default-image

আমাদের আমেরিকান বন্ধুরা তাঁদের প্রেসিডেন্ট কে হতে যাচ্ছেন তা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। তাঁরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই বলে আসছেন, ট্রাম্প একজন অসুস্থ লোক, একজন ফ্যাসিবাদী লোক, একজন কুৎসিত রুচির মানুষ। আমার আমেরিকান বন্ধুদের অনেকেই ট্রাম্পকে একজন যথার্থ প্রেসিডেন্টের ‘বিদ্বেষপূর্ণ প্যারোডি’ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।

দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কারণে যেসব দেশ নিরন্তর দুর্ভোগের শিকার হয়ে এসেছে, তার অন্যতম একটি দেশের একজন হতভাগ্য নাগরিক হিসেবে আমি আমার আমেরিকান বন্ধুদের বলতে চাই, গত ৫০ বছরে যাঁরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে ট্রাম্পের খুব বেশি অমিল নেই।

বিজ্ঞাপন

আমেরিকান ‘উদারপন্থীরা’ দাবি করে থাকেন, তাঁরা ট্রাম্পের চেয়ে ভালো মানুষ। আমি অনেক আমেরিকানকে দেখেছি, যাঁরা ‘ট্রাম্পের চেয়ে আমরা মানুষ হিসেবে ভালো’—এমন কথা কেউ একজন বললেই বলে ওঠেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সন্দেহ নেই ট্রাম্পের চেয়ে আমরা ভালো মানুষ’। আমি তাঁদেরই বলতে চাই, ট্রাম্পের আগে যাঁরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের শব্দচয়ন হয়তো ট্রাম্পের চেয়ে ভালো ছিল, তাঁরা হয়তো ট্রাম্পের চেয়ে মানানসই স্যুট পরতেন, তাঁরা হয়তো ট্রাম্পের চেয়ে একটু বেশি নিখুঁতভাবে পার্টিতে নাচতে পারতেন, তাঁরা হয়তো ট্রাম্পের মতো কর ফাঁকিবাজ ছিলেন না, কিন্তু গোটা বিশ্বকে ভয়ভীতি দেখানো ও হুমকি–ধমকি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা ট্রাম্পের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন না।

আসলে মার্কিন নাগরিকেরা প্রথম থেকেই কার্যত একেকজন উত্ত্যক্তকারীকে নির্বাচিত করে এসেছেন। তাঁরা সেই উত্ত্যক্তকারীর হাতে প্রায় সীমাহীন ক্ষমতা দেন এবং আমেরিকার বাইরে যথার্থ আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাজ করতে বলেন। ‘যথার্থ আমেরিকান প্রেসিডেন্টের কাজ’ সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়ে মার্কিন নাগরিকেরা যেটি বলেন, তা হলো: ‘আমরা ছাড়া বাকি সবাই খারাপ। যাও, খারাপদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাও।’ আমেরিকানরা চান তাঁদের প্রেসিডেন্ট সারা বছর বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে যুদ্ধংদেহী আচরণ করবেন; একই সঙ্গে দেশের ভেতরের মানুষের সঙ্গে অতি বিনয়ী আচরণ করবেন, আমেরিকানদের স্বপ্ন নিয়ে বারবার কথা বলবেন এবং স্বাস্থ্যসেবা সবার সামর্থ্যের মধ্যে রাখার কথা বলবেন।

বছরের পর বছর মার্কিন প্রেসিডেন্টরা এমন অনেক দেশকে ঠান্ডা মাথায় ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে স্বৈরাচারী সরকারকে বসিয়েছেন যে দেশগুলোর নামও সেই প্রেসিডেন্টরা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারতেন না। ট্রাম্পের সঙ্গে আগের প্রেসিডেন্টদের ফারাক হলো, আগের প্রেসিডেন্টরা আমেরিকার বাইরের মানুষকে ধমক দিতেন, ভয় দেখাতেন আর ট্রাম্প সেই ভয় দেখানোর কাজটা আমেরিকার ভেতরেই করেছেন।

আমি শৈশবে প্রথম যে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম শুনেছিলাম, তিনি হলেন নিক্সন। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর নিক্সনকে গদি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় বাংলাদেশিদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছিল। নিক্সন এই গণহত্যা বন্ধ করতে হস্তক্ষেপ করবেন বলে বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি চোখ বন্ধ করে ছিলেন। জিমি কার্টারকে সবচেয়ে ভদ্র প্রেসিডেন্ট বলা হয় এবং তাঁর শাসনামলেই ‘মানবাধিকার’ শব্দটি প্রথম শোনা যায়। কিন্তু আমি যেখানে বাস করি, সেই পাকিস্তানে সেই সময় সামরিক একনায়ক জিয়াউল হক নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বিচারের নামে প্রহসন করে ফাঁসি দেন। এ ঘটনায় নিন্দা না জানিয়ে জিমি কার্টার জিয়াউল হককে কয়েক লাখ ডলার সহায়তা দিতে চেয়েছিলেন।

রোনাল্ড রিগ্যান সারা বিশ্বে টাকাপয়সা ছড়িয়ে রাতারাতি আমেরিকাকে বিশ্বদরদি দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি নিজেকে ‘মুক্ত বিশ্বের নেতা’ হিসেবে উল্লেখ করতেন। তিনি বিশ্বকে তাঁর ভাষায় আরও মুক্ত করতে চিলির স্বৈরশাসক পিনোশে এবং পাকিস্তানের জিয়াউল হককে দেউলিয়া করে ছেড়েছিলেন।

রিগ্যান আফগানিস্তানের মুজাহিদিনদের যখন তহবিল সরবরাহ করা শুরু করেন, তখন আমার বয়স ছিল ১১ বছর। এখন আমার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছে এবং আজ যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় প্রজন্ম সেই আফগানিস্তানের সঙ্গে লড়াই করছে এবং সমঝোতার আলোচনাও করছে। অন্যদিকে আফগানিস্তানের চতুর্থ প্রজন্ম শরণার্থীশিবিরে অনাহারে বড় হচ্ছে এবং কবে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণভাবে সবকিছু গুটিয়ে যাবে, সেই আশায় দিন গুনছে।

জর্জ বুশ সিনিয়র গদিতে বসেই তাঁর ক্ষেপণাস্ত্র ও যুদ্ধবিমানের গোলা তারাবাজির মতো ছুড়ে বাগদাদের আকাশকে আলোকোজ্জ্বল করে তুলেছিলেন। তিনি এক স্বৈরশাসকের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে সেই অর্থ দিয়ে সাদ্দাম হোসেনর মতো আরেক স্বৈরাচারকে সরাতে চেয়েছিলেন। এরপর বিল ক্লিনটন কী করলেন? সুদর্শন, মিষ্টভাষী ও বিনয়ী এই প্রেসিডেন্ট যখন মনিকা লিউনস্কির শ্লীলতাহানির জন্য অভিশংসনের মুখে পড়েছিলেন, তখন গণমাধ্যমের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য আফগানিস্তান ও সুদানে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

আমেরিকানরা নিশ্চিতভাবেই জর্জ বুশকে ভালোবেসেছিলেন, না হলে তাঁরা তাঁকে দুবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতেন না। বুশ বিশ্বাস করতেন, যুদ্ধই আমেরিকান প্রেসিডেন্টের প্রধান কাজ। ইরাক ও আফগানিস্তানকে তিনি তছনছ করেছেন। গুয়ানতানামো ও আবু গারিব কারাগারের মতো নিপীড়নখানা তিনিই চালু করেছিলেন। তিনি এখনো আমেরিকানদের চোখে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে আছেন।

ওবামা আমেরিকানদের সবচেয়ে প্রিয় প্রেসিডেন্টদের একজন। তিনি বুশের মতো হত্যার দায় না নিয়ে লিবিয়ায় মানুষ হত্যার দায়িত্ব অ্যালগরিদম ও ড্রোনের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। নোবেল শান্তিজয়ী ওবামার শাসনামলের শেষ দিকে মার্কিন ড্রোন থেকে ঘণ্টায় তিনটি করে বোমা লিবিয়া, আফগানিস্তান ও অন্যান্য স্থানে পড়ত।

ট্রাম্প যেটি করেছেন, সেটি হলো তিনি ব্যক্তিগত আচরণের মধ্য দিয়ে আমেরিকানদের আসল চেহারাকে নাঙ্গা করে দিয়েছেন, আমেরিকানদের চেহারাকে মাত্রাতিরিক্ত সাদা হিসেবে দেখিয়েছেন, ইংরেজিতে আমেরিকানদের ভাষাজ্ঞান খারাপ সেটি দেখিয়েছেন। আমেরিকানদের শারীরিক স্থূলতা ও বদমেজাজি চরিত্রকে খোলাসা করে দিয়েছেন।

এখন নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ট্রাম্প হেরে যান বা জিতে যান তাতে যুক্তরাষ্ট্রের আদি চরিত্র বদলাবে—আমেরিকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশগুলোর নাগরিকেরা তা মনে করছেন না।

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত, সংক্ষেপিত

মোহাম্মাদ হানিফ: পাকিস্তানের লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য পড়ুন 0