বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এখন বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকার আদতে এ ধরনের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। আদতে তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্জলা সামরিক ও কৌশলগত অভিযান চালানো। রাশিয়া, চীন ও ইরানের আশপাশে যাতে জোরালো সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়, সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযান চালিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র তার সেই লক্ষ্যে কিছুটা সফল হয়েছিল কিন্তু তার খেসারত দিতে হয়েছে আফগানিস্তানের সাধারণ মানুষকে। তাদের ওপর ব্যাপক বিপর্যয় নেমে এসেছিল।

এখন আফগানিস্তানে ‘নতুন ও উন্নত’ ধরনের তালেবান ক্ষমতা দখল করেছে। এটিকে আফগানিস্তানের বাসিন্দাদের জন্য ‘আমেরিকার উপহার’ বলা যেতে পারে। দোহায় যখন আমেরিকান নেতারা কয়েক মাস ধরে তালেবানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন, তখনই তাঁরা ভালো করে বুঝতে পেরেছিলেন, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা সরিয়ে নেওয়ার পরপরই তালেবান কাবুল দখল করে নেবে। এটি স্পষ্ট যে এ পর্যন্ত যা হয়েছে তা আসলে পূর্বপরিকল্পনামতোই হয়েছে। শুধু কাবুল বিমানবন্দরে সামান্য অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে।

এখন যে তালেবানকে দেখা যাচ্ছে, তারা ২০ বছর আগেকার তালেবান থেকে একেবারে ভিন্ন। এবার দেখা যাচ্ছে এ নতুন তালেবান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির অংশ হতে চাইছে। মনে হচ্ছে দোহা আলোচনার সময়ই তারা বুঝে গেছে, আফগানিস্তানে ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাগবে। তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে তাদের আফগান নাগরিকদের শাসন করতে হবে, তাদের সন্ত্রাস দিয়ে আতঙ্কিত করা যাবে না।

তালেবানের প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই বোঝা গেছে, তাদের নেতারা বিবিসি, সিএনএন বা আল–জাজিরার সংবাদ পরিবেশনার বিষয়ে যথেষ্ট সজাগ। মিডিয়ার সামনে তারা বারাক ওবামার মতো সূক্ষ্ম চাতুর্যের সঙ্গে মিথ্যা বলা শিখে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, বরিস জনসন ও এমানুয়েল মাখোঁর চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ভাষায় তাঁরা কথা বলতে শিখে গেছেন।

আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যদি কেউ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তো সে আফগানরাই। ইরান, পাকিস্তান, তুরস্ক ও আরব দেশগুলোর নারীরা যেভাবে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে তাঁদের অধিকারের পক্ষে লড়ে যাচ্ছেন। আফগানিস্তানের নারীরাও একইভাবে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে লড়বেন।

আজ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপিয়ান উদারপন্থী সংবাদমাধ্যম তালেবানের আকস্মিক ক্ষমতা দখল যুক্তরাষ্ট্রের ও তার মিত্রদের দৃশ্যত নিষ্ফল (নাকি পূর্বপরিকল্পিত) ব্যর্থতায় ভয়ানক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। তাদের বিব্রত হওয়ার মূল কারণ, একসময় এ মিডিয়াগুলো আফগানিস্তানের তালেবান ও ইসলামি মতাদর্শকে হটিয়ে সেখানে উদার মতাদর্শ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে জর্জ বুশ যেসব মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই প্রতিশ্রুতি প্রচার করে তারা তাকে তখন সমর্থন জুগিয়েছিল। তারা নাইন–ইলেভেনের হামলার পর বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিল, আফগানরা তালেবানকে চায় না। তালেবানকে তারা শয়তান হিসেবে চিত্রিত করেছিল। কিন্তু এত বছর পর তাদের চিত্রায়িত সেই ভাবমূর্তির সঙ্গে তালেবানের বর্তমান চেহারার বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। এটি তাদের বিব্রত হওয়ার অন্যতম কারণ। জর্জ বুশ যখন তাঁর কথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ চালাচ্ছিলেন, তখন সারা বিশ্বে ইসলাম ও মুসলিম সম্প্রদায়কে যেভাবে সামনে আনা হচ্ছিল, সে মুহূর্তে আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের জন্য ছিল ঘোর অমানিশার কাল।

দুই দশক আমেরিকা আফগানিস্তানে দখলদারি করে আফগানদের জন্য কী দিয়েছে? শান্তি? অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি? গণতন্ত্র? আমেরিকা এই গ্রহের যেখানে যেখানে এসব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কোথায় কোথায় আসলেই তারা তা দিয়েছে? যখনই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী রিপাবলিকানরা আন্তর্জাতিক জরিপে দেখেছে, তাদের সংখ্যা ক্রমাগত কমে আসছে, তখনই তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভান করে দুর্বল দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে নিজেদের শক্তি জাহির করেছে।

এত দিন পর বোঝা যাচ্ছে, আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যদি কেউ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে, তো সে আফগানরাই। ইরান, পাকিস্তান, তুরস্ক ও আরব দেশগুলোর নারীরা যেভাবে নিজ নিজ অবস্থানে থেকে তাঁদের অধিকারের পক্ষে লড়ে যাচ্ছেন। আফগানিস্তানের নারীরাও একইভাবে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে লড়বেন। ভারতে ধর্ষণের বিরুদ্ধে নারীদের আমরা কি একজোট হয়ে প্রবল আন্দোলন করতে দেখিনি? একইভাবে আফগানিস্তানেও সেখানকার মানুষ তাঁদের অধিকারের পক্ষে কথা বলবেন।

আফগানিস্তান সেই ভূমি, যা রুমির মতো কবিকে উপহার দিয়েছে। হেরাত স্কুল অব আর্ট অ্যান্ড আর্কিটেকচারের মতো প্রতিষ্ঠান যেখানে আছে, অসংখ্য কবি, দার্শনিক, সুফি, ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানীর জন্ম যেখানে, সেখানে যেকোনো উগ্রবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। সে প্রতিবাদ আসবে আফগানদের মধ্য থেকেই। সে প্রতিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের শেখানো প্রতিবাদ নয়।

আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

  • হামিদ দাবাশি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন