কী বলেছিলেন, সাংসদদের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ এনেছিলেন, সেটি একবার খতিয়ে দেখলেই কেন্দ্রীয় নেতারা বুঝতে পারবেন স্থানীয় নেতাদের পারস্পরিক সন্দেহ–অবিশ্বাস কত ভয়াবহ। সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা দৌলার অভিযোগ ছিল, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতি করছি। রাজনীতির জন্য শ্রম, ঘাম এবং অর্থ ব্যয় করলাম, কিন্তু হঠাৎ করে আপনারা (কেন্দ্রীয় নেতা) একজনকে সাংসদ বানিয়ে দেন। কিন্তু কেন?’ ধামরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন স্থানীয় সাংসদ অাব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনেন, সেটি আরও গুরুতর। সাংসদ নাকি মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকেই তাঁর নাম কেটে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃত্বের কোন্দলের আরেকটি উদাহরণ টাঙ্গাইল–৩ আসন। সেখানকার সাংসদ আমানুর রহমান ওরফে রানা টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহম্মেদের খুনের দায়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। এ খুনের ঘটনা ঘটে ২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি। দশম সংসদ নির্বাচন হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। এরপরও তিনি মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন এবং নির্বাচিতও হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে খুনসহ ৪৬টি মামলা আছে। কক্সবাজারের সাংসদ আবদুর রহমান বদি। তাঁর বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও মাদক ব্যবসার অভিযোগ আছে। সরকার যখন মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে এবং বন্দুকযুদ্ধে বহু মাদক ব্যবসায়ী নিহত হন, তখন সাংসদ বদি সৌদি আরব যান ওমরাহ পালন করতে। অনেকের ধারণা, অভিযান থেকে রেহাই পেতে তিনি সৌদি আরব গিয়েছিলেন।  

আগামী নির্বাচনেও কি আমানুর-বদিরা আওয়ামী লীগের কাছে বাঞ্ছিত প্রার্থী হবেন?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

sohrabhassan55@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন