আশিতে পা

বিজ্ঞাপন
default-image

৭৯ বছর পূর্ণ করে আজ আমি ৮০–তে পা দিলাম। তবে কি ‘অশীতিপর’ তকমা লেগে গেল কপালে? অভিধান বলছে, আশির অধিক বয়সীদের অশীতিপর বলা হয়ে থাকে। যাক, তাহলে আরও কিছুদিন সময় আছে। শরীরের বয়স যা–ই হোক, মনের দিক থেকে আমি সব সময় তরুণ থাকতে চাই। তাই আমার বন্ধুর সংখ্যা তরুণদের মধ্যেই বেশি।

জন্মেছিলাম রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর দুদিন পর, তখনকার নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুরে, যাকে ছোট্ট থানা শহর না বলে বর্ধিষ্ণু গ্রাম বলাই সংগত ছিল। এখন তা জেলা শহর। বাড়ির পাশের স্কুলে সত্যিকারের গুণী শিক্ষকেরা আমার লেখাপড়ার ভিত তৈরি করে দিয়েছেন আর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনে পথ দেখিয়েছেন আমার উদার–হৃদয় মা–বাবা। আমাদের জীবনে সচ্ছলতা ছিল, কিন্তু বিলাসিতা ছিল না। স্কুলজীবন শেষ করার আগে আমাদের লক্ষ্মীপুরে বিদ্যুৎ ছিল না, কোনো সিনেমা হল ছিল না। কিন্তু কোনো দিন এসবের অভাব বোধ করিনি। সব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার একটা শিক্ষা লাভ করেছিলাম।

শ্রদ্ধেয় পবিত্র সরকারের কথা ধার করে বলতে চাই, কত ‘অল্প পুঁজির জীবন’ আমার! কিন্তু আজ পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, সেই অল্প পুঁজি সম্বল করেই পৃথিবীর নানা ঘাটে সওদা করেছি। এক জীবনে আমার মতো গড়পড়তা একজন মানুষ এর চেয়ে বেশি কী পেতে পারত? যে আমি ছোটবেলায় সুপারিগাছ কাঁধে বয়ে স্কুলমাঠে মঞ্চ তৈরি করে নাটক করেছি, সেই আমি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নাটকের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সভাপতি পর্যন্ত হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি।

কত বিপদ পার হয়ে এখনো বেঁচে আছি। জীবনে দুবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মুখোমুখি হয়েছিলাম, দুজন মহাপুরুষের স্মৃতিও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৪৬ সালে আমাদের দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকায় এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। আর ১৯৬৪ সালে দাঙ্গা–উপদ্রুত এলাকা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের পরিবারকে নিজ বাড়িতে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের বর্বরতা প্রত্যক্ষ করেছি। বছর দশেক আগে ময়মনসিংহ থেকে ফেরার পথে গভীর রাতে ডাকাতের ছোরার আঘাতে পিঠ রক্তাক্ত হয়েছিল, ভাগ্যিস ছোরাটা গলায় বসায়নি। বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছায় গত বছর বেঙ্গালুরু গিয়ে বুকে যন্ত্র বসিয়েছি।

অর্থবিত্তের প্রতি লোভ আমার কোনো কালেই ছিল না। তাই সম্পদ আর খ্যাতির প্রতিযোগিতায় কখনো শামিল হইনি। আমি বিশ্বাস করি, ভালো কাজ করলে মানুষ সম্মান করবে, স্বীকৃতি দেবে। জীবনে কখনো সচেতনভাবে কারও অনিষ্ট করিনি, যতটা পেরেছি উপকার করারই চেষ্টা করেছি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে চেয়েছি। আমার স্ত্রী ফেরদৌসী মজুমদার ও কন্যা ত্রপা মজুমদার সব সময় আমাকে সত্যের পথে থাকতে সহায়তা করেছে। পনেরো বছরের নাতনি ইচ্ছার মমতা ও জামাতা আপনের বাস্তব জ্ঞান আমাদের একটা বড় ভরসা।

সারা বিশ্ব আজ এক ভয়াবহ দুর্যোগের কবলে পতিত। অচেনা এক ঘাতক ভাইরাস এসে আমাদের চেনা পৃথিবীটাকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। আমরা কেউ জানি না এর শেষ কোথায়। প্রকৃতির ওপর আমরা যে অত্যাচার করেছি, তাই এ যেন প্রকৃতির প্রতিশোধ। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম, এ ধরিত্রীতে পশু-পাখি, বৃক্ষ-বন, নদী-জলাশয়—প্রত্যেকেরই বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য যে কত প্রয়োজন, তা আমরা এখন বুঝতে পারছি।

এটাও নিশ্চিত জানি, এ দুঃসময় একদিন কেটে যাবে। নতুন পৃথিবীতে আমরা আবার একে অন্যের সঙ্গে মিলিত হব। করোনা আমাদের আরও মানবিক হতে শিক্ষা দিয়েছে। পারস্পরিক নির্ভরতা ছাড়া এ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। সঙ্গনিরোধ নয়, একে অন্যের সঙ্গী হয়ে আমরা বাঁচতে চাই।

default-image

করোনাকাল আমাদের সদা ব্যস্ত জীবনে একটু থামার অবকাশ দিয়েছে। নিজের সম্পর্কে, সমাজ ও দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবার সুযোগ দিয়েছে। যে কাজ কোনো দিন হয়তো করা হয়ে উঠত না, তা করার সময় পাচ্ছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠালগ্নের ইতিহাস এবং আমার নিজের প্রায় ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ইংরেজিতে একটা বই লেখা শেষ করে এনেছি, যা স্বাভাবিক সময়ে লেখা হয়ে উঠত না।

বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় নভেল করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক নিশ্চয়ই বেরোবে, এই অতিমারি থেকে পৃথিবী রক্ষা পাবে। কিন্তু এর মধ্যে আমরা কত আপনজনকে হারিয়ে ফেলেছি! তাঁদের আর ফিরে পাব না। তবে তাঁদের জীবনের বিনিময়ে নিশ্চয়ই গড়ে উঠবে নতুন পৃথিবী। এখন যেন একদিন একদিন করে বাঁচি। বেঁচে থাকাটাই বড় সংগ্রাম। তবু এ সময়ে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে চাই এ সুন্দর পৃথিবীতে। জন্মদিনে সবার আশীর্বাদ প্রার্থনা করি, যাতে আমৃত্যু সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে মানুষের জন্য আরও কিছু ভালো কাজ করতে পারি।

এ সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কণ্ঠে ধারণ করে গাইতে চাই:

‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা।

কহো কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা।।’

রামেন্দু মজুমদার: ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের (আইটিআই) সাবেক বিশ্ব সভাপতি ও বর্তমান সাম্মানিক সভাপতি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন