লিবিয়ায় বাংলাদেশি হত্যা

আমরা বিদেশি মুদ্রা দেখি, মানুষ দেখি না!

বিজ্ঞাপন
default-image

করোনায় মৃত্যু, এ–সংক্রান্ত নানা দুঃসংবাদের মধ্যে লিবিয়ার মিজদা শহরে মানব পাচারকারীদের হাতে ২৬ বাংলাদেশি নাগরিকের নির্মমভাবে নিহত হওয়ার ঘটনাটি যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দেওয়া হৃদয়বিদারক এই খবর পড়ে আমরা শিউরে উঠি। এক মানব পাচারকারীর মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে তাঁর পরিবার যে ৩১ জনকে হত্যা করেছে, তার মধ্যে ২৬ জনই যে বাংলাদেশি। আহত ১২ জন এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। লিবিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এস কে সেকেন্দার আলীকে উদ্ধৃত করে বাংলা ট্রিবিউন বলেছে, এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। আমরা জানি, তাঁরা বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন ভাগ্যান্বেষণে। অবৈধ পথে তাঁরা লিবিয়া হয়ে সম্ভবত অন্য কোনো দেশে যেতে চেয়েছিলেন, অথবা অন্ততপক্ষে লিবিয়ারই তুলনামূলক কোনো নিরাপদ এলাকায়। কিন্তু তাঁদের সেই ভাগ্যান্বেষণের পরিণতি হলো মর্মান্তিক। এই বেদনা আমাদের যেমন মর্মাহত করে, তেমনি অনেক প্রশ্নেরও জন্ম দেয়।

মানব পাচারের একটি বড় এলাকা হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই চিহ্নিত। ২০১৯ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রকাশিত ‘ট্রাফিকিং ইন পারসনস রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘প্রতিবছর সাত লাখের বেশি বাংলাদেশি অবৈধভাবে বিদেশে পাড়ি জমায়। তাদের প্রায় সবাই মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।’ নিঃসন্দেহে এই সংখ্যা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ২০২০ সালে আবারও নজরদারির তালিকায় রেখেছে। ২০১৫ সালের পর থেকেই মানব পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। সাধারণত পরপর দুই বছর বড় ধরনের উন্নতি না ঘটলে দেশটিকে তৃতীয় ধাপে নামিয়ে আনা হয় এবং এসব দেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ২০১৯ সালে তেমন নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তাই বাংলাদেশ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের মানব পাচারবিষয়ক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা সাময়িকভাবে দূর হয়। কিন্তু এ বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়।

বাংলাদেশ ২০১২ সালে এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করেছে, কিন্তু ২০১৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৫ হাজারের বেশি অভিযোগের বিপরীতে মাত্র ৩০ জনের বিচার হয়েছে। গত বছর এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনের পর গত ফেব্রুয়ারিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে মানব পাচারসংক্রান্ত মামলাগুলোর জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তাতে অবস্থার কতটা অবস্থা বদলাবে, তা অনুমান করা যায়। কেননা আইন প্রণয়ন হয়েছে ২০১২ সালে, আইনের বিধি (রুলস) তৈরি হয়েছে ২০১৭ সালে, আর ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি হয়েছে ২০১৮ সালে।

বাংলাদেশ থেকে মানব পাচারের ব্যাপকতা বোঝার জন্য এটাই যথেষ্ট যে ২০১৭ সালের ৫ মে লন্ডনের ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গিয়েছিল, নৌকায় করে যাঁরা অবৈধভাবে ইউরোপের পথে পাড়ি জমাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশিরাই সবচেয়ে বেশি। সেটা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও লিবিয়া থেকে আশ্রয়ের আশায় শরণার্থীদের ইউরোপে যাত্রার সময়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৬ সালের প্রথম তিন মাসে মাত্র একজন বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইতালি গিয়েছিলেন, ২০১৭ সালের প্রথম তিন মাসে তা গিয়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮০০ জনে। লিবিয়ার মানব পাচারকারীরা সেই থেকেই অসংখ্য মানুষের কাছে ভালো জীবনের স্বপ্ন বিক্রি করে আসছে, অনেকের সেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালের পরে এই অঞ্চলের অবস্থার অনেক বদল ঘটেছে, শরণার্থীদের স্রোত বন্ধ হয়েছে, লিবিয়া এক অন্তহীন সংঘাতের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মানব পাচারকারীদের ফাঁদ এখনো আছে। অনুমান করি মিজদা শহরে ২৮ মে যাঁরা নিহত-আহত হয়েছেন, বাংলাদেশের সেই নাগরিকেরাও সেই ফাঁদেই পা দিয়েছিলেন।

কেবল কি ইউরোপের পথেই বাংলাদেশের অসহায় মানুষেরা পা বাড়ান? আমরা হয়তো ভুলে গেছি, ২০১৫ সালের মে মাসে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তের জঙ্গলে আবিষ্কৃত হয়েছিল গণকবর—অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা। আবার আগস্ট মাসে একই জঙ্গলে আরও গণকবর আবিষ্কৃত হলে জানা গেল, তাঁদেরও অনেকেই বাংলাদেশের। তখন বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় মানব পাচার চক্রের আদ্যোপান্ত নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এই চক্রের কিছু হয়েছে এমন জানা যায়নি। তাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি কি এতটাই যে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে? নাকি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিবেদনে যে কথা বলা হয়েছে সেটাই আসল কথা—‘বাংলাদেশের মানব পাচারের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা এখনো গুরুতর একটি সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।’ এসবের সঙ্গে এটাও কি কারণ যে যাঁরা এই ভয়াবহ বিপদের পথে পা বাড়ান, তাঁরা সমাজের যে শ্রেণির মানুষ, তাঁদের নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই? কিন্তু তাঁদের পাঠানো অর্থ প্রতিবছরের ১৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সে যুক্ত হলে তাতে আপত্তি থাকে না।

২০১৫ সালে মালয়েশিয়ার জঙ্গলে লাশের খবর দেখে মনে পড়েছিল, বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনেরা সেই সময়ে ‘সীমিত গণতন্ত্রের উন্নয়ন’–এর মডেল হিসেবে মালয়েশিয়ার কথা বলতেন, বাংলাদেশের ধনিক শ্রেণির অনেকের ‘সেকেন্ড হোম’ মালয়েশিয়ায়। কিন্তু সেই মালয়েশিয়ার জঙ্গলে পড়ে থাকা বাংলাদেশিদের খবর কেউ রাখেন না। অর্থনীতির শনৈঃ শনৈঃ উন্নতির খবর আমরা অবিরাম শুনেছি। এত উন্নয়ন আর প্রবৃদ্ধির দেশ থেকে প্রতিবছর সাত লাখ বাংলাদেশি কেন অবৈধভাবে পাড়ি জমাবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না।

লিবিয়ায় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের খবরের পাশে আরেকটি খবর প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। বহুজাতিক আর্থিক পরামর্শদানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স-এর ‘আ ডিকেড অব ওয়েলথ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘সম্পদশালীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক দিয়ে গত দশকে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে দেশে ধনকুবেরের (৫০ লাখ ডলারের বেশি সম্পদের অধিকারী) সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হারে’ (প্রথম আলো, ২৮ মে ২০২০)। এই সংবাদ পড়ে প্রশ্ন জাগল, সামান্য ভাত-কাপড়ের সন্ধানে গিয়ে লিবিয়ার মিজদা শহরে যাঁরা প্রাণ হারালেন, তাঁরা কি এই বাংলাদেশ থেকেই গিয়েছিলেন?

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন