বিজ্ঞাপন

বাইডেন মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের সমর্থনে বলেছেন, মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তানে জাতি গঠন করতে যায়নি। তিনি বলেছেন, সেখানে আরও অবস্থান মানে হলো মার্কিন বাহিনীর আরও সদস্যদের হতাহত হওয়া। তিনি বলেছেন, ‘আপনারা আর কত হাজার আমেরিকান ছেলেমেয়েকে মৃত্যুঝুঁকিতে রাখতে চান?’

তার মানে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে তিনি আমেরিকানদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো এ মুহূর্তে সত্যিকারের ঝুঁকিতে যারা আছে, তারা আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষ।

যুদ্ধ শেষ না করেই যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ পাততাড়ি গোটানোর ঘটনার দিকে ফিরে তাকানো যাক। ১৯৭৩ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামে মিত্রদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে মার্কিন বাহিনী একইভাবে চলে গিয়েছিল। এর পরের বছর ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামে ৮০ হাজার সেনা ও বেসামরিক লোক নিহত হয়েছিল। এরপর আমরা দেখেছি ১৯৭৫ সালে চীন সমর্থিত উগ্র কমিউনিস্ট খেমাররুজদের হাতে কম্বোডিয়াকে কার্যত ছেড়ে দিয়ে এসেছিল আমেরিকা। ফলে সেখানে খেমাররুজরা অচিন্তনীয় নৃশংসতা চালিয়েছিল।

এখন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানকে এমন এক ইসলামি শক্তির হাতে ছেড়ে দিয়ে আসছে, যাদের বর্বরতার এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইতিমধ্যেই তালেবান কয়েক লাখ লোককে ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। আফগান সরকার যখন ক্ষমতা হারানোর ভয়ে কাঁপছে, ঠিক তখন তালেবান আফগান সেনাদের হাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে দেশজুড়ে উল্লাস করছে।

ভিয়েতনাম থেকে পিছু হটার সময় যুক্তরাষ্ট্র যে অজুহাত দেখিয়েছিল, আফগানিস্তান থেকে সরার সময় দেখানো বাইডেনের অজুহাত তার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৫৮ হাজার ২২০ জন সেনা নিহত হয়েছিল, সেখানে গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে তাদের সেনা মারা গেছে ২ হাজার ৪৪৮ জন। অধিকন্তু ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সম্মুখ লড়াইয়ের অবসান ঘোষণা করার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৯৯ জন মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছেন। অথচ এই একই সময়ে ২৮ হাজারের বেশি আফগান সেনা ও পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।

সুতরাং মার্কিন বাহিনী সেখান থেকে সরিয়ে আনার যুক্তি খুব জোরালো হয় না। বাইডেনের এ সিদ্ধান্তের কারণে প্রমাণ হলো বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সেনাবাহিনী কিছু সন্ত্রাসী মিলিশিয়ার ভয়ে লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। এর ফলে বিশ্বের কাছে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রতি আস্থা অনেক কমে যাবে। এতে আফগানিস্তানে তো বটেই, এ অঞ্চলের পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠবে।

তালেবানের সাহসী প্রত্যাবর্তন নিশ্চিতভাবে এ অঞ্চলের অন্য সন্ত্রাসী সংগঠন ও মুজাহিদীন গোষ্ঠীর সাহস অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো তালেবান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের সহায়তা আগে যতটুকু পেত, এখন তা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। ফলে বাইডেন যখন বলেন, আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ আফগানদের হাতেই, তখন বুঝতে হয় আসলে আফগানদের ভবিষ্যতে তিনি পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়েছেন।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বিপদের ঝুঁকিতে আছে ভারত। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ছিল। ওই সময় তালেবান ভারতে অভিযান পরিচালনার প্রশিক্ষণক্ষেত্র হিসেবে পাকিস্তানকে আফগানিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিয়েছিল। তালেবান আবার ক্ষমতায় এলে ভারতের বিরুদ্ধে আবার সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা শুরু হবে। এতে হিমালয় অঞ্চলে চীনকে সামলানো থেকে ভারতকে অন্যদিকে বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হতে হবে।

এ ছাড়া আফগানিস্তানকে তালেবানের হাতে ছাড়া মানে পরোক্ষভাবে চীনকেও সহায়তা করা। যেহেতু পাকিস্তান এ মুহূর্তে চীনের ‘খদ্দর’, সেহেতু তালেবান শাসনাধীন আফগানিস্তানে চীন পাকিস্তান ও ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজের প্রাধান্য অপ্রতিরোধ্যভাবে বিস্তার করার সুযোগ পাবে।

তালেবানের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় দুটি জিনিসের বদলে চীন সেই সুবিধা হাতিয়ে নেবে। একটি হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অপরটি হলো আর্থিক সহায়তা। রাশিয়াও তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে তালেবান একটি মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিতে নিজেদের রূপান্তরের সুযোগ পেয়ে যাবে। আর এ সবকিছুর জন্যই দায়ী থাকবে জো বাইডেনের সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন