default-image

জীবনযাত্রা সমাপ্ত করলেন ড. আলী আসগর। ১৬ জুলাই ৮৪ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হলেন। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। সুদীর্ঘকাল তিনি জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। শিশুদের বিজ্ঞানমনস্ক করতে গড়ে তুলেছেন ‘বিজ্ঞান খেলাঘর’। বিজ্ঞান মেলার আয়োজনের মূল উদ্দীপক ছিলেন। জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। শিশু-কিশোরদের জন্য সহজ ভাষায় বিজ্ঞানের প্রজেক্ট লিখেছেন। তিনি জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ডজনখানেক। পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। এটুকু বললেই ড. আলী আসগরকে বর্ণনা করা হয় না। তাঁর মৌলিক পরিচয় হলো, তিনি একজন বিজ্ঞানমনস্ক অসাম্প্রদায়িক মানুষ।

এ দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজেদের অসাম্প্রদায়িক হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। এঁদের অনেকেই আবার চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় আপস করে ফেলেন। প্রচুরসংখ্যক বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিকে দেখা যায় ব্যক্তিগত সংকটের সময় দ্রুত নিজেকে সংস্কারের কাছে সমর্পণ করে নিদানের পথ খুঁজে নেন। মৌলবাদীরা তাঁর মাথার মূল্য ঘোষণা করেছিল। মৃত্যুভয় তাঁকে পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি দ্বিধাহীন কণ্ঠে আপন বিশ্বাসের কথা বলেছেন। বিজ্ঞানমনস্ক বলেই তিনি অসাম্প্রদায়িক। তিনি যথার্থই অনুভব করতেন বুদ্ধির মুক্তি ছাড়া জাতীয় অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ জন্য পেশার বাইরে কাজের ক্ষেত্র হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছিলেন শিশু-কিশোর সংগঠনকে। তিনি মনে করতেন, শিশুদের বিজ্ঞানমনস্ক ও অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। তাই ছাত্রদের পিএইচডির থিসিস দেখার পাশাপাশি তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য বিজ্ঞানের প্রজেক্ট লিখতেন একই টেবিলে বসে। খেলাঘরের তরুণ কর্মীদের সঙ্গে সারা দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, প্রতিটি শিশুর মধ্যে রয়েছে ‘অমিত সম্ভাবনা’। এই অমিত সম্ভাবনা বিকাশে সব সময় প্রস্তুত থাকতেন শিশুদের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য।

অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। তিনি কথা বলতেন সমগ্র শরীর দিয়ে। তাঁর উচ্চারিত শব্দ ও বাক্য শুধু মুখ থেকে নয়, সারা দেহ থেকে ঠিকরে বের হতো। অনেকটা হীরার মতো। কারণ তিনি বিশ্বাসের গভীর থেকে কথা বলতেন। দর্শক-শ্রোতা তাঁর কথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতেন। ড. আলী আসগরের লেখা তাঁর কথার মতোই সাবলীল প্রাণবন্ত। লেখা আর কথায় তিনি খুব সহজভাবে বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি ও যৌক্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। সমাজের নানা বিষয়কে বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে বিশ্লেষণ করার অসাধারণ পদ্ধতির প্রচলন আধুনিক বাংলা গদ্যে তাঁর হাত দিয়েই ঘটে। জায়গাটিতে তিনি অগ্রপথিক। তাঁর জীবনের ধ্রুবতারা ছিলেন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। একজন বিজ্ঞানী চূড়ান্ত অর্থে দার্শনিক।
দার্শনিকেরা মূলত কবি। কবিরা শেষ পর্যন্ত স্বাপ্নিক। যাঁরা স্বপ্নের চাষাবাদ করে ফসল ফলানোর প্রয়াসে মগ্ন থাকেন, তাঁরাই মূলত মানুষ হিসেবে অগ্রপথিক। তাই বলব ড. আলী আসগর হলেন মুষ্টিমেয় অগ্রপথিকের একজন। অর্জিত অভিজ্ঞতা, চর্চিত জ্ঞান এবং যৌক্তিক বিশ্লেষণের দ্বারা স্বপ্নসৌধ রচিত হয়। স্বপ্নসৌধকে বাস্তব সৌধে রূপান্তরের প্রয়াসে অগ্রপথিকেরা সমগ্র জীবন নিবেদিত থাকেন। বিত্ত অথবা উচ্চাসনের প্রলোভনে তাঁরা প্রলুব্ধ হন না। ড. আলী আসগরের জীবনে এটি উজ্জ্বলভাবে প্রতিফলিত।

নিবিড় নিমগ্ন জ্ঞানচর্চায় যাঁরা সারাক্ষণ নিমজ্জিত থাকেন, তাঁরা মাঝেমধ্যে প্রাত্যহিক বাস্তবতা থেকে দূরে অবস্থান করেন। ড. আলী আসগরের মধ্যেও বিষয়টি লক্ষ করা যেত। খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় তিনি মাঝেমধ্যে সবাইকে ছাত্র ভেবে নিতেন। সভার মূল বিষয় বাদে বিজ্ঞান ও দর্শন নিয়ে তিনি মেতে উঠতেন। এতে সভার অনেক কিছু বাদ পড়ে যেত। কিন্তু অন্যদিকে আমরা যারা সভায় উপস্থিত থাকতাম, তারা সমৃদ্ধ হতাম। ড. আলী আসগরের সঙ্গে আমাদের অনেকের দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষ ও ভিন্নমত হতো। তিনি বলতেন, শিশুর বিকাশ হবে স্বতঃস্ফূর্ত। সে বেড়ে উঠবে নিজের মতো। যেমন নানা জায়গায় চেনা বা অচেনা ফুল নিজের মতো করে ফোটে, সুবাস ছড়ায়। আমরা বলতাম, শিশুর বিকাশ হবে লক্ষ্যাভিমুখী। স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে জিন বা বংশগতির সম্পর্ক অনেক বেশি। লক্ষ্যমুখী বিকাশের জন্য বংশগতির সঙ্গে পরিবেশের বিষয়টি যুক্ত। সংগঠন শিশুর বিকাশের পরিবেশ তৈরি করে দেবে। আমি এখনো নিশ্চিত নই কোনটি ঠিক এবং কোনটি ভুল। তবে এখন অনুভব করতে পারি, ভুল বা ঠিক নির্ণীত হয় স্থান, কাল ও নির্ণায়কের ওপর ভিত্তি করে। সেই অর্থে দুটো দৃষ্টিভঙ্গিই সঠিক এবং সঠিক নয়। মূল বিষয় হলো, মূল্যায়নের সময় কোন নির্ণায়কগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে।

অগ্রপথিকেরা সাধারণত নিঃসঙ্গ থাকেন। কারণ সব সমাজেই সামনে চলার লোক কম থাকে। অবশ্য স্বপ্নেরা তাদের সঙ্গ দেয়। অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের বরফ মাড়িয়ে তাঁরা নির্ভীক শেরপার মতো চূড়া অভিমুখে পথ চলেন। এঁরা বারবার ক্ষতবিক্ষত হন জড়বাদীদের আঘাতে। ড. আলী আসগরের জীবন তাই এক নিঃসঙ্গ শেরপার জীবন। জ্ঞানযোগ এবং জ্ঞান অভিমুখী কর্মযোগ—এটাই ছিল তাঁর জীবনব্রত। মাথাভরা বাবরি চুল, প্রাণবন্ত উচ্ছল দেহভঙ্গি, আকর্ষণীয় ভঙ্গিমায় কথা বলে যাচ্ছেন একজন স্বাপ্নিক মানুষ। শব্দের পর শব্দেরা বেরিয়ে এসে মায়াজাল রচনা করছে, অন্যদিকে মোহাবিষ্ট শ্রোতাবৃন্দ—এই দৃশ্যকাব্য আর রচিত হবে না। একজন বুড়ো শিশু অনায়াসে মিশে যেতেন শিশু-কিশোরদের সঙ্গে। শিশুদের শোনাতেন স্বপ্ন নির্মাণের গল্প, শোনাতেন জ্ঞানবিজ্ঞানের হিরণ্ময় জগতের বর্ণনা। নির্ভয়ে আপন বিশ্বাস এবং আস্থার কথা বলতেন। তিনি বলতেন, ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। অতএব স্বপ্ন দেখো, অনেক বড় স্বপ্ন।’ স্বপ্ননির্মাতাকে বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেলিন চৌধুরী: খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রেসিডিয়াম সদস্য Choudhurybd16@gmail

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0