default-image

রমজান অর্থ অগ্নিদগ্ধ করা, ভস্মীভূত হওয়া। রমজানে রোজা পালনের মাধ্যমে ক্ষুধায় উদর পোড়ে, তৃষ্ণায় বুক জ্বলে। ক্ষুধা-পিপাসার দহনজ্বালায় নফসকে দাহন করে পরিশুদ্ধ ও পাপমুক্ত করা রোজার মূল লক্ষ্য। এটিকেই কোরআনের ভাষায় তাকওয়া বা খোদাভীতি বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বে যারা ছিল তাদের প্রতিও; যাতে তোমরা মুত্তাকি (খোদাভীরু) হতে পারো।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৮৩)।

তাকওয়া মুমিনের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাকওয়া হলো আল্লাহর ভালোবাসা হারানোর ভয়। একজন প্রকৃত মুমিন তাকওয়া দ্বারাই পরিচালিত হন। তাকওয়া মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং সৎকাজে অনুপ্রাণিত করে। কোরআন কারিমে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যারা ইমান এনেছ, তারা তাকওয়া অর্জন করো।’ (সুরা-৩৩ আহজাব, আয়াত: ৭০)। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ইমান আনল এবং তাকওয়া লাভ করল, তারা আল্লাহর বন্ধু; তাদের কোনো ভয় নেই, তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা-১০ ইউনুস, আয়াত: ৬২)। তাকওয়ার মূল কথা হলো আল্লাহর প্রেম ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ে সদা ভীত ও সতর্ক থাকা, নবীজি (সা.)–এর সুন্নাত পালনের মাধ্যমে আল্লাহর মহব্বত লাভের আশায় সদা সচেষ্ট, উৎকণ্ঠিত ও উদ্গ্রীব থাকা।

তাকওয়া শব্দের একটি প্রতিশব্দ হলো ‘খওফ’। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা তার রবের সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করল, তাদের জন্য রয়েছে দুই দুইটি করে জান্নাত।’ (সুরা-৫৫ আর রহমান, আয়াত: ৪৬)। তাকওয়া শব্দের অন্য একটি প্রতিশব্দ হলো ‘খাশিয়াত’। আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন, ‘তুমি শুধু তাকেই সতর্ক করতে পারো, যে উপদেশ (কোরআন) মেনে চলে এবং না দেখেও দয়াময় আল্লাহকে ভয় করে। তুমি তাকে ক্ষমা ও সম্মানজনক পুরস্কারের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা-৩৬ ইয়াসিন, আয়াত: ১১)।

বিজ্ঞাপন

তাকওয়া মানে সাবধানতা, সতর্কতা, আত্মরক্ষা। ষড় রিপু তথা: কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্য হলো মানুষের মানবীয় ইতিবাচক গুণাবলির শত্রু। যেসব নেতিবাচক গুণ বা বৈশিষ্ট্য মানুষের জ্ঞানকে বাধাগ্রস্ত করে, তাদের বলা হয় রিপু বা শত্রু। এরা মূলত জ্ঞানের শত্রু। মানুষের মাঝে এরূপ ছয়টি রিপু বা শত্রু রয়েছে। এগুলো মানব প্রবৃত্তিরই অংশ। এসবের সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে সুসভ্য ও উন্নততর করে। এগুলোর যথেচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষকে পশুরও অধম করে দেয়। অধঃপতনের অতলে নিমজ্জিত করে। রমজানের উদ্দেশ্য হলো ষড় রিপুর ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভের নৈতিক শক্তি অর্জন।

হজরত নুমান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মানবদেহে এমন একটি গোশতের টুকরা আছে, যা পরিশুদ্ধ হলে তার পুরো শরীর সঠিকভাবে কাজ করে; আর তা যদি নষ্ট হয়ে যায় তার সমস্ত দেহই বিনষ্ট হয়; জেনে রাখো তা হলো কলব।’ (বুখারি, খণ্ড: ১, হাদিস: ৫০)।

কলব বা অন্তরের রোজা হলো তাকওয়া। রমজানে রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় রোজাদার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সব ধরনের বৈধ পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত থাকেন। নির্জন নিরালায়, দরজা–জানালা বন্ধ ঘরে গোপন স্থানে অতি সংগোপনেও রোজাদার পানাহার তথা রোজার বিপরীত কোনো কাজ করেন না। এভাবেই সব কাজে সব সময় নেক আমলের জন্য কষ্টসহিষ্ণুতা ও পাপ বর্জনের জন্য মানসিক দৃঢ় মনোবল অর্জনই রোজার মূল শিক্ষা।

দেহ ও মনের পূর্ণ অংশগ্রহণে রোজা পালন করলেই তা পরিপূর্ণ ও ফলদায়ক হবে। মুখের বা জবানের রোজা হলো কুবাক্য ও কুকথা না বলা, পরচর্চা, গিবত শেকায়াত ও পরনিন্দা থেকে বিরত থাকা। চোখের রোজা হলো হারাম দৃশ্য দেখা থেকে বিরত থাকা। কানের রোজা হলো হারাম শোনা থেকে বেঁচে থাকা। হাতের রোজা হলো হারাম ধারণ ও হারাম স্পর্শ থেকে দূরে থাকা। পায়ের রোজা হলো অন্যায় পথে গমন বা পদার্পণ না করা। মন ও মস্তিষ্কের রোজা হলো পাপ ও অন্যায় চিন্তা কল্পনা ও পরিকল্পনা হতে মুক্ত থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই শ্রবণ, দর্শন ও চিন্তা এসবের সবগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা-১৭ ইসরা, আয়াত: ৩৬)।

মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী

যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন