default-image

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনব কাজ হচ্ছে। উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর পড়ালেখায় মন বসে না, তাই তিনি ক্যাম্পাসে আসেন না। মনের দুঃখে সেখানকার কিছু ছাত্র-শিক্ষক উপাচার্যের হাজিরা খাতাটিকেই বিশাল সাইনবোর্ড বানিয়ে প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোয় প্রকাশিত সেই ছবি থেকে দেখা যায়, ৯৮৭টি কর্মদিবসের মধ্যে তিনি উপস্থিত ছিলেন মাত্র ২২৭ দিন। বাকি ৭৬০ দিন তিনি যে কোথায় ছিলেন! কাজে, দরকারে, আবদারে কিংবা সালাম দিতে তাঁকে খুঁজে হয়রান সেখানকার অনেকে। আবার না থেকেও তিনি আছেন। যেহেতু তিনিই উপাচার্য, সেহেতু জরুরি ফাইলে সই নিতে তাঁকে দরকার হয়। তখন সেই ফাইলসহ লোকজন ভাবতে থাকে, এখন তিনি কোথায় আছেন? টেলিভিশনের টক শোতে যখন লাইভ হাজির হন, কেবল সেটুকু সময়ের জন্যই নিশ্চিত হওয়া যায়, মহোদয় এখন ঢাকায়। মাসের অনেকগুলো দিন তাঁকে টিভিতে মুখ দেখিয়ে জাতিকে দিকনির্দেশনা দিতে হয়। সেহেতু তাঁর ঢাকায় না থেকে উপায় কী? তিনি ঢাকায় বা বিদেশে যদি না থাকেন, তাহলে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যা হয় হোক, দেশের তো বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে! জাতি পথ হারিয়ে ফেলবে।

৯৮৭ দিনের মধ্যে গরহাজির ৭৬০ দিন বলতে বলতেই জানা গেল নতুন সংখ্যা। এক দিন পর নতুন হিসাবে ৯৮৮ দিনের মধ্যে ৭৬১ দিন তিনি দুর্লভ। তিনি যখন কর্মস্থলে থাকেন না, তখন কোথায় থাকেন? মানে এই মুহূর্তে তিনি কোথায়? ঢাকায় হলে কি বাড়িতে, নাকি টিভি স্টুডিওতে, নাকি বিদেশে। অনেক মাথা খাটিয়েও তাঁর অবস্থানের অক্ষাংশ–দ্রাঘিমাংশ কিছুই বের করা গেল না। কে বাতলে দেবে তাঁকে পাওয়ার পথ? ‘আমি কোথায় পাব তারে’।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজন কীভাবে দরকারের কাজে তাঁকে খোঁজে? এহেন এক বিপদে পড়েছিলেন সুকুমার রায়ের হাসির গল্প ‘হযবরল’-এর নায়ক। গরম থেকে বাঁচতে তাঁকে তিব্বত যাওয়ার পরামর্শ দিল এক ফাজিল বিড়াল। লেখক তখন জানতে চাইল, ‘তা হলে রাস্তাটা আমায় বাতলে দিতে পার?’

শুনে বিড়ালটা হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। তার পর মাথা নেড়ে বলল, ‘উঁহু, সে আমার কর্ম নয়। আমার গেছোদাদা যদি থাকত, তা হলে সে ঠিক-ঠিক বলতে পারত।’
আমি বললাম, ‘গেছোদাদা কে? তিনি থাকেন কোথায়?’
বেড়াল বলল, ‘গেছোদাদা আবার কোথায় থাকবে? গাছে থাকে।’ আমি বললাম, ‘কোথায় গেলে তার সঙ্গে দেখা হয়?’
বেড়াল খুব জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘সেটি হচ্ছে না, সে হবার জো নেই।’
আমি বললাম, ‘কিরকম?’
বেড়াল বলল, ‘সে কিরকম জানো? মনে কর, তুমি যখন যাবে উলুবেড়ে তার সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন মতিহারি। যদি মতিহারি যাও, তা হলে শুনবে তিনি আছেন রামকিষ্টপুর। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেছেন কাশিমবাজার। কিছুতেই দেখা হবার জো নেই।’

পাঠক, আমাদেরও অবস্থা হয়েছে সে রকম। রংপুরে আছেন শুনে সেখানে হাজির হয়ে হয়তো শোনা গেল তিনি এখন সৈয়দপুর বিমানবন্দরের পথে। ঢাকায় এসে হয়তো শুনতে হলো তিনি তো বিদেশে। রবীন্দ্রনাথের এই গানটি বোধ হয় তাঁর সঙ্গে যায়, ‘আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরেরও পিয়াসি।’

‘হযবরল’র বিড়ালটাকে পাওয়া গেলে প্রশ্ন করা যেত কীভাবে তারা তাদের গেছোদাদার সঙ্গে দেখা করে: ‘তা হলে তোমরা কি করে দেখা কর?’

বেড়াল বলল, ‘সে অনেক হাঙ্গাম। আগে হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় নেই , তার পর হিসেব করে দেখতে হবে, দাদা কোথায় কোথায় থাকতে পারে, তার পর দেখতে হবে, দাদা এখন কোথায় আছে। তার পর দেখতে হবে, সেই হিসেব মতো যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে, তখন দাদা কোথায় থাকবে। তার পর দেখতে হবে—’

হ্যাঁ, অনেক কিছুই দেখতে হবে। সবার আগে দেখতে হবে জনাব কলিমুল্লাহ সাহেবের টক শোগুলো। সেখানে তিনি ন্যায়-নীতি-যুক্তি-কর্তব্য ইত্যাদির কথা বলেন। সরকার–সমর্থক হওয়া কোনো সমস্যা নয়। নাগরিক হিসেবে তাঁর আর যা যা কর্তব্য, তিনি তা অবশ্যই করবেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি যে শর্তে তাঁকে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বানিয়েছিলেন, তাতে ক্যাম্পাসে নিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকার শর্ত ছিল। নিয়োগপত্রের ১ (ঘ) শর্তে উপাচার্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন।’ এটাই তো স্বাভাবিক। তবু লিখতে হয়েছিল, কারণ তাঁর আগের দুজন উপাচার্য ক্যাম্পাসে থাকা পছন্দ করতেন না। রাষ্ট্রপতির দেওয়া নিয়োগপত্রের শর্ত অমান্য করে, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর হাতে ছেড়ে দিয়ে কীভাবে তিনি এর উপাচার্য থাকেন?

আরও দেখতে হবে, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকার পরিষদের আনা অভিযোগগুলো। আর্থিক অনিয়ম, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, প্রাণনাশের হুমকিসহ কী তিনি করেননি? পরিষদের স্মারকলিপিতে ৩৮টি গুরুতর অভিযোগের একটিও তিনি খণ্ডন করেছেন বলে দেখা যায়নি।

আরও দেখতে হবে যুগপৎ গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া তাঁর নারী ও ছাত্রীপরিবেষ্টিত ছবি ও ভিডিওগুলো। কোনো কোনো ভিডিওতে নিবিড়ভাবে তিনি নাচছেন তাঁরই ছাত্রীদের সঙ্গে—মধ্যরাতের দাওয়াতের অনুষ্ঠানে দেখতে হবে, কোন কোন প্রতিষ্ঠানে তিনি সবৈতনিক উপদেষ্টা, কোন কোন এনজিওর ভাতা তিনি পান।

তিনি থাকবেন বলে কোটি টাকা খরচ করে উপাচার্য বাসভবন বানানো হয়েছে। সেই বাসভবন ফেলে তিনি কোথায় কোথায় থাকেন? কতটা অতিষ্ঠ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক ক্যাম্পাসে বিরাট বোর্ড টাঙিয়ে প্রতিদিন তাঁর হাজিরানার হিসাব জনসমক্ষে নবায়ন করেন!

মাননীয় আচার্য রাষ্ট্রপতি মহোদয় তাঁর নিয়োগকৃত ব্যক্তির আমলনামা হাতে নিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন কি যে উপাচার্যের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য উপাচার্য?

ফারুক ওয়াসিফ: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
faruk.wasif@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন