বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এখানে জনপ্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের আইন অমান্য করেছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হতে পারে দেশে ভূমিসংক্রান্ত উন্নয়ন, মালিকানা পরিবর্তন বা যেকোনো ধরনের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ভূমি মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত দিতে পারে। কিন্তু একজনের মালিকানাধীন জমি আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিতে পারে না। জনপ্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয় আরও যুক্তি দেখাতে পারে, বন বিভাগকে দেওয়ার আগে এই জমির মালিকানা ভূমি মন্ত্রণালয় বা ভূমি বিভাগের অধীনে ছিল। নিজের জমিই ভূমি মন্ত্রণালয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দিয়েছে। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের এক বিভাগের জমি আরেক বিভাগকে দিয়েছে। এতে সমস্যা কী? এখানে সমস্যা আছে। সরকারের এক বিভাগ চাইলেই আরেক বিভাগকে জমি দিতে পারে না। কিছু নিয়ম ও আইন মানতে হয়। এ জন্যই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা হয়।

ভূমি মন্ত্রণালয় সংরক্ষিত বনভূমিকে খাসজমি হিসেবে দেখিয়েছে। ঝিলংজা বনভূমি যে খাসজমি নয়, এটা সরকারি নথি ও রেকর্ডেই আছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব মালিকানাধীন ছাড়া যেকোনো জমি কাউকে দিতে হলে তা আগে অধিগ্রহণ করতে হবে। ভূমি মন্ত্রণালয় তো এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি; বরং ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা মূল্যের ৭০০ একর জমি মাত্র ১ লাখ টাকায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে দিয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের কাজে রাষ্ট্রের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এ জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণাদাতা হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল আমলাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের সম্পদের ক্ষতি হলে কর্মচারীদের আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়। অবশ্য আমাদের দেশে সেটি না করাটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে।

আমাদের ১৮ কোটির দেশে একাধিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকার পরও ৭০০ একরের আরও একটি একাডেমির প্রয়োজন বোধগম্য হচ্ছে না একেবারেই। শুরুতেই তো মনে হচ্ছে, জনপ্রশাসন কর্মচারীদের জন্য অনেকটা ‘প্রমোদকেন্দ্র’ হবে এটি। এটা কি গত নির্বাচনে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবদানের পুরস্কার?

প্রশাসন একাডেমির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সাভারে ১০০ একর জমির ওপর লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। শাহবাগেও একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। এ ছাড়া আছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিয়াম)। এসব প্রতিষ্ঠানই আমলাদের প্রশিক্ষণের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু এ তিন প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দিয়ে জনপ্রশাসনকে দক্ষ করতে পারেনি। আমাদের জনপ্রশাসন যে দক্ষ নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওয়েবসাইটগুলোতে গেলেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এসব ওয়েবসাইটে যাওয়া এক বিশাল ঝক্কির বিষয়। বিয়ামের ওয়েবসাইটটির কথাই বলা যাক। ওয়েবসাইটের ঠিকানা দিলে ইংরেজি ভার্সন চলে আসে। বাংলা ভার্সনে যাওয়ার জন্য নির্ধারিত জায়গায় ক্লিক করলে ওয়েবসাইটটি আর কাজ করে না। ওয়েবসাইট পরিচালনা তো কেবল ছোট একটি দিক। সার্বিক বিবেচনায় জনপ্রশাসনের করুণ অবস্থা তো কারও অজানা কিছু নয়। নতুন কোনো একাডেমি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আসলে দেশকে কী দেবে? রাষ্ট্রীয় ব্যয় বৃদ্ধি করা ছাড়া।

ভারতের জনপ্রশাসনবিষয়ক প্রশিক্ষণের জন্য লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ন্যাশনাল একাডেমি অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মাত্র ১৮৯ একর জমির ওপর ছয়টি ক্যাম্পাসে অবস্থিত। প্রায় দেড় শ কোটি মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্য বিশাল জনপ্রশাসনের প্রশিক্ষণ সেখানে হয়। আমাদের ১৮ কোটির দেশে একাধিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকার পরও ৭০০ একরের আরও একটি একাডেমির প্রয়োজন বোধগম্য হচ্ছে না একেবারেই। শুরুতেই তো মনে হচ্ছে, জনপ্রশাসন কর্মচারীদের জন্য অনেকটা ‘প্রমোদকেন্দ্র’ হবে এটি। এটা কি গত নির্বাচনে জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবদানের পুরস্কার? ওই নির্বাচনে প্রশাসনের কী ধরনের ভূমিকা ছিল, তা আমাদের সবারই জানা।

বিভিন্ন ঘটনায় এটা পরিষ্কার যে আমলারা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। আমলাদের আচরণ নিয়ে রাজনীতিবিদেরা সংসদে প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, আমলারা এখন নিজেদের মন্ত্রী-সাংসদদের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করছেন। কিন্তু রাষ্ট্রের মালিক আমলারা নন; আমলারা রাষ্ট্রের কর্মচারী মাত্র। জনসাধারণের সেবা করা তাঁদের কাজ। প্রশাসনের কর্মচারীরা নিজেদের অবস্থান ভুলে যাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের আচরণ জনমনে নানা ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি করছে। প্রশাসনের কর্মচারীদের ‘স্যার’ সম্বোধন করতে নাগরিকদের বাধ্য করা নিয়েও কম সমালোচনা নেই। সম্প্রতি এক আমলা কক্সবাজারে গিয়ে একাধিক অস্ত্রসহ ছবি দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি ছবি ঘুরে বেড়িয়েছে। বৈধ বা সরকারি অস্ত্র হলে এভাবে সাজিয়ে রেখে প্রদর্শন করা কতটুকু আইনসম্মত। আর অস্ত্রগুলো অবৈধ হলে ওই আমলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আরেক সচিব তাঁর মায়ের চিকিৎসার জন্য ২৪ জন সরকারি কর্মচারীকে নিয়োজিত করে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে দিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব খবর এবং তথ্য দেখে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত ও হতাশ হয়েছে। একজন আমলা যখন সারি ধরে অস্ত্র সাজিয়ে রেখে ছবি তোলেন, তখন সাধারণ নাগরিকেরা আতঙ্কিত বোধ করবেন খুবই স্বাভাবিক কারণে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকারি কর্মচারীরা যথেচ্ছভাবে ক্ষমতা, সরকারি অর্থ ও সম্পদের ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। দুর্নীতি ও অনিয়মের নতুন নতুন পথ নির্মাণ করছেন। কক্সবাজার নতুন প্রশাসন একাডেমি এমন আরেকটি উদ্যোগ মাত্র। জনগণের অর্থের অপচয় ও বিশাল একটি সংরক্ষিত বন এবং এর জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা ছাড়া এ থেকে কোনো ফল মিলবে না।

ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন