প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরব ব্যারোমিটার মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও নির্বাচনী সংস্থাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ২০২১ সালের শেষ সময় থেকে ২০২২ সালের বসন্ত পর্যন্ত এই জরিপটি চালায়। প্রতিষ্ঠানটির ডিরেক্টর মিখাইল রবিনস বলেন, এর আগেরবার ২০১৮-১৯ সালে চালানো জরিপের তুলনায় এবারের জরিপে এই অঞ্চলে গণতন্ত্র নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে।

মিখাইল রবিনস আরও বলেন, ‘এখানকার মানুষের ক্রমবর্ধমান উপলব্ধি হলো যে গণতন্ত্র একটি নিখুঁত সরকারব্যবস্থা দিতে পারে না।’ রবিনস বলেন, ‘আমরা এই অঞ্চলজুড়ে যা দেখি তা হলো মানুষের ক্ষুধা, তাঁদের রুটি প্রয়োজন, মানুষ এই ব্যবস্থায় হতাশ হয়ে পড়েছে।’ জরিপ চালানো প্রতিটি দেশের সাক্ষাৎকার দেওয়া অর্ধেকের বেশি মানুষ দৃঢ়ভাবে বলেছেন, তাঁরা সরকারের ধরনের চেয়েও সরকারের নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন।

এই জরিপে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ইসরায়েলকে বাইরে রাখা হয়েছে। ইরান ও তুরস্ককেও বাইরে রাখা হয়েছে। এই অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশ জরিপে অংশ নিলেও বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় সরকার তাদের জরিপ চালানোর সুযোগ দেয়নি। প্রবেশের অসুবিধার কারণে সিরিয়াও বাদ পড়েছে। কিছু দেশ আইনি ও সাংস্কৃতিক কারণে কিছু প্রশ্ন বাদ দিতে বলেছিল, সেসবও বিবেচনায় রেখে জরিপটি পরিচালনা করা হয়।

ইকোনমিস্ট ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের গণতন্ত্রের সূচক অনুসারে, বিশ্বের সব অঞ্চলের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অবস্থান সবচেয়ে নিচের দিকে। ইসরায়েলকে ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়৷ তিউনিসিয়া ও মরক্কোকে ‘হাইব্রিড শাসন’ এবং অঞ্চলের বাকি দেশগুলোর সরকারকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।

আরব ব্যারোমিটারের সমীক্ষায় সাতটি দেশ ও ফিলিস্তিন এলাকায় অর্ধেকের বেশি উত্তরদাতা এই বিবৃতির সঙ্গে একমত যে তাদের দেশে এমন একজন নেতার প্রয়োজন যিনি প্রয়োজনে ‘নিয়ম বাঁকা’ করতে পারেন। শুধু মরক্কোর অর্ধেকের কম উত্তরদাতা এর সঙ্গে একমত। আর ফিলিস্তিন, জর্ডান ও সুদানে এর সঙ্গে দ্বিমতপোষণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অনুপাত পাওয়া গিয়েছে।

তিউনিসিয়ায় ১০ জনের মধ্যে ৮ জনই এ বিবৃতির সঙ্গে একমত। আবার ৯ জনই বলেছেন, তাঁরা ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্রেসিডেন্ট কর্তৃক সরকারকে বরখাস্ত করা ও পার্লামেন্ট স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন। বিরোধী দল এটিকে ক্যু হিসেবে আখ্যা দিলেও প্রেসিডেন্টের ঘোষণা ছিল, দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে শোধরাতে এটির প্রয়োজন ছিল।

২০২১ সালে আরব বসন্তের পর শুধু তিউনিসিয়াই স্থায়ীভাবে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করতে পেরেছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্টের অধীন দেশটি এখন কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের সূচকেও এমন প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রেসিডেন্ট নিজের কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠায় অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। নির্বাচন কমিশনের ওপর এখন প্রেসিডেন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। এরই মধ্যে দেশটির অর্থনীতি গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

আরব ব্যারোমিটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সটন স্কুল অব পাবলিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিন আমানি জামাল বলেন, ‘তিউনিসিয়ার জন্য এটা দুর্ভাগ্য যে দেশটি কর্তৃত্ববাদের দিকে ফিরে যাচ্ছে, আমরা যাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে পিছুহটা বলি, যা আজ সারা বিশ্বের একটি প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিউনিসিয়ায় এখন এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে গণতন্ত্র সেখানে অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

দুর্নীতি, অস্থিতিশীলতা ও কোভিড-১৯ মহামারির বিস্তার সাতটি দেশ ও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। শুধু দুটি দেশে গণতন্ত্রের জন্য অর্থনৈতিক দুরবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়নি। ইরাকে সেটির কারণ হিসেবে দুর্নীতিকে দেখা হয় আর লিবিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হওয়ার কারণে অর্থনীতি অস্থিতিশীল।

প্রতিটি দেশের অন্তত তিনজনের একজন এ বিষয়ে একমত যে গত এক বছরে খাবারের জন্য তাঁদের দৌড়াতে হয়েছে। টেবিলে খাবার নিয়ে বসতে বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে মিসর ও মৌরিতানিয়ার মানুষকে। মূলত রাশিয়া ইউক্রেনে হামলার কারণে এই সংকট দেখা দেয়। গোটা অঞ্চল বিশেষ করে মিসর, লিবিয়া ও তিউনিসিয়া বেশি মাত্রায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের গমের ওপর নির্ভরশীল।

জরিপে উত্তরদাতারা খাবার ফুরিয়ে যাওয়ার পর আবার পর্যাপ্ত খাবার কিনতে সক্ষমতা হারাচ্ছেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। জরিপ করা দেশগুলোতে গণতন্ত্রের প্রতি কম সমর্থনকারী তারা, বিশেষ করে সুদান, মৌরিতানিয়া ও মরক্কোতে। সব উত্তরদাতাদের মধ্যে অর্ধেকেরও কম তাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ভালো মনে করছেন। তাদের মধ্যে সর্বনিম্ন স্থানে আছে লেবানন। দেশটির এক শতাংশেরও কম মানুষ মনে করেন যে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। বিশ্বব্যাংক লেবাননের অর্থনৈতিক সংকটকে ১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুতর বলে বর্ণনা করেছে।

তবে কিছু আশাবাদও দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া সব মানুষ সামগ্রিকভাবে আশা করেন যে আগামী কয়েক বছরে তাঁদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হবে। গোটা অঞ্চলের এক–তৃতীয়াংশ মানুষ এমনটা মনে করেন। এমনকি তিউনিসিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি সত্ত্বেও সেখানকার ৬১ শতাংশ মানুষ মনে করেন, কয়েক বছরের মধ্যে তাঁদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে।

তবে আরব ব্যারোমিটারের ড. রবিন্স বলছেন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। এই অঞ্চলের নাগরিকেরা বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে, যেমন চীনা মডেল মানে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা। এ ধরনের শাসনব্যবস্থা গত একদশকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে। দ্রুত উন্নয়নের এ ধরনের শাসনব্যবস্থাই এখন মানুষ খুঁজছে।

২০০৬ সাল থেকে আরব ব্যারোমিটার এ ধরনের জরিপ ও গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। তবে এই জরিপে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও ইসরায়েলকে বাইরে রাখা হয়েছে। ইরান ও তুরস্ককেও বাইরে রাখা হয়েছে। এই অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশ জরিপে অংশ নিলেও বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় সরকার তাদের জরিপ চালানোর সুযোগ দেয়নি। প্রবেশের অসুবিধার কারণে সিরিয়াও বাদ পড়েছে। কিছু দেশ আইনি ও সাংস্কৃতিক কারণে কিছু প্রশ্ন বাদ দিতে বলেছিল, সেসবও বিবেচনায় রেখে জরিপটি পরিচালনা করা হয়।

বিবিসি নিউজ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ রাফসান গালিব

জেসি উইলিয়ামস, সারাহ হ্যাবারশন ও ব্যাকি ডেল বিবিসি নিউজ অ্যারাবিকের সাংবাদিক ও ডেটা জার্নালিজম টিমের সদস্য

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন