default-image

একসময় জাপানের রাজধানী ছিল কিয়োটো। শহরজুড়ে বৌদ্ধমন্দির আর সাজানো বাগান। জাপানের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র ওসাকা থেকে এই কিয়োটোতেই যাব। ট্রেনে ৫৬ কিলোমিটার।

স্টেশনে টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি মহাবিপদ। মেশিনের সবকিছুর ভাষাই জাপানি। ইংরেজি নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পেছনে লম্বা লাইন। আমার কারণে আরও বড় হচ্ছে। বড্ড বেশি সময় নিচ্ছিলাম। অন্যরা নিশ্চয়ই বিরক্ত হচ্ছিল। জাপানিরা অত্যন্ত ভদ্র। বিরক্ত হলেও কিছু বলবে না, এটা ভেবে আরও অসহায় লাগছিল। ভাবছিলাম, এতগুলো মানুষের কাছে নিজেকে গাধা প্রমাণ করছি। আমার পেছনে দাঁড়ানো একজনের কাছে সাহায্য চাইলাম। ভদ্রলোক হাসিমুখে এগিয়ে এলেন। তাঁকে টিকিট কাটার জন্য দুই হাজার ইয়েন দিলাম। হোটেল থেকেই জেনে এসেছিলাম টিকিটের দাম পনেরো শ ইয়েনের মতো। ভদ্রলোক টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কিয়োটো যাওয়ার টিকিট আমি তোমাকে উপহার দিলাম।’ বলে নিজের আর আমার টিকিট কিনে একটা আমাকে দিয়ে ভদ্রলোক দ্রুত হাঁটা ধরলেন। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে এসব কিছু ঘটে গেল। আমি পিছু নিলাম, ‘টিকিটটা কেটে দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। অনুগ্রহ করে টাকাটা তো নাও।’

‘চিন্তা কোরো না, কিয়োটো সুন্দর শহর, ঘুরে দেখো,’ বলে নিমেষে ভিড়ে মিশে গেলেন অপরিচিত ভিনদেশি।

কিয়োটো ঘুরলাম সারা দিন। বিস্ময় কাটল না। অপরিচিত গাধা গোছের এক ভিনদেশিকে নিজের টাকায় কেন টিকিট কিনে দিলেন এক জাপানি, জীবনে যঁার সঙ্গে কোনো দিন আর দেখা হবে না।

বিজ্ঞাপন

সান ফ্রান্সিসকো আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের অন্যতম বড় শহর। একসময় মেক্সিকোর অন্তর্গত ছিল। একবার সান ফ্রান্সিসকোতে গিয়ে হোটেলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাঝরাত। প্রায় সব হোটেলেই রাতে খাবারের জন্য কিছু না কিছু ব্যবস্থা থাকে। সেদিন হোটেলের রেস্তোরাঁ কোনো একটা কারণে আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ভাবলাম, আশপাশে কিছু না কিছু নিশ্চয়ই পেয়ে যাব। বেশ কিছু সময় হাঁটার পর আশাহত হলাম। খাবারের দোকান সবই বন্ধ। পেটে প্রচণ্ড খিদে। রোখও চেপে গেছে। হাঁটতে থাকলাম। প্রায় ৩০ মিনিট হাঁটার পর দেখি একটা মেক্সিকান খাবারের দোকানে বসে দুজন খাচ্ছেন। ঢুকতে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ। যে দুজন খাচ্ছিলেন, তাঁদের একজন উঠে এসে দরজা খুললেন, ‘দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আমরা খাচ্ছি।’

বিরক্ত করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আবার হাঁটা ধরলাম। হঠাৎ পেছন থেকে ডাক, ‘এসো, তবে মেনুমতো খাবার তোমাকে দিতে পারব না। বারিতো আছে।’ বারিতো হলো রুটির ভেতরে বিভিন্ন রকম ডাল আর মাংস পুরে দেওয়া খাবার। সঙ্গে পেঁয়াজ, টমেটো আর শসার সালাদ। মেক্সিকান খাবার। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভেবে খারাপ লাগছিল যে খাওয়া থেকে দুবার লোকটাকে ওঠালাম। যে দুজন খাচ্ছিলেন, তাঁদের একজন বাবুর্চি, অপরজন খাবার পরিবেশন করেন।

‘আমি অপেক্ষা করি,’ বলতেই বাবুর্চি হেসে দিয়ে বললেন, ‘সে ছাড়া অন্য উপায়ও নেই।’

মাত্র কয়েক মিনিট লাগল। খাবার নিয়ে দামটা মেটাতে যেতেই শুনলাম, ‘লাগবে না’। ভাবলাম মজা করছে। সান ফ্রান্সিসকো খুব খরুচে শহর। থাকা, খাওয়া, ঘোরা—সবই ব্যয়বহুল। কিন্তু পারিনি, কিছুতেই দামটা দিতে পারিনি। স্প্যানিশ উচ্চারণে কাউন্টারের ওপারের লোকটি শুভরাত্রি জানিয়ে মেঝে পরিষ্কারে লেগে গেল। বাইরে তখন বেশ ঠান্ডা। গরম রুটি হাতে হাঁটতে শুরু করলাম। চোখটা মনে হলো ভেজা। হয়তো ঠান্ডা বাতাসে।

কাজের প্রয়োজনে সপ্তাহে অন্তত দুই দিন আমাকে লন্ডন থেকে বার্লিন যেতে হয়। আমাদের বাড়ি থেকে লন্ডনের সিটি এয়ারপোর্ট খুব কাছে। ছোট্ট এয়ারপোর্ট। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে প্লেন যায়। এই এয়ারপোর্টের অধিকাংশ যাত্রীই আমার মতো কেজো যাত্রী। লম্বা লাইন থাকে না। একদিন বিমানে ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে আছি। বেশ কিছুক্ষণ হয় লাইন এগোচ্ছে না। বিমানে ঢোকার মুখে যে বিমান সেবিকা টিকিট আর পাসপোর্ট দেখে যাত্রীদের ভেতরে ঢোকান, তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত। কাঁচুমাচু মুখে এক যাত্রীকে কিছু বোঝাচ্ছেন। কেতাদুরস্ত যাত্রীর গলা বেশ চড়া। বিমানে বা গণপরিবহনে চড়া গলায় কথা বলা বিলেতি আচারের অংশ নয়। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের অধিকাংশ বিমানকর্মীই বেশ বিনয়ী। হাসিমুখেই যাত্রীদের প্রয়োজন মেটান। কর্মী ছাঁটাই হয়েছে। তারপরও সাধ্যমতো চেষ্টা করেন নানা চাহিদা মেটানোর জন্য। ক্ষুব্ধ ওই লোক একটি নির্দিষ্ট সংবাদপত্র চাইছিলেন। সংবাদপত্রটি বিমানে ছিল না। বেশ কয়েকবার যাত্রী বলতে থাকলেন তিনি সাধারণ নন, একটি বিশেষ শ্রেণির যাত্রী। যে পত্রিকাটি তিনি চাইছেন, অবশ্যই সেটি তাঁকে দিতে হবে। দরকার হলে বাইরে থেকে আনিয়ে দিতে হবে। বিমানকর্মী তাঁকে বারবার বলছিলেন, সব যাত্রী বিমানে উঠে গেলে তিনি চেষ্টা করবেন। ঘটনাক্রমে ঠিক ওই পত্রিকারই একটি কপি আমার হাতে ছিল। লন্ডনের অধিকাংশ বিমানবন্দরেই নামকরা সব ব্রিটিশ পত্রিকা পাওয়া যায় বিনা মূল্যে। আমি এগিয়ে গিয়ে বিমানকর্মীকে পত্রিকাটি দিয়ে বললাম, ওই যাত্রীকে শান্ত করুন। বিমানকর্মী হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। কফি দিতে এসে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। সঙ্গে একটা শ্যাম্পেনের বোতল।

এক বিচারে ওপরের সব ঘটনাই সাধারণ, তবে অপ্রত্যাশিত। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন মানুষ যখন অন্যকে হঠাৎ সাহায্য করে, খুশি করে, তখন তাঁর মস্তিষ্কে তৈরি হয় ডোপামিন আর সেরোটোনিন। এই দুটি রাসায়নিক পদার্থকে বলে ‘হ্যাপি কেমিক্যাল’। আমাদের আবেগ, উচ্ছ্বাস আর অনুভূতি এই দুটি যৌগ নিয়ন্ত্রণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, আপনি যখন অন্য কাউকে অপ্রত্যাশিতভাবে সামান্য উপকার করেন, আপনার মস্তিষ্ক সঙ্গে সঙ্গে আপনার ভেতরে একধরনের আনন্দ, ভালো লাগা বা তৃপ্তির বার্তা দেয়। এতে আপনি আরও উদ্যমী, সজীব হয়ে ওঠেন। শুধু তা-ই নয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীর মস্তিষ্কেও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়।

বিজ্ঞাপন

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ কর্মজীবনেও সফল। কাজের জায়গায় জনপ্রিয়। গবেষকেরা বলছেন, অন্যের উপকার কয়েকবার করার পর আমাদের মস্তিষ্ক সেটাকে অভ্যাসে পরিণত করে। কারণটা খুব পরিষ্কার। ডোপামিন নিঃসরণের কারণেই আমাদের আনন্দানুভূতি হয়। নানা কারণেই ডোপামিন নিঃসরিত হয়। মস্তিষ্ক এই কারণগুলোকে মনে রাখে। তারপর বারবার আমাদের এই কাজগুলো করতে উৎসাহিত করে।

গবেষকেরা বলছেন, যারা নিয়মিত অন্যের উপকার করে বা অন্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তারা আনন্দে থাকে; সেরোটোনিনের জন্য তাদের বিষণ্নতাও কম, মস্তিষ্কও অন্যদের তুলনায় বেশি কার্যকর।

অন্যকে সাহায্য করার এই প্রবণতা প্রায় তিন লাখ বছরের পুরোনো। আধুনিক মানুষের আবির্ভাবের সময় থেকেই। গোষ্ঠীবদ্ধভাবে থাকা আর অন্যকে সহায়তা করার প্রবণতা পৃথিবীব্যাপী মানুষের আধিপত্য আর দুর্বিপাকে টিকে থাকার একটা বড় কারণ বলে ভাবা হয়। এই মহামারিতে আমাদের একে অন্যকে খুব দরকার।

ড. সুব্রত বোস প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন