আমাদের চোখ, কান সব সয়ে গেছে?

বিজ্ঞাপন
default-image

দুই ভবনের মাঝখানে পড়ে ছিল ২০ বছর বয়সী জীবনের মৃতদেহটি, বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরেই। পড়ে যাওয়ার শব্দ অনেকেই শুনতে পেলেও সিদ্ধেশ্বরীর রুবাইয়াত শারমিনের ধর্ষণ ও হত্যা নিয়ে শোনার মতো প্রতিবাদ হয়নি। তবে এতটুকু সান্ত্বনা যে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহপাঠী আর শিক্ষকেরা কাঁদছেন। হত্যাকাণ্ডের পর তাঁরা প্রতিদিনই মানববন্ধন করছেন। বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন এবং এখনো রাজপথে আছেন। মিডিয়ায় প্রথম দিন শারমিন হত্যা খুব বেশি জায়গা নিতে পারেনি। কারণ, সামাজিক গণমাধ্যমের সবাই ব্যস্ত তারকাদের বিয়েশাদির খবর নিয়ে। তাদের কাছে হয়তো শারমিন খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না, তাই সেখানে জায়গা নেওয়া কঠিন।

হত্যা, ধর্ষণ এখন স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। আমরা সম্ভবত সয়ে নিয়েছি ব্যাপারগুলো। প্রতিদিনই আমরা কমবেশি এ বিষয়ে শুনি, নিজেরাও আলাপ-আলোচনা করি। আর প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ধর্ষণ-হত্যার খবর পাই।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুবাইয়াত শারমিন হত্যার ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও হত্যারহস্যের কূলকিনারা করতে পারেননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে তাঁর নিজের এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। এ কথা সত্য যে বাংলাদেশে এখন বেশির ভাগ বিচারের জন্যই জনগণকে রাস্তায় নামতে হয়, দাবি জানাতে হয়। তবে সবাই যে সব ইস্যুতে নামে, তাও নয়। ভিকটিমের পরিচয়, মর্যাদা কতটুকু, তা আগে দেখা হয়। দেখা হয় যে মিডিয়া তাকে কতটুকু গুরুত্ব দিচ্ছে। কীভাবে তাকে হত্যা করা হলো ইত্যাদি। অপরাধকর্মের ভিডিও থাকলে ভিকটিমের জন্য সুবিধা, মরণোত্তর মনোযোগ পাওয়া যায় বেশি।

এসব বিষয় মাথায়-মননে রেখেই এগোতে থাকে প্রতিবাদের ধারা ও ধরন। হত্যাকাণ্ডের ধরন অনেক বেশি মর্মান্তিক হলে আলোচিত হয় বেশি, তা না হলে সেটির কদর মিডিয়ায় খুব বেশি নেই। তবে এটাও ঠিক যে অনেক বড় ধরনের এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবাদ হওয়া সত্ত্বেও সব ঘটনার যে বিচার দ্রুত হয়েছে, তা নয়। অনেক ঘটনারই বিচার আদৌ হয়নি কিংবা আসামিরা খালাস পেয়ে গেছেন।

আমাদের প্রতিবাদের ধরন পাল্টেছে। আমার নিজের কেউ না হলে, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের না হলে, ঢাকা শহরের না হলে, নামকরা স্কুল-কলেজের না হলে আমরা আর তার জন্য প্রতিবাদী মঞ্চে দাঁড়াতে চাই না। আমরা ভাবি, শারমিন যেহেতু স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের, তাহলে সেখানকার শিক্ষার্থীরাই প্রতিবাদ করবেন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে আমরা করব। আমরা-তাঁরা এই ভাগের রাজনীতি আমাদের আর কিছুতেই এক প্রতিবাদী শামিয়ানায় এক করে না। আমরা কেবলই তার শ্রেণি, পরিচয়, এলাকা, জাতপাত খুঁজে বেড়াই। এর বাইরে চলে সেই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তর্কাতর্কি। কখনো কখনো চলে মেয়েটির পোশাক নিয়ে, কখনো চলে রাতে কেন গেল কিংবা একলা কেন গেল—সেই বিষয়ে বাগ্‌বিতণ্ডা। আর এত সব বাগ্‌বিতণ্ডার মধ্যে আস্তে আস্তে নাই হয়ে যায় প্রতিবাদ আর আন্দোলন।

আন্দোলনেও এসেছে শৌখিনতা, হচ্ছে ক্ষণস্থায়ী। দু–এক দিন আওয়াজ তুলেই বেশির ভাগ আন্দোলন শেষ হয়ে যায়। আর বাংলাদেশের নারী আন্দোলনও এখন এনজিওকেন্দ্রিক। এনজিওদের নড়াচড়াও অনেক বেশি ডোনারদের চাওয়াকেন্দ্রিক। তাই তাদের সংগঠনের মর্জি, ডোনারদের চাওয়া—সবকিছুর ওপরই নির্ভর করে বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের গতিবিধি। তাই এই আন্দোলনে ঝাঁজ নেই, তেজ নেই, ক্ষিপ্রতা নেই। আর তা নেই বলেই বারবার একই ধরনের সহিংসতা হতে থাকে।

আমরা এই ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ডগুলোকে ‘ঘটনা’ হিসেবে দেখি, এটিকে রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখি না। যে কারণে প্রতিটিই সহিংসতায় ব্যক্তিক হয়ে ওঠে এবং সমাজের সমন্বিত শক্তি এটির বিরুদ্ধে কাজ করে কম।

একেকটা মামলা চলে দীর্ঘদিন। একসময় মানুষ ভুলে যায় একেকটি ভয়াবহ অপরাধের কথা, হত্যাকাণ্ডের কথা। এ রকমই চলছে। আমাদের চোখ সয়ে নেয়, কান সহনীয় হয়ে যায়, মন মেনে নেয়। এভাবেই জীবনে আর মন নিয়ে থাকা হয় না, মেনে নিয়েই আমরা আরেকটি হত্যাকাণ্ড–ধর্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি কেবল।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
zobaidanasreen@gmail.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন