পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে কেন্দ্রশাসিত পদুচেরির জাতীয় রাজনীতিতে তেমন একটা রাজনৈতিক গুরুত্ব নেই। কেরালায় ঐতিহ্যগত লড়াই বামদের সঙ্গে কংগ্রেসের। বিজেপির তেমন কোনো শক্তি নেই। তামিলনাড়ুতে আবার কংগ্রেস ও বিজেপি দুই দলই দুর্বল। সেখানে লড়াই এআইডিএমকে বনাম ডিএমকের। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি প্রচারে যতই ঝড় তুলুক না কেন, অঙ্কের হিসাবেও তারা কংগ্রেস-সিপিএম জোট বা তৃণমূলের থেকে সব পাটি গণিতেই বেশ পিছিয়ে। ফলে এই চার রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফলে নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর দলের তেমন কিছু হারানোর নেই। কিন্তু ব্যতিক্রম আসাম। এখানের লড়াইটাই মর্যাদার।

২০১৪ সালের লোকসভার ভোটে কংগ্রেসকে মাটিতে শুইয়ে দেয় বিজেপি। মোদি-হাওয়ায় রাজ্যের ১৪টির মধ্যে শাসক কংগ্রেস পায় মাত্র ৩টি। সাতটি আসন দখল করে বিজেপি। আঞ্চলিক দল এআইইউডিএফ-ও পায় তিনটি আসন। ১৫ বছর কংগ্রেসি শাসনের পর অঙ্কের হিসাবেও এগিয়ে বিজেপি। দিল্লি আর বিহারে দলের হারের পর নিজের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে চা-তেল-গ্যাসের ভান্ডার আসামে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নরেন্দ্র মোদি অ্যান্ড কোং। মোদি নিজেই ১৫ দিনে ১৪টি সভা করেন। আস্তিনের সব তাস খেলে ফেলে বিজেপি। আঞ্চলিক দলের সঙ্গে আঁতাত করা থেকে শুরু করে ভোটের বহু আগে থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারি প্রকল্পকে কাজে লাগিয়ে জনমতকে নিজেদের পালে আনার চেষ্টা করেন নরেন্দ্র মোদি। দিল্লি, বিহারে সম্মান খুইয়ে বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ নিজের কাঁধে তুলে নেন আসামে দল পরিচালনার ভার।

আসামে ভোটপর্ব শেষ। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আশাবাদী তিন পক্ষই। কংগ্রেসের নেতাদের দাবি, ক্ষমতা তাঁরাই ধরে রাখবেন। বিজেপির নেতারাও একই কথা বলে চলেছেন। আঞ্চলিক দল এআইডিইউএফ সুপ্রিমো বদরুদ্দিন আজমলের দাবি, সরকার গঠনের চাবি তাঁর হাতেই। ঘটনাচক্রে তাঁদের নির্বাচনী প্রতীক তালা-চাবি। ফল জানা যাবে ১৯ মে। পাঁচ রাজ্যে একই সঙ্গে ভোট গণনা। তবে ফল যা-ই হোক না কেন, বিজেপি থিংক ট্যাংক কিন্তু দেয়াললিখন পড়ে নিয়েছে। তারা জানে, বিজেপি আসামে হারলেই বিরোধীদের কেল্লা ফতে! তখন মোদিকে শুধু ইমেজ নয়, গদি ধরে রাখতে হলেও অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। কারণ, দলবদল করে দু-একটি রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে পারলেও এমনিতেই অদূর ভবিষ্যতে রাজ্য জয়ের সম্ভাবনা আরও কঠিন। আসামে হারলে সেই সম্ভাবনা হয়ে উঠবে কঠিনতর।

আগামী বছর নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী গোয়া, উত্তরাখন্ড, মণিপুর ছাড়াও পাঞ্জাব ও উত্তর প্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। পাঞ্জাবে বিজেপি ও তাদের জোটসঙ্গী আকালি দলের অবস্থা খুব খারাপ। গত লোকসভা নির্বাচনে চরম মোদি-হাওয়াতেও অরুণ জেটলির মতো নেতাকেও বেশ বড় মার্জিনে হেরে যেতে হয়। ১৩টির মধ্যে ৬টি পায় বিজেপি। ফলে পাঞ্জাবে বিজেপির হারার আশঙ্কাও প্রবল। বিহার ফর্মুলায় কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি ও অন্যরা যদি জোটবদ্ধ হয়, তাহলে বিজেপির ইউপি জয়ও স্বপ্নই থেকে যেতে পারে। এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করলেও আসামে দল হারলে তার জের ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্যে পড়বেই। তাই ২০১৭-ও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ বিজেপির জন্য। ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনের আগে বিজেপিকে আরও এক দফা পরীক্ষায় বসতে হচ্ছে। ত্রিপুরা, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, হিমাচল প্রদেশ ছাড়াও রয়েছে কর্ণাটক ও মোদির নিজের রাজ্যেও বিধানসভা ভোট। খোদ মোদির রাজ্যে পৌর ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভালো ফল করে বেশ আশান্বিত কংগ্রেস। ফলে ২০১৮-ও চ্যালেঞ্জিং বিজেপির কাছে। কংগ্রেসের তো হারানোর কিছু নেই, সবটাই জয় করার। ফলে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী সোনিয়া গান্ধীও নজর রাখছেন আসামের ওপর।

আসামে বিজেপি হারলে লোকসভায় মোদির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও রাজ্যসভায় কংগ্রেসের ‘দাদাগিরি’র মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকারের যাবতীয় ব্যর্থতাও চলে আসবে জনগণের সামনে। শুধু বক্তৃতায় তখন কাজ হবে না। ক্ষমতার গন্ধ পেলে কংগ্রেসের কর্মীরা কতটা উজ্জীবিত হন, সেটাও টের পাবেন মোদি। একই সঙ্গে দলের প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদভানিও বিজেপির ভেতর থেকেও বাড়াতে পারেন চাপ। ঘরে-বাইরে চাপের মুখে পড়ে পাল্টা কোনো কৌশল নিতেই পারেন সংঘ পরিবারের মদদপুষ্ট বিজেপির বর্তমান নেতৃত্ব।

আর যদি আসামে বিজেপি ক্ষমতায় আসে, তাহলেও সমস্যা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে শুরু হবে অস্থিরতা। ইতিমধ্যেই অরুণাচল প্রদেশে কংগ্রেসের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে। মণিপুরেও কংগ্রেসি সরকারের গদি টলমল। ভয়ে আছে মেঘালয়। খ্রিষ্টান-অধ্যুষিত মিজোরাম আর কমিউনিস্ট-শাসিত ত্রিপুরার গদি নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তবে চিন্তা বাড়বে বাংলাদেশের। বিজেপির ঘোষিত প্রতিশ্রুতি আসাম থেকে ‘অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি মুসলিম’দের তাড়াবে। আসাম চুক্তি মেনে ’৭১ নয়, বিজেপির অতি উৎসাহী নেতারা ’৫১ সালের পর যেসব বাঙালি মুসলিম আসামে এসেছেন, তাঁদেরও তাড়াতে চান। রাজ্য সরকার দাবি করছে, আসামে কোনো বাংলাদেশি নেই। বাংলাদেশও একই কথা বারবার বলেছে। কিন্তু মানতে নারাজ বিজেপির নেতারা। নরেন্দ্র মোদি থেকে অমিত শাহ সবাই ‘বাংলাদেশি মুসলিম’কেই ভোট প্রচারে ইস্যু করেছেন। ভোট প্রচারকালে অমিত শাহর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তর্কের খাতিরেও যদি ধরে নেওয়া হয়, বাংলাদেশি মুসলিম অনুপ্রবেশকারীরা আসামে রয়েছে, তাহলেও ওদের কোথায় পাঠাবেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘ভারত সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলবে। চাপ সৃষ্টি করা হবে। দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা হবে না।’

আর যদি আসামে বিজেপি হারে? ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর অকালমৃত্যুর পর রেকর্ড পরিমাণ আসন নিয়ে দিল্লিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন রাজীব গান্ধী। কিন্তু দুই বছর যেতে না-যেতেই একের পর এক নির্বাচনে হারতে শুরু করে তাঁর দল। হারতে হারতে তাঁর নামই সমালোচকদের কাছে হয়ে ওঠে ‘হারাধন গান্ধী!’ শেষমেশ গদি হারান রাজীব। মোদিও তেমন হবেন কি না, সেটাও বোঝা যাবে আসাম ভোটের পরই। বোফর্স কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত রাজীব গান্ধী অবশ্য ক্ষমতা ধরে রাখতে কোনো বাঁকা পথ নেননি। কিন্তু মোদিও যে একই পথে হাঁটবেন, তেমন গ্যারান্টি নেই।

দিল্লির মসনদ ধরে রাখতে মোদি কোন ‘ম্যাজিক’-এ হাত দেন, সেটাই দেখার। সেই অচেনা-অজানা ম্যাজিকে উগ্র জাতীয়তাবাদ বা সাম্প্রদায়িকতার সুড়সুড়ি থাকার সম্ভাবনা কিন্তু প্রবল। এটাই চিন্তায় রাখবে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোকে। পুরো খেলাটাই নির্ভর করছে আসামের ফলাফলের ওপর। তাই ১৯ মে দিনটি প্রতিবেশীদের কাছেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আসামেই তো লুকিয়ে আছে উপমহাদেশের ভবিতব্য।

তরুণ চক্রবর্তী: প্রথম আলোর ত্রিপুরা প্রতিনিধি।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন