বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

‘ইউরেশিয়ানিজম’ একটি বিশদ অর্থবাহী শব্দ। ইসলামপন্থী থেকে শুরু করে কামাল পাশার ইহজাগতিকতাবাদে বিশ্বাসী ‘উলুসালসিস’ নামে পরিচিত উগ্র বামপন্থী জাতীয়তাবাদীরা (যাঁদের একটা বড় অংশ অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা) পর্যন্ত ইউরেশিয়াবাদে বিশ্বাসী। এই ‘ইউরেশিয়ানিস্ট’দের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা পশ্চিমকে অবিশ্বাস করেন। নিখিল তুর্কি ইতিহাসের গৌরবময় সময়কে ফিরিয়ে আনার স্বপ্নে তাঁরা বিভোর থাকেন। রাশিয়া, ইরান, চীন এবং মধ্য এশিয়ার সাবেক তুর্কি দেশগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আলাদা একটি বিশ্ব ব্যবস্থায় তুরস্ক নেতৃত্ব দেবে এমনটাই তাঁরা আকাঙ্ক্ষা করেন।

২০১৫ সালের নির্বাচনের পর থেকে, অর্থাৎ কিনা যখন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) তাদের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে, তখন থেকে রাজনীতিতে ন্যাশনালিস্ট অ্যাকশন পার্টির (এমএইচপি) অতি-জাতীয়তাবাদীদের এবং ইউরেশিয়ানিস্ট শিবিরের কিছু লোকের ভূমিকা বেড়েছে।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স-এর জন্য বিশ্লেষক সুয়াট কিনিক্লিওগ্লু একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। ‘ইউরেশিয়ানিজম ইন টার্কি’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে সুয়াট কিনিক্লিওগ্লু উল্লেখ করেছেন, একজন ইউরেশীয় ভোটারকে শ্রেণিবদ্ধ করা সহজ নয়। এর কারণ ‘সব উলুসালসি ইউরেশিয়ানবাদী নয় এবং সব উলুসালসি একই রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে না।’

কিন্তু তাদের প্রভাব সহজেই দেখতে পাওয়া যায়। সুয়াট কিনিক্লিওগ্লু লিখেছেন: ‘স্বল্প সংখ্যা এবং দুর্বল নির্বাচনী ক্ষমতা প্রদর্শন সত্ত্বেও তাঁদের (ইউরেশিয়ানবাদীদের) নিরাপত্তা আমলাতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থার মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে এবং তুরস্ক কৌশলগত কী পদক্ষেপ নেবে না নেবে সে বিষয়ক বিতর্কে তারা সোচ্চার থাকে।’

তুরস্কের হোমল্যান্ড পার্টির চেয়ারম্যান ডগু পেরিনসেকের ক্ষেত্রে সেই বিতর্কটি অনেকটা এইরকম: রুশ ট্যাংকগুলো ইউক্রেনের সীমানা পার হতেই পেরিনসেক মন্তব্য করেছিলেন, ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ তুরস্কের জন্য একটি হুমকি তৈরি করেছে; তিনি এই আক্রমণকে ‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম একটি রুশ হাতিয়ার’ বলে উল্লেখ করেছেন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘আটলান্টিসিস্ট’রা যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে তা প্রতিরোধ করতে তিনি তুর্কি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
অল্প কিছুদিন আগে হলে এই ধরনের আহ্বান ক্ষমতাসীন একেপির মনযোগ কাড়তে পারত। কারণ এরদোয়ানের একেপি ইউরেশিয়ানবাদীদের ওপর নির্ভর করে থাকে।

কিন্তু এখন রাজনৈতিক স্রোতের কারণে তাদের বধির হওয়ার ভান করতে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারার বৈদেশিক-নীতি তৈরির একটি স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’। অর্থাৎ যাকে বলা যায়, অন্যদের ভয়ভীতি বা প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিজের মতো এগিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। এই ধারণাটি তুরস্ককে তাঁর বৈদেশিক নীতিতে প্রতিফলিত করতে এতটাই তাড়িত করেছে যে, দেশটি যখন সিরিয়া, লিবিয়া এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অনমনীয় ও একতরফাভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার পর প্রতিবেশীদের দ্বারা বিচ্ছিন্নতার হুমকিতে পড়েছিল, তখন ক্ষমতাসীন দলের অভিজাতরা সেই সম্ভাব্য বিচ্ছিন্নতাকে ‘উৎকৃষ্ট একাকিত্ব’ বলে প্রশংসা করতে শুরু করেছিলেন।

তবে গত কয়েক বছরে তুরস্ক প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বাসনের জন্য বাস্তবভিত্তিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার নজিরবিহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি (সরকারি হিসেবে ৬০ শতাংশ), ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের মুখে পড়েছে। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে কিছু লাভ করা গেলে তা দেশের রাজনীতিতে কিছু চাপ কমিয়ে দেয় এবং ক্ষমতাসীন দল কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা ‘ধার’ পায়।

আঙ্কারার নতুন প্লেবুকটি ন্যাটো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল এবং মিসরের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে বলে মনে হচ্ছে।

একদিকে অপেক্ষাকৃত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের মিশ্রণ তুরস্ককে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে দিয়েছে; অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ‘হেভি হিটারদের’ ভূমিকা ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময় ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে মধ্যস্থতার ভূমিকা তুরস্ককে নতুন একটি প্রভাববিস্তারী অবস্থানে নিয়ে গেছে।

পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করার মতো রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন একটি বিকল্প আঞ্চলিক ব্যবস্থার যে ইউরেশীয় দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে তাকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা আন্তর্জাতিক নিন্দা কিছুটা ক্ষুণ্ন করেছে বলে মনে হয়।

যেহেতু তুরস্ক আগামী বছরের শতবর্ষী সংসদীয় ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছে, সেহেতু দেশটি কৌশলগত ভঙ্গুর জোটগুলোতে পরিবর্তন আনতে চায়। এর মধ্য দিয়ে তারা নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আনতে চায়।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কথা উল্লেখ করে ইতিমধ্যেই ‘পাঁচটিরও বেশি দেশ নিয়ে আমাদের বিশ্ব’ স্লোগান দিচ্ছেন। তিনি বলতে চান, পাঁচ পরাশক্তির বাইরে তুরস্কের মতো শক্তি বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এর মধ্য দিয়ে তিনি জাতিসংঘে সংস্কার আনার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন।

এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে এরদোয়ান অভ্যন্তরীণ তুর্কি জাতীয়তাবাদীদের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তুরস্কের বাইরের ইউরেশিয়ানদের কাছে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘আমেরিকার স্বার্থ আগে’ বলে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছিলেন, সেভাবেই আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এরদোয়ান ‘তুর্কিদের স্বার্থ আগে’ গোছের স্লোগান নিয়ে এগোবেন। এ ক্ষেত্রে ইউক্রেন যুদ্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এরদোয়ান ঘরে-বাইরে নিজের প্রভাব সংহত করতে চাচ্ছেন।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া
ইংরেজি থেকে অনূদিত
বার্কু ওজেলিক ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন রিসার্চ ফেলো এবং অধিভুক্ত লেকচারার।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন