এক বছরের কম সময়ের মধ্যে আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলো তিনটি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক করেছে, যা তাদের আফগানিস্তানের অবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার বিষয়টিকে প্রতিফলিত করে। এর মাধ্যমে অনেক কাজ ফলপ্রসূভাবে করা হয়েছে এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। একই সময়ে এটি আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং আফগানিস্তানের সামগ্রিক পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নয়ন ঘটাতে আফগান ইস্যুতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কৌশলের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে। এই প্রচেষ্টাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আফগানিস্তান এখনো মানবিক সংকট, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সন্ত্রাসবাদ দমন ও সুশাসনের মতো অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে, তা সমস্যাগুলোকে আরও প্রকট করে তুলেছে। এই ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আমেরিকায় জমাকৃত সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার সম্পদ আফগানিস্তানের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। তাঁদের এ পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করে আফগানিস্তান ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

বিশ্বের উচিত নয় আফগানিস্তানকে ভুলে যাওয়া এবং আফগানিস্তান সমস্যার পেছনের মূল হোতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না ইচ্ছাকৃতভাবে এ ইস্যুকে উপেক্ষা করে এ সংকট থেকে দূরে থাকা। যারা এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের এর দায়ভার নিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের উচিত আফগানিস্তানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য প্রাথমিকভাবে তাদের দায়িত্ব নেওয়া এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আফগান জনগণের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ইউক্রেন সংকটের কারণে আফগানিস্তানকে পশ্চিমা বিশ্ব ভুলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। এখন আফগানিস্তানজুড়ে ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু আফগানিস্তানে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ৪ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক তহবিল প্রদানের ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতি হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারকে (ইউএনএইচসিআর) ইউক্রেন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার পাশাপাশি আরেকটি সম্ভাব্য মানবিক সংকট প্রতিরোধে আফগানদের সমর্থন করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাতে হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে চীনে এ আন্তর্জাতিক বৈঠক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী। আফগান ইস্যু এখনো বর্তমান আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা লক্ষ্য বিবেচনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার মতো বিষয়, আন্তর্জাতিক এ সভা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ব্যাপারটি মনে করিয়ে দেবে। বিশ্বের উচিত নয় আফগানিস্তানকে ভুলে যাওয়া এবং আফগানিস্তান সমস্যার পেছনের মূল হোতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না ইচ্ছাকৃতভাবে এ ইস্যুকে উপেক্ষা করে এ সংকট থেকে দূরে থাকা। যারা এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের এর দায়ভার নিতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের উচিত আফগানিস্তানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য প্রাথমিকভাবে তাদের দায়িত্ব নেওয়া এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আফগান জনগণের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়া।

আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের তৃতীয় বৈঠক আফগানিস্তানে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীল উন্নয়ন অর্জনে চীনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এ বৈঠককে আরও ফলপ্রসূ করতে ও পূর্ববর্তী বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য চীন প্রতিবেশী দেশগুলোর আফগানিস্তানে নিযুক্ত বিশেষ দূতদের মধ্যে নিয়মিত বৈঠকের প্রক্রিয়া চালু করার উদ্দেশ্যে কাজ করছে এবং ‘রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক’, ‘অর্থনৈতিক ও মানবিক’ এবং ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’বিষয়ক তিনটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আফগান অন্তর্বর্তী সরকার, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথমবারের মতো এ বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। আফগানিস্তানবিষয়ক ‘চীন-ইউএস-রাশিয়া প্লাস’ শীর্ষক কনসালটেশন মেকানিজম বৈঠকে সভাপতিত্ব করে চীন। এ ব্যাপারে চীন যে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে, বিশ্ব তা প্রত্যক্ষ করেছে।

এর দ্বারা এটা প্রমাণিত হয়, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, চীন একটি দায়িত্বশীল দেশ ও আফগানিস্তানের অন্যতম প্রতিবেশী হিসেবে তার প্রতিবেশী দেশের প্রতি এর বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন আনবে না; পাশাপাশি ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখতে কূটনৈতিক নীতিতেও কোনো পরিবর্তন আনবে না। চীন ইতিহাস ও উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে আফগান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং আফগানিস্তানের পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ও দেশটিকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, চীন নিষেধাজ্ঞার অপব্যবহারের বিরোধিতা করে, আলাপ-আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনে বিশ্বাসী এবং বৈঠককে সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন রাখতে শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ঐকমত্য গড়ে তোলার জন্য সব পক্ষের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে। চীন আফগানিস্তানকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি, সহনশীল অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নীতি গ্রহণ এবং সন্ত্রাসবাদকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে উৎসাহিত করে।

আফগানিস্তান একটি দীর্ঘ অন্ধকার সময় অতিক্রম করেছে এবং ধীরে ধীরে এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। আফগানিস্তানের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের তৃতীয় বৈঠকের সফল আয়োজন আফগানিস্তানকে বর্তমান দুর্দশা থেকে বেরিয়ে এসে স্থিতিশীল উন্নয়নের পথে হাঁটতে সাহায্য করবে বলে বিশ্বাস করেন অনেকে।

ছিয়ান ফাং গবেষণা বিভাগের পরিচালক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ, ছিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন