আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায় অতি অল্প সময়ে অনেক বেশি পরিমাণে বৃষ্টি হয়েছে। সেই বৃষ্টির পানি নেমে এসেছে ভাটির সমতলে, বাংলাদেশে। ভারতেও পাহাড় কেটে বন ধ্বংস করে নানা রকমের বসতি বা স্থাপনা বসেছে, কৃষিকাজ হচ্ছে। ফলে সেখানেও যেমন পাহাড়ধস ঘটছে বেশি, তেমনি সেখানকার জমিনও পানি ধরে রাখার ক্ষমতা হারাচ্ছে। এসব পাহাড় ধসা মাটি পাহাড়ি ঢলে নেমে আসছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের নদী ও প্লাবনভূমি পলি পড়ে উঁচু হয়ে গেছে। সেসবের পানি ধারণ করার ক্ষমতা ও পরিবহনক্ষমতা কমে গেছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাস্তাঘাট ও বাঁধ নির্মাণ। পানি নেমে যাওয়ার স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে এবারের বন্যা সম্পর্কে এলাকাবাসী বলছেন, এত বন্যা তাঁরা জীবনেও দেখেননি।

যেকোনো স্থাপনাই পরিবেশের স্বাভাবিকতা কিছু না কিছু ব্যাহত করবেই। আমরা যদি একটা টিনের ঘরও বানাই, তারও একটা প্রতিক্রিয়া আছে। সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে তা বায়ুস্তরকে উষ্ণতর করে তুলবে, বৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে যাওয়ার পরিসর কমিয়ে ফেলবে। কাজেই মানুষের যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রের ওপরে প্রভাব ফেলে। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের আমাদের গ্রামের বাড়িতে দুইটা গরুগাড়ি আর দুইটা নৌকা ছিল। শীতকালে আমরা গ্রামের বাড়ি গেলে চলতাম

গরুগাড়িতে, বর্ষাকালে বাড়িতে যেতে হতো নৌকায়। প্রতি বর্ষায় বাড়ির উঠানে পানি উঠতই, কোনো কোনোবার ঘরের মধ্যে পর্যন্ত ঢুকে যেত পানি। তারপর নদীতে বাঁধ হলো। এখন প্রতিবছর বন্যা হয় না। ফসল ফলে ব্যাপক। কিন্তু বাঁধের ভেতরে পলি জমছে। নদীর পানি বহন করার ক্ষমতা কমছে। হঠাৎ উজানে বেশি বৃষ্টি হলে বাঁধ ভেঙে যায়, বন্যা হয়। বন্যা হলে মানুষ অনেক বেশি অসহায় বোধ করে। কারণ, সাংবাৎসরিক বন্যার সঙ্গে বাস করার অভ্যাস, প্রস্তুতি, অভিজ্ঞতা এখন আমাদের গ্রামবাসীর নেই।

সারা পৃথিবীতে চলছে বাঁধবিরোধী প্রচারণা। চীনে, ভারতে, বাংলাদেশে বাঁধ নির্মাণ চলছেই। তবে ভারতের পরিবেশ-আন্দোলনকারীদের প্রতিবাদের মুখে টিপাইমুখ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়েছে। আপাতদৃষ্টে টিপাইমুখ বাঁধ কিন্তু উপকারী বলেই মনে হবে। কারণ, তা বর্ষাকালে পানি ধরে রাখবে, শীতকালে ছাড়তে থাকবে। কিন্তু পরিবেশবিদেরা বলেন, তা হাজার হাজার বছরের পরিবেশচক্রকে ভেঙে ফেলবে। বর্ষায় পানি আসবে, শীতকালে শুকনা থাকবে—এটাই প্রকৃতির নিয়ম। এ চক্র ভেঙে গেলে কী ঘটবে, তা আমরা জানি না। আর ভূমিকম্পপ্রবণ টিপাইমুখ এলাকায় ভূমিকম্পের কারণে বাঁধ ভেঙে গেলে প্রলয় ঘটে যাবে।

এক বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরেক বিভাগ বা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের অভাবও একটা সমস্যা। কৃষি বিভাগ হাওরে ধান চাষ করছে। সেই ধান বন্যার আগেই কাটার পরিকল্পনা ছিল না। তারা বলবে, পানি উন্নয়ন বোর্ড বাঁধ করে দেয় না কেন? রেল বিভাগ রেললাইন করবে, সেতু করবে। দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ২১ জুন ড. মো. খালেকুজ্জামান লিখেছেন, ‘ভৈরবে পুরাতন রেলসেতুসহ মোট তিনটি সেতুর কথা। এটা খেয়াল করতে হবে, উজানের পানি হাওর হয়ে এই পথ দিয়েই মেঘনার প্রবাহে যুক্ত হয়। কিন্তু ওই জায়গায় এখন একটা বোটলনেক প্রবলেম তৈরি করা হয়েছে। এই সেতুগুলো করতে গিয়ে নদীর মুখ সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে। নদী কিন্তু কেবল মূল স্রোতোধারাটিই নয়, নদীর দুই পারের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে যে প্লাবনভূমি, সেটাও নদীর অংশ।’

বিবিসি বাংলায় ১৮ জুন ২০২২ বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলছেন, ‘হাওরে বিভিন্ন জায়গায় পকেট পকেট আমরা রোড করে ফেলেছি। ফলে পানিপ্রবাহে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে। শহর এলাকায় বাড়িঘর তৈরির ফলে পানি আর গ্রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে বন্যার তীব্রতা আমরা বেশি অনুভব করছি। এসব কারণে আগাম বন্যা হচ্ছে এবং অনেক তীব্র বন্যা হচ্ছে।’ বিবিসি বাংলা লিখেছে: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে ইটনা-মিঠামইন সড়ককে এ বন্যার জন্য দায়ী করা হচ্ছে, সেভাবে দায়ী করতে রাজি নন অধ্যাপক ইসলাম, ‘আমাদের দেশে উজান থেকে পানি নামে উত্তর থেকে দক্ষিণে। এ রাস্তাও কিন্তু উত্তর থেকে দক্ষিণে তৈরি। ফলে এটা হয়তো হাওরের পানিপ্রবাহের কিছুটা বাধার তৈরি করছে, কিন্তু বন্যার এটাই একমাত্র কারণ নয়।’

আমরা জানি, কেন আমাদের প্রকল্পে-মেগা প্রকল্পে এত উৎসাহ। আমাদের উন্নয়ন দর্শন বদলাতে হবে। মানুষ, পরিবেশ, জলবায়ু, জীবন, জীববৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক লাভ—এসব বিবেচনা সবার ওপরে রেখে আমাদের উন্নয়ন দর্শনকে করতে হবে সাসটেইনেবল বা টেকসই।

জলবায়ুর পরিবর্তন এখন বাস্তবতা। এখন ঘনঘন বন্যা–সাইক্লোন, খরা–জলোচ্ছ্বাস ঘটছে। প্রকৃতি উল্টাপাল্টা আচরণ করছে, করবে। এ অবস্থায় আমরা কি তাহলে উন্নয়ন না করে বসে থাকব?

উন্নয়নের মূলে থাকতে হবে মানুষ। মানুষ বলবে, তাদের কী সমস্যা। তারা সমাধানের দাবি তুলবে। জনপ্রতিনিধিরা সেই দাবি তুলে ধরবেন। নীতিনির্ধারকেরা তখন বিশেষজ্ঞদের বলবেন, ‘মানুষ এ সমস্যার সমাধান চায়। আপনারা দেখুন, কী করা যায়।’ অর্থাৎ নীতিনির্ধারকেরা বলে দেবেন না, এইখানে বাঁধ বা সেতু বা রেললাইন বা সড়ক চাই। তাঁরা সমস্যার সমাধান চাইবেন ওই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। বিশেষজ্ঞরা মানুষের সঙ্গে কথা বলে প্রকল্প প্রণয়ন করবেন। সেই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সব কোণ থেকে যাচাই করতে হবে। পরিবেশের ওপর এর অভিঘাত, জীববৈচিত্র্যের ওপরে এর প্রভাব, অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব, মানুষের জীবনের ওপর এর প্রতিক্রিয়া—এসব দিক সত্যিকারভাবে বিবেচনা করেই একটা প্রকল্প তৈরি করতে হবে।

নেতা বলে দেবেন, এখানে স্টেডিয়াম বানান আর স্টেডিয়ামের প্রকল্প তৈরি করতে প্রকৌশলীরা লেগে পড়বেন, তা হবে না। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ওসমান আলী স্টেডিয়াম এখন পানিতে আধডোবা অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু সঞ্চালন লাইন নেই—এমন পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রামের একটা উড়ালসড়কে যানবাহন উঠতে চায় না। আমি এলাকাবাসীকে জিগ্যেস করেছিলাম, তাঁরা বলেছিলেন, এ জায়গায় উড়ালসড়কের কোনো দরকার ছিল না। প্রকল্প আর মেগা প্রকল্প দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়লে চলবে না। আর কারিগরি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে আসবে না, তা আসতে হবে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে, আর তাতে থাকবে স্থানীয় মানুষদের অংশগ্রহণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় দেখিয়েছেন, রাজার নির্দেশ অনেক সময় পণ্ডিতেরা কার্যকর করতে পারেন না, সমস্যার সমাধান জানেন অভিজ্ঞস্থানীয় সাধারণ মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটা সুন্দর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। হাওর এলাকায় কোনো সড়ক নয়। সড়ক বানাতে হলে তা করতে হবে উড়ালসড়কের মতো করে। এ সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

একটা পুরোনো কৌতুক এখানে পরিবেশন করা যায়। নেতা জনসভায় বললেন, ‘আপনাদের এলাকায় আমি একটা সেতু বানিয়ে দেব।’ জনতা বলল, ‘আমাদের তো কোনো নদী নেই। সেতু দিয়ে কী করব?’ নেতা বললেন, ‘আচ্ছা, তাহলে আগে খাল কাটা হবে, তারপর তার ওপর সেতু বানিয়ে দেওয়া হবে।’ আরেকটা কৌতুক আছে। প্রকল্প প্রণয়ন করা হলো, টাকা বরাদ্দ হলো, খাল খনন করা হবে। কিছু কাজ না করেই ঠিকাদার অর্থ আত্মসাৎ করলেন। পরিদর্শক আসছেন কাজ দেখতে। তখন ওপরে চিঠি পাঠানো হলো, খালের কারণে এলাকায় খুব অসুবিধা হচ্ছে। এটা ভরাট করতে হবে। আবার প্রকল্প হলো। এবার পরিদর্শক এসে দেখলেন, সুন্দরভাবে খাল ভরাট করা হয়েছে। এত সুন্দর, এখানে কোনো দিন খাল ছিল, তা বোঝাই যায় না।

আমরা জানি, কেন আমাদের প্রকল্পে-মেগা প্রকল্পে এত উৎসাহ।

আমাদের উন্নয়ন দর্শন বদলাতে হবে। মানুষ, পরিবেশ, জলবায়ু, জীবন, জীববৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক লাভ—এসব বিবেচনা সবার ওপরে রেখে আমাদের উন্নয়ন দর্শনকে করতে হবে সাসটেইনেবল বা টেকসই।

* আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন