default-image

ভ্যাটযোগ্য কোনো পণ্য বিক্রি বা সেবা প্রদান করতে হলে প্রতিটি বিক্রির সমর্থনে ভ্যাট চালানপত্র ইস্যু করতে হয়। ভ্যাট চালানপত্রের অর্থ হলো ক্রয়ের সপক্ষে রসিদ। ভ্যাট বিধিতে চালানপত্রের একটি ফরম্যাট রয়েছে, যাকে মূসক-৬.৩” বলে। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর (ভ্যাট আইন) প্রথম তফসিলে ভ্যাটমুক্ত পণ্য ও সেবার তালিকা রয়েছে। এ তালিকায় বর্ণিত পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে চালান ইস্যু করতে হবে না। এর বাইরের সব পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে বিক্রির সময় ভ্যাট চালান ইস্যু করতে হবে।

įমূসক-৬.৩”-এর নির্দিষ্ট ফরম্যাট অনুযায়ী ছাপানো ভ্যাট চালান সাধারণত আইনসংক্রান্ত বইয়ের দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সামনের বইয়ের স্টলেও পাওয়া যায়। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজ নামে ভ্যাট চালান পুস্তক ছাপিয়ে নেয়। মূসক-৬.৩”-এর ফরম্যাটের মধ্যে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন কোনো ফিল্ড যোগ করা যায়, কোনো ফিল্ড বাদ দেওয়া যায় না। ভ্যাট চালানপত্র ন্যূনতম দুই কপি প্রস্তুত করতে হয়। প্রথম কপি পণ্য বা সেবা ক্রয়কারীকে দিতে হবে এবং দ্বিতীয় কপি পণ্য বা সেবা বিক্রেতা ন্যূনতম পাঁচ বছর সংরক্ষণ করবেন। তবে করের প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত কপি প্রস্তুত করতে পারেন। ভ্যাট চালানপত্রের কোনো সুনির্দিষ্ট রং নেই।

এসআরওর মাধ্যমে যেসব পণ্য ও সেবাকে ভ্যাটমুক্ত করা হয়েছে, সেসব পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে হলে ভ্যাট চালান ইস্যু করতে হবে। কারণ, এমন পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট আরোপিত হবে না; তবে হিসাবপত্র সংরক্ষণ করতে হবে। এসআরওতে উল্লেখ রয়েছে যে হিসাবপত্র সংরক্ষণ করা না হলে এমন পণ্য বা সেবা ভ্যাটমুক্ত সুবিধা পাবে না। 

ভ্যাট চালানপত্রে যে সাধারণ তথ্যগুলো থাকে, তা হলো বিক্রেতার নাম, ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর, ঠিকানা, ক্রেতার নাম, ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর, পণ্যের গন্তব্যস্থল, চালানপত্র নম্বর, ইস্যুর তারিখ, ইস্যুর সময়, পণ্য বা সেবার ক্রমিক নম্বর, বর্ণনা, সরবরাহের একক, পরিমাণ, একক মূল্য, মোট মূল্য, সম্পূরক শুল্কের পরিমাণ, ভ্যাটের হার ও পরিমাণ, সুনির্দিষ্ট ভ্যাট এবং সকল প্রকার শুল্ক ও করসহ মূল্য। মূসক-৬.৩”-এর নির্দিষ্ট ফরম্যাটে কলামগুলোর ক্রমিক নম্বর দেওয়া নেই। কলামগুলোর ক্রমিক নম্বর দেওয়া হলে ভালো হয়। তাই আপনি কলামগুলোর ক্রমিক নম্বর দিয়ে নিতে পারেন। ভ্যাট চালানপত্রে ১০টি কলাম রয়েছে।

সবশেষে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম, পদবি, স্বাক্ষর ও সিল থাকতে হবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভ্যাট চালানপত্র ছাপানো ফরম্যাটে হাতে লিখে পূরণ করে ইস্যু করা হয়। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান এনবিআর অনুমোদিত সফটওয়্যারের সাহায্যে ভ্যাট হিসাবপত্র সংরক্ষণ করে, সেসব প্রতিষ্ঠান একই ফরম্যাটে কম্পিউটারে প্রস্তুত করা চালান ইস্যু করে। কম্পিউটারে প্রস্তুত করা চালান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্বাক্ষর করতে হয়। ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্টারের (ইসিআর) মাধ্যমে প্রস্তুত করা চালান স্বাক্ষর করতে হয় না।

ইতিপূর্বে ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের আওতায় কতিপয় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব চালানকে ভ্যাট চালান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। যেমন বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, ওয়াসার বিল, ইসিআর দ্বারা প্রস্তুত চালান, বিমা কোম্পানির রসিদ, অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং ফার্মের রসিদ, এসি বাস ও এসি লঞ্চের টিকিট ইত্যাদি। নতুন ভ্যাট আইনের আওতায় এমন কোনো আদেশ জারি করা হয়নি। তবে ওই সব প্রতিষ্ঠান আগের মতো করে ভ্যাট চালান ইস্যু করছে। এ-সংক্রান্ত একটি আদেশ এনবিআর কর্তৃক জারি করা প্রয়োজন।

ভ্যাট চালানপত্র সম্পর্কে ক্রেতাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এনবিআর প্রচারণা করে থাকে। ক্রেতারা কেনার সময় চালানপত্র চেয়ে নিলে ভ্যাট ফাঁকি হওয়ার প্রবণতা কমে যায়। চালানপত্রে বিক্রেতার নাম, ঠিকানা, ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর ইত্যাদি মুদ্রিত থাকলে চালানটি সঠিক বলে ধরে নেওয়া যায়। এনবিআরের ওয়েবসাইটে (www.nbr.gov.bd) একটি বক্স রয়েছে। ওই বক্সে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর বসালে নিবন্ধন নম্বরটি সঠিক হলে প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত স্ক্রিনে ভেসে আসে। ভ্যাট চালানের সত্যতা যাচাই করার পদ্ধতি এখনো চালু হয়নি।

মাঠপর্যায়ে ভ্যাটসংক্রান্ত কাজ করতে চালানপত্র বিষয়ে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়। এমন কিছু বিষয় আলোচনা করা প্রাসঙ্গিক। বিজ্ঞাপন একটি ভ্যাটযোগ্য সেবা। ইতিপূর্বে ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের আওতায় নিয়ম ছিল যে বিজ্ঞাপন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ভ্যাট চালানপত্র ভ্যাট সার্কেল অফিসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বা রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক সত্যায়িত করতে হতো। এখন সে বিধান নেই। কিন্তু কোনো কোনো ভ্যাট অফিসার এখনো বিজ্ঞাপনসেবার ভ্যাট চালান সত্যায়িত করে জমা দিতে বলেন।

এখন ভ্যাট চালান সার্কেল অফিসে জমা দেওয়ার বিধান নেই। ভ্যাট চালান দুই কপি ইস্যু করতে হবে। প্রথম কপি ক্রেতাকে দিতে হবে। দ্বিতীয় কপি বিক্রেতা সংরক্ষণ করবেন। অনেক সময় ভ্যাট জমা দেওয়ার প্রমাণ হিসেবে ক্রেতা ট্রেজারি চালান চেয়ে থাকেন, যা সঠিক নয়। দাখিলপত্র দাখিল করার আগে ভ্যাট জমা দিতে হবে। দাখিলপত্র প্রস্তুত করতে হলে কর মেয়াদের সব প্রদেয় ভ্যাট যোগ করতে হবে। সব রেয়াত প্রদেয় থেকে বিয়োগ করতে হবে। স্থিতির সঙ্গে সব বৃদ্ধিকারী সমন্বয় যোগ করতে হবে। সব হ্রাসকারী সমন্বয় স্থিতি থেকে বিয়োগ করতে হবে। এভাবে যে স্থিতি পাওয়া যাবে, তা হলো নিট ভ্যাট। নিট ভ্যাট ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। তাই কোনো ভ্যাট চালানপত্রের বিপরীতে ট্রেজারি চালান দেওয়া সম্ভব নয়। ক্রেতার দায়িত্ব হলো ভ্যাট চালানটি আপাতদৃষ্টিতে সঠিক আছে কি না, তা দেখে নেওয়া। শুনেছি, কোনো কোনো ভ্যাট কর্মকর্তা বলে থাকেন যে উৎসে কর্তন করা ভ্যাট, বাড়ি ভাড়ার ভ্যাট ইত্যাদি দাখিলপত্রে বৃদ্ধিকারী সমন্বয় না করে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে। এমন কথাও সঠিক নয়। 

ভ্যাট চালানপত্র ইস্যু করার বিষয়ে আর একটি সমস্যা হলো ধরুন, একটি পত্রিকা বিজ্ঞাপন ছাপায়। পত্রিকাটি কোনো এক মাসের বিভিন্ন সময়ে পাঁচ দিন একটি প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন ছাপিয়েছে। মাসের শেষে একটি ভ্যাট চালান ইস্যু করা হয়েছে। শুনেছি, কোনো কোনো কর্মকর্তা বলে থাকেন যে পাঁচটি বিজ্ঞাপন বাবদ পাঁচটি ভ্যাট চালান ইস্যু করতে হবে। ভ্যাট আইনের ধারা ৫১ অনুসারে, করযোগ্য সরবরাহের ওপর যে তারিখে কর প্রদেয় হয়, সে তারিখে বা তার আগে ভ্যাট চালান ইস্যু করতে হবে। সেবা প্রদান করা হয়ে গেলেই চালানপত্র ইস্যু করতে হবে। কিন্তু বেশ কিছু ক্ষেত্রে তা বাস্তবসম্মত নয়। ধরুন, মেঝে পরিষ্কারকারী একটি প্রতিষ্ঠান একটি অফিসের মেঝে পরিষ্কার করার কাজ করে। প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে আটটা পর্যন্ত এক ঘণ্টা কাজ করে। এক মাস কাজ করা শেষ হলে পরবর্তী মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি ভ্যাট চালান ইস্যু করে। এই সেবার ক্ষেত্রে প্রতিদিন একটি করে ভ্যাট চালান ইস্যু করা বাস্তবসম্মত নয়। সেবার ক্ষেত্রে সাধারণত একটি চালানপত্রকে একটি সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেসব সেবার ক্ষেত্রে সেবাটি বারবার একই সেবাগ্রহীতাকে প্রদান করা হয়, এরূপ ক্ষেত্রে একটি সময়কালের জন্য সাধারণত এক মাসের জন্য একটি ভ্যাট চালান ইস্যু করা হয়। তবে ভ্যাট চালানপত্রে প্রতিটি সেবা প্রদানের তারিখ, পরিমাণ ইত্যাদির বর্ণনা থাকলে ভালো হয়। এমন বিষয়ে স্পষ্টীকরণ জারি করার জন্য বিধি ১১৮ ক-এর মাধ্যমে কমিশনারদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। 

কোনো কোনো বিক্রেতার মধ্যে ভ্যাট চালান ইস্যু না করার প্রবণতা রয়েছে, যা সরকারি রাজস্ব আহরণের জন্য হুমকিস্বরূপ। ভ্যাট হলো ভোক্তা কর। বিক্রেতা তার মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট যোগ করে দেবেন। সব বিক্রির ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ভ্যাট চালান জারি করা আদর্শ ভ্যাট ব্যবস্থার পূর্বশর্ত। আমরা এখনো এ স্তরে পৌঁছাতে পারিনি। নীতিনির্ধারক, বাস্তবায়নকারী, ভ্যাটদাতা ও পরামর্শক সবাইকে এ উদ্দেশ্য পূরণে অধিকতর যত্নবান হতে হবে। ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে একটি আদর্শ ভ্যাট ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। 

ড. মো. আবদুর রউফ ভ্যাট বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ভ্যাটবিষয়ক একটি প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত

roufvat@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন