default-image

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান প্রায় তিন বছর পর সম্প্রতি তাঁর দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি আগামী দুই বছরের একটি ‘রূপকল্পের’ ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তুরস্ক আগামী দুই বছরে ‘মিত্রের সংখ্যা বাড়াবে এবং আশপাশের দেশের সঙ্গে থাকা বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটিয়ে পারস্পরিক সমস্যার সমাধান করবে।’ তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থানকে নিজেদের অনুকূল হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য—কাউকেই পৃষ্ঠ প্রদর্শন করার বিলাসিতা আমাদের নেই।’ এই কথার মাধ্যমে তিনি যদি বোঝাতে চান, প্রতিবেশীদের সঙ্গে তিনি ‘জিরো প্রবলেম’ভিত্তিক সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী, তাহলে তাঁকে তাঁর আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।

কিন্তু একেপির সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার আগের সপ্তাহান্তেও এরদোয়ানের মধ্যে মিত্রের সংখ্যা বাড়ানোর আগ্রহ দেখা যায়নি, যখন কিনা তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্য’ বলে কর্কশ মন্তব্য করেছিলেন।

এরদোয়ান এই বক্তব্য দেওয়ার মাত্র দুই দিন আগে তুরস্কের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে বরখাস্ত করেন (আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা অপছন্দ করা সত্ত্বেও এরদোয়ান গত তিন বছরে এই নিয়ে তিনজন গভর্নরকে বরখাস্ত করলেন) এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে করা একটি চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেন। ওই একই দিনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন প্রথমবারের মতো মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন, সেখানে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ বিমানবিধ্বংসী সরঞ্জাম কেনার বিষয়কে ‘সফলভাবে সম্পন্ন হওয়া চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেন।

বিজ্ঞাপন

ন্যাটোর সদস্য হয়ে তুরস্ক রুশ অস্ত্র ব্যবহার করায় যুক্তরাষ্ট্র গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সে কারণেই তুরস্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শীতল থেকে শীতলতর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে ওই রুশ অস্ত্র কেনার চুক্তি বাতিল করতে বলেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এরদোয়ান নতুন মিত্রের সংখ্যা বাড়ানোর কথা বললেও তুরস্কের যে আচরণের কারণে অনেক বন্ধু ইতিমধ্যেই শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই আচরণ বদলাতে তারা মোটেও আগ্রহী নয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এরদোয়ান সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে পেরেছেন। এখন তাঁর প্রশাসন আর ইইউ অথবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক জোট অবস্থায় নেই।

ন্যাটোতে সবচেয়ে বড় ইউরোপিয়ান সেনাবাহিনী থাকা দেশ তুরস্ক ইতিমধ্যেই ন্যাটোবিরোধী দেশ রাশিয়ার সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তুলেছে। সিরিয়া, লিবিয়া ও আজারবাইজানে তুরস্ক সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছে; প্রতিবেশী দেশ গ্রিসকে নিয়মিত যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে; ইইউর সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ জার্মানি ও ফ্রান্সের নেতাদের ব্যক্তিগত আক্রমণ করছে; মিসর ও সৌদি আরবের সঙ্গেও তার সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছে। এই অবস্থা তুরস্ককে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীন করেছে বটে, কিন্তু সাবেক মিত্রদেশগুলো এতে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছে। দেশের ভেতরের জনগণও এতে ক্ষুব্ধ।

এরদোয়ান যদি সত্যিকারভাবে সাবেক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চান, তাহলে তাঁকে অবশ্যই মারমুখী রাজনীতি থেকে সরে আসতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভয়ভীতি দেখানো বন্ধ করতে হবে

কিন্তু তারপরও সেই মারমুখী অবস্থান থেকে এরদোয়ান সরে আসবেন না; বরং এরদোয়ানের লড়াই চালিয়ে যাওয়া, যুক্তিতর্ক তুলে ধরে মৌখিকভাবে প্রতিপক্ষকে তাঁর আক্রমণ করাই একেপি পার্টি আশা করে। সম্মেলনে এরদোয়ানের ওই ভাষণের সংক্ষিপ্ত ‘মিলমিশের বক্তব্য’ ছিল দলীয় প্রধান হিসেবে তাঁর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার একটি উদ্‌যাপনমূলক বক্তব্য। একেপির প্রধান হিসেবে তিনি মামুলি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছেন তা নয়, ১৪২৮টি ভোটের মধ্যে মাত্র ৩টি ব্যালট তাঁর বিরুদ্ধে গেছে। তবে আগামী ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এরদোয়ান জিতবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ, তুর্কি জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে। দুই বছর আগে ইস্তাম্বুল এবং আঙ্কারায় স্থানীয় নির্বাচনে এরদোয়ানের দল একেপি হেরে গেছে। গত মার্চে চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, একেপির প্রতি জনসমর্থন ৩৬ শতাংশ নেমে গেছে।

এমনিতেই ডলারের বিপরীতে তুরস্কের মুদ্রা লিরার দাম পড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক অস্থিরতা চলছিল, তার মধ্যে এরদোয়ান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়ায় লিরার দর আরও পড়ে গেছে। এতে লাখ লাখ তুর্কির জন্য খাবার কেনা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় এরদোয়ান যদি সত্যিকারভাবে সাবেক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে চান, তাহলে তাঁকে অবশ্যই মারমুখী রাজনীতি থেকে সরে আসতে হবে। প্রতিবেশী দেশগুলোকে ভয়ভীতি দেখানো বন্ধ করতে হবে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ফয়সাল আল ইয়াফাই মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ও লেখক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন