default-image

কোভিড-১৯ বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রচণ্ড আঘাত করেছে। অনেক দেশে এই মহামারির দ্বিতীয় তরঙ্গ বয়ে যাওয়ার কারণে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের সদস্যদেশগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য ৩৯ হাজার কোটি ডলারের অনুদানসহ মোট ৭৫ হাজার কোটি ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যান্য দেশ অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ব্যবসা পুনরুদ্ধার করতে নিজেদের সম্পদের সমন্বয় করছে।

বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে অনেক উন্নয়নশীল দেশের, বিশেষ করে নবীন গণতন্ত্রের দেশগুলোর উপস্থিতি খুবই সীমিত, অনেকে সেখানে ঢুকতেই পারে না। এ কারণে তাদের পক্ষে তাদের নাগরিকদের অর্থনৈতিক সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য বড় কোনো প্রকল্প গ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ধার পাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবনে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে থাকে। বাংলাদেশ সেসব দেশেরই একটি। এটি ‘স্বল্পোন্নত দেশের’ চেয়েও কিছু বেশি। উন্নয়নের দিক থেকে দেখলে বলা যায়, বাংলাদেশের বেশির ভাগ ঘটনাই আসলে সাফল্যের। গত ৫০ বছরের কম সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে গণতন্ত্রও সুসংহত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অস্ত্র ছাড়া যাবতীয় বাণিজ্য স্কিমের আওতায় ইইউ এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য চালু হওয়ার বদৌলতে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড পোশাকশিল্প দিয়েই ইউরোপের বড় ব্যবসায়ী অংশীদারদের অন্যতম হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের এক নম্বর শিল্প এই পোশাক খাত। এখানে ৪৫ লাখের বেশি শ্রমিক এখন কাজ করছেন। বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে যে আয় হয়, তার ৮০ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। পোশাক তৈরির দিক থেকে এই দেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। চীনের পরই তৈরি পোশাকের বাজার বাংলাদেশের দখলে। নামকরা প্রায় সব পশ্চিমা ব্র্যান্ডের পোশাক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে পোশাক তৈরি করিয়ে নেয়।

বাংলাদেশের জিডিপির একটি বড় অংশের দাবিদার পোশাকশিল্প, যা আন্তর্জাতিক সংবাদে বাংলাদেশের নামকে যুক্ত করে আসছে। এ কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেকেই এখনো ২০১২ এবং ২০১৩ সালের দুটি পোশাক কারখানার দুর্ঘটনা এবং নারীদের শ্রমের শোষণের সঙ্গে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের যোগসূত্র খুঁজে পান। এগুলো আসলে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। কারণ, গত সাত বছরে বাংলাদেশের পোশাক খাতের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।

বাংলাদেশে এখন পোশাক খাতে ট্রেড ইউনিয়ন বেশ জোরালো হয়েছে এবং আইনি কাঠামোয় নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কারখানার ভবন নির্মাণসংক্রান্ত আইনকানুন এবং কাপড় রাখার ব্যবস্থা নজরদারির বদৌলতে শ্রমিকদের কর্মস্থলের সুরক্ষাব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় উন্নত হয়েছে।

তবে করোনাভাইরাস মহামারিতে স্পষ্ট হয়েছে, কোনো একটিমাত্র শিল্প খাতের ওপর কোনো দেশের অতিনির্ভরতা যেকোনো সময় বোঝা হিসেবে রূপ নিতে পারে।

করোনা মহামারির কারণে পোশাক খাতে বড় ধাক্কা এসেছে। ওয়ার্ক অর্ডার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। অনেক পশ্চিমা কোম্পানি অর্ডার বাতিল করেছে এবং অনেক কোম্পানি ফরমাশ দিয়ে উৎপাদন খরচ না দিয়েই ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে বলেও অভিযোগ আসছে। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়ী অংশীদারেরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয় এবং পোশাকশ্রমিকেরা যাতে বেতন-ভাতা পান, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাক (তৈরি পোশাক) কারখানাগুলোকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দেওয়া হয়। এই প্রণোদনা আরএমজি খাতকে শ্রমিক ছাঁটাই না করতে সহায়তা করেছে। এরপর যখন দেখা গেল বিদেশের ক্রেতারা দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবেন না, তখন হাজার হাজার শ্রমিককে বিনা বেতনে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হলো এবং শ্রমিকেরা তখন চরম নাজুক অবস্থার মুখে পড়ল।

ইইউভিত্তিক কোম্পানিগুলোসহ অনেক বহুজাতিক কোম্পানি দুর্যোগকালের জন্য প্রযোজ্য ‘ফোর্স মেজার’ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে পাওনা পরিশোধের দায়িত্বকে সংকুচিত করেছে। তারা যুক্তি দেখাচ্ছে, কোভিড-১৯–এর জরুরি অবস্থা তাদের চুক্তির বাধ্যবাধকতা মানার দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এটি পোশাক আমদানি–রপ্তানির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে একটি অগ্রহণযোগ্য অজুহাত। এতে ইউরোপীয় ব্যবসায়িক নীতির ভাবমূর্তিই শুধু ক্ষুণ্ন হবে না, এটা গোটা সরবরাহব্যবস্থাকে এলোমেলো অবস্থায় ফেলে দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বের অন্য শ্রমিকদের মতো বাংলাদেশের শ্রমিকদেরও কাজ শেষে মজুরি পাওয়ার অধিকার আছে। এ কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সম্পাদিত চুক্তি মেনে চলা এবং যেসব পণ্য ইতিমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে তার অর্থ পরিশোধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ইইউ বাংলাদেশে তাদের বাজার খুলে দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে নতুন চেহারা দিয়েছে। এখন ইইউকে নিশ্চিত করতে হবে, এই বাজারে যেসব কোম্পানি কাজ করছে, তাদের যথাযথভাবে আইনকানুন মেনে চলবে।

যদিও ইইউর অনেক কোম্পানি ইতিমধ্যে নিজ থেকে মানবাধিকার ও অন্যান্য পরিবেশবিষয়ক ঝুঁকি ইস্যুর সঙ্গে তাদের কার্যক্রমের যুক্ততার বিষয় প্রকাশ করেছে, তথাপি তাদের সামগ্রিক কার্যক্রমের বিশদ ও সুসংহত পদ্ধতি এখনো অনুপস্থিত।

কোম্পানিগুলো যাতে তাদের কাজের বিষয়ে জবাবদিহিমূলক অবস্থানে থাকতে বাধ্য হয় এবং ক্রেতা, বিক্রেতা, ভোক্তা, বিশেষ করে শ্রমিকদের স্বার্থ যাতে সুরক্ষিত থাকে, সে জন্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে যাবতীয় নির্দেশনা ও আইন যথাযথভাবে পালন করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে ইইউ কোম্পানিগুলোকে এমন একটি অবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের পোশাক খাত তাদের ওপর অবিচল আস্থা রাখতে পারে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত

তোমাস জদেচোফস্কি: চেক রিপাবলিকের রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও লেখক

মন্তব্য পড়ুন 0