default-image

১২ নভেম্বর ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট অনুষ্ঠিত হলো ইভিএমের মাধ্যমে। ঢাকায় ভোট পড়েছে ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং সিরাজগঞ্জে ৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ। একইভাবে ভবিষ্যতে সব জাতীয় ও স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন ও পৌরসভা) নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, প্রথমবারের মতো ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব কটি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হয়। দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১৪ হাজার ৪৩৪টি বুথে ২৮ হাজার ৮৬৮টি ইভিএম ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিটি ইভিএমের জন্য দুজন টেকনিশিয়ান নিয়োজিত ছিলেন।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে ৩৫ হাজার ইভিএম আছে। এর আগে ইভিএমের ভোটে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ, ঢাকা-৫ আসনে ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং নওগাঁ-৬ আসনে ৩৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ ভোট পড়ে। সার্বিকভাবে নতুন এই পদ্ধতিতে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশে একটু ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। কাগজের পরিবর্তে ব্যালট, আঙুলের ছাপ দিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা, বাটন চেপে ভোট দেওয়া ইত্যাদি কারণে ভোট দিতে আসা ভোটারদের মধ্যে ইভিএম নিয়ে অনেক কৌতূহল।

ইলেকট্রনিক ভোটিং আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট প্রয়োগ বা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের স্বীয় মতামত প্রতিফলনের অন্যতম মাধ্যম। এর অন্য নাম ই-ভোটিং। ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় এটি একাধারে সঠিকভাবে ভোট প্রয়োগ ও দ্রুততার সঙ্গে ভোট গণনা করতে সক্ষম। ভোট প্রয়োগের ক্ষেত্রে উন্নত এবং উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অতিদ্রুত ব্যালট পেপার গণনা করা সম্ভব। একই সঙ্গে অক্ষম ভোটাররাও তাঁদের ভোট সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। ভোট গ্রহণের স্থান হিসেবে ভোটকেন্দ্রেই মূলত ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, টেলিফোন ব্যবহার করেও ই-ভোটিং প্রয়োগ করা সম্ভব। নতুনতর অপটিক্যাল স্ক্যান ভোটিং পদ্ধতিতে পাঞ্চকার্ড, অপটিক্যাল স্ক্যানার ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে একজন ভোটার ব্যালট পেপারকে চিহ্নিত করে ভোট প্রদান করেন।

বিজ্ঞাপন
সাধারণত দুটি প্রধান উপায়ে ই-ভোটিং নিশ্চিত করা যায়। ১. ভোট কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের প্রয়োগ হবে। সরকারি অথবা স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা সরাসরি তত্ত্বাবধান করবেন। ২. দূরবর্তী স্থানে অবস্থানরত ভোটাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক ভোটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন, যা আই-ভোটিং নামে পরিচিত।

সাধারণত দুটি প্রধান উপায়ে ই-ভোটিং নিশ্চিত করা যায়। ১. ভোট কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের প্রয়োগ হবে। সরকারি অথবা স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা সরাসরি তত্ত্বাবধান করবেন। ২. দূরবর্তী স্থানে অবস্থানরত ভোটাররা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ব্যক্তিগত কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ব্যবহার করে ইলেকট্রনিক ভোটিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেন, যা আই-ভোটিং নামে পরিচিত। অনেক দেশে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের সাহায্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার নজির স্থাপন করেছে এরই মধ্যে। সেগুলো হলো অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, কানাডা, এস্তোনিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পেরু, রোমানিয়া, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ভেনেজুয়েলা ও ফিলিপাইন। আমেরিকাসহ কোনো কোনো দেশে ই–মেইল কিংবা ফ্যাক্সের মাধ্যমেও ভোট দেওয়ার পদ্ধতি প্রচলিত আছে।

বাংলাদেশে ২০০৭ সালে প্রথম ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের কার্যকরী সংসদ নির্বাচনে সনাতনী ধাঁচের পরিবর্তে ই-ভোটিং পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। পরে আংশিক ও পরীক্ষামূলকভাবে ৩টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের প্রয়োগ হয়। এগুলো হলো ২০১০ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশনের ১৪টি কেন্দ্রে ও ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশনের ৫৮টি কেন্দ্রে এবং ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বরে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ১৫ মে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ২৪ নম্বর এবং ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সব কটি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

দেশে প্রথমবারের মতো সব কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ হয় ১৭ জানুয়ারি ২০১১ সালে নরসিংদীর পৌরসভা নির্বাচনে এবং পরবর্তী সময়ে ৫ জানুয়ারি ২০১২ সালে কুমিল্লার সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) ছয়টি আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হয়। ছয়টি আসন দ্বৈবচয়নের মাধ্যমে চূড়ান্ত করে নির্বাচন কমিশন। আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-৬ ও ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, রংপুর-৩, খুলনা-২ এবং সাতক্ষীরা-২ আসন। পরবর্তী সময়ে জুন মাসে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে সব কটি সেন্টারে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ করা হয়।

আমাদের উপমহাদেশে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট প্রচলন শুরু হয় ভারতের কেরালা রাজ্যে, ১৯৮২ সালে। বর্তমানে ভারতের সব রাজ্যেই এই পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হয়, তবে ইভিএমের পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতিরও প্রচলন আছে। এই পদ্ধতিতে জর্ডান, মালদ্বীপ, নামিবিয়া, মিসর, ভুটান ও নেপালেও ভোট গণনা করা হয় এবং ভারতের বিশেষজ্ঞরা এসব দেশে টেকনিক্যাল সাপোর্ট বা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের ইভিএম মেশিন ভারতের আদলে তৈরি এবং এগুলো বিভিন্ন মডেলের হয়ে থাকে। একসঙ্গে ১৬ জন, ৩২ জন কিংবা ৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি এবং নির্বাচনী প্রতীক রাখার ব্যবস্থা আছে, যেখানে চারটি ব্যালট ইউনিট আছে। আধুনিক ইভিএম মেশিনে ৩৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি, নির্বাচনী প্রতীকসহ ২৪টি ব্যালট ইউনিট রাখার ব্যবস্থা করা যায়।

বাংলাদেশে ইভিএম তৈরির নকশা এবং কারিগরি দিকগুলো নিয়ে প্রাথমিকভাবে কাজ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য এবং যোগাযোগপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক লুৎফুল কবির। পরবর্তী সময়ে পি–ল্যাব (PiLab) প্রথমবারের মতো ইভিএম মেশিন প্রস্তুত করে। ভারতে বর্তমানে এ রকম একটি ইভিএমের দাম ১৭ হাজার রুপির মতো। বাংলাদেশের জন্য গত সংসদ নির্বাচনের আগে ১ লাখ ৫০ হাজার ইভিএম ক্রয়ের জন্য ৩৮২৫ দশমিক ৩৪ কোটি টাকা একনেকের মাধ্যমে অনুমোদন করে। সে হিসাবে প্রতিটি ইভিএমের দাম পড়েছে দুই লাখ টাকার বেশি।

ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট প্রয়োগের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকেই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এটিকে খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ইচ্ছাকৃত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায় বলে বিতর্ক আছে। তাই বিভিন্ন দেশে ইভিএম পদ্ধতি এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে, এমনকি আইন করেও কোনো কোনো দেশে এই পদ্ধতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট প্রয়োগের প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকেই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশ-বিদেশে অনেক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এটিকে খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ইচ্ছাকৃত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায় বলে বিতর্ক আছে। তাই বিভিন্ন দেশে ইভিএম পদ্ধতি এরই মধ্যে বাতিল করা হয়েছে, এমনকি আইন করেও কোনো কোনো দেশে এই পদ্ধতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে একসময় ইভিএম/ ই-ভোটিং পদ্ধতিতে ভোট পরিচালনা করা হতো, কিন্তু নানা রকম অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জনগণের আপত্তির মুখে ২০০৬ সালে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে ডাচ সরকার।

২০০৯ সালে আয়ারল্যান্ড এবং ইতালি এই পদ্ধতি বাতিল ঘোষণা করেছে। ২০০৯ সালে জার্মান সরকার এই পদ্ধতি বাতিল করে এবং রুল জারি করে যে দ্রুততা কিংবা দক্ষতার চেয়ে স্বচ্ছতা বেশি জরুরি। ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সেও এই পদ্ধতি এরই মধ্যে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রবল বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ইভিএম এবং ডিআরই পদ্ধতিতে ই-ভোটিংয়ের ফলে নির্বাচনী কারচুপির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

অবশ্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে রায় দিয়েছেন। যদিও বিগত কয়েকটি নির্বাচনে প্রযুক্তিনির্ভর এই ইভিএম পদ্ধতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। ১ ফেব্রুয়ারির (২০২০) ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আঙুলের ছাপ দিয়েও কোনো কোনো ভোটার তাঁর প্রিয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। অভিযোগ উঠেছে, ভোট দিয়ে দিয়েছেন অন্য কেউ। অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ মেলেনি, কিংবা ভোট দিতেও অনেক সময় লেগেছে। কিছু ক্ষেত্রে মেশিনে সমস্যা থাকায় ভোট গ্রহণ বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোট দিতে পারেননি। ন্যাশনাল আইডি কার্ড দিয়ে তিনি তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনেরও একই অবস্থা হয়েছে। আধা ঘণ্টা চেষ্টা করেও ইভিএম দিয়ে আঙুলের ছাপ মেলাতে পারেননি। পরে প্রিসাইডিং অফিসারের সহায়তায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তিনি তাঁর ভোট প্রয়োগ করেন।

গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের মা নাসরিন আউয়াল ভোট দিতে যাওয়ার মুহূর্তের মেশিন হ্যাং হয়ে যায়। এরপর প্রায় ৪০ মিনিট চেষ্টা করে কর্মকর্তারা মেশিনটি সচল করেন এবং তিনি তাঁর ভোট দেন। শ্যামলীর কিং ফয়সাল ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণের শুরুতে ইভিএম অচল হয়ে পড়ে। অচল মেশিন সরিয়ে নতুন মেশিন স্থাপন করে প্রায় আধা ঘণ্টা পর সেখানে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। সিনিয়র সাংবাদিক জনাব আবু সাঈদ খানও তিনি তাঁর ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এ ধরনের আরও অনেক অনিয়মের কথা বিভিন্ন মিডিয়া ও সাংবাদিকদের সাধারণ ভোটাররা জানিয়েছেন। অর্থাৎ, বিতর্ক এড়াতে পারেনি বহুল আলোচিত-সমালোচিত এই ইভিএম। তবু প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। বর্ণিত সমস্যাগুলো সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে এবং ভবিষ্যতে আরও সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচনী কাজে ইভিএমের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, এমনটাই সবার প্রত্যাশা।

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0