বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

সংগঠনের প্রবৃদ্ধি

দুই হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ইডকল যাত্রা শুরু করে। ২০২১ সালে সেই মূলধন ও রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৬৫০০০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি)। ১৯৯৮ সালে ইডকলের জনবল ছিল মাত্র ৫ জন, যা ২০২১ সালে বেড়ে হয় ৪২৩ জন। একই সময়ে ইডকল তাদের মালিক বাংলাদেশ সরকারকে নগদ মুনাফা ও বোনাস শেয়ার দিয়েছে ১২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা সরকারের বিনিয়োগকৃত ৪ দশমিক ৫ মার্কিন ডলারের ২৭ গুণ।

ঋণ কার্যক্রম

২০২১ সাল পর্যন্ত ইডকল মোট ১ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দিয়েছে, যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সাধারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দিয়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে ইডকলের বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সরাসরি বিনিয়োগ ছাড়াও ইডকলের কার্যক্রমে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, বহুজাতিক ব্যাংক ও দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূলধন ও ঋণের সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে।

বাংলাদেশ দ্বিদলীয় রাজনীতির বিরোধের ঊর্ধ্বে থেকে ইডকল পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথাক্রমে ইডকলের ৫০ হাজারতম ও ১০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম অর্থায়ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান প্রথম দিকে ইডকল সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করলেও পরে এ প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হন। পরবর্তী অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়া থেকেও ইডকল অনুরূপ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

সোলার হোম সিস্টেম কার্যক্রম

সোলার হোম সিস্টেমে অর্থায়ন ইডকলের একটি বড় সাফল্য। এর অধীন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৪৩ লাখ বাসাবাড়ি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ দশমিক ৮ কোটি (জনসংখ্যার ১২ শতাংশ) সুবিধাভোগীর কাছে বিদ্যুৎ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এ সংখ্যা সরকারঘোষিত শতভাগ বিদ্যুতায়ন সাফল্যের অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বব্যাপী এটা সর্ববৃহৎ ও সফল সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি হিসেবে সমাদৃত। আফ্রিকার কয়েকটি দেশে ইডকল মডেল অনুসরণ করে সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিত

শুরুতে ইডকলের যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না। বিশ্বব্যাংকের অবাস্তব ক্রয়পদ্ধতি ও সরকার অনুমোদিত বেসরকারি খাতে বাস্তবায়নের জন্য অবকাঠামো প্রকল্পের অভাবের কারণে ইডকল বিশ্বব্যাংকের দেওয়া ২২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে কেবল ৮০ মিলিয়ন ডলার ৪৫০ মেগাওয়াট মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে সমর্থ হয়। ফলে বিশ্বব্যাংক অবশিষ্ট অর্থ বন্যা পুনর্বাসন প্রকল্পে সরিয়ে নেয়। পরে ইডকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে এবং পরবর্তী সময়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে তহবিল সংগ্রহে সমর্থ হয়। তাই ইডকলের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করতে হলে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হবে:

১. সরকারি খাতের প্রতিষ্ঠানে বিরাজমান অদক্ষতা ও আস্থাহীনতার মধ্যেই ইডকলের এ সাফল্য ব্যতিক্রমী।

২. ইডকল এ সাফল্য পেয়েছে এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে। বিশ্বব্যাপী ও বাংলাদেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে একযোগে কাজ করে সফল হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল।

৩. একটি শহুরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান হয়েও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ-সুবিধায় অর্থায়ন। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এ ধরনের সামাজিক অর্থায়ন এড়িয়ে চলে।

৪. সাধারণত দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সহায়তার জন্য দাতা সংস্থাগুলোর দ্বারস্থ হয়। কিন্তু অল্প দিনেই ইডকল দাতা সংস্থাগুলোর পছন্দের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং তারাও ইডকলের কর্মসূচির সুনামের ভাগীদার হতে উদ্‌গ্রীব হয়ে ওঠে।

ফলে সীমিত জীবনের প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও ইডকল অদ্যাবধি সাফল্যের সঙ্গে তার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

সাফল্যের কারণ

ইডকলের সাফল্যের চারটি কারণের কথা উল্লেখ করব।

১. বাংলাদেশ দ্বিদলীয় রাজনীতির বিরোধের ঊর্ধ্বে থেকে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করতে সক্ষম হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যথাক্রমে ইডকলের ৫০ হাজারতম ও ১০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম অর্থায়ন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান প্রথম দিকে ইডকল সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করলেও পরে এ প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় পৃষ্ঠপোষক হন। পরবর্তী অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়া থেকেও ইডকল অনুরূপ পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

২. ইডকলকে আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সমর্থ হই। সম্ভবত, ইডকলই দেশের একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান, যেখানে নিয়োগপত্রে দুর্নীতিমুক্ত থাকার শর্ত সন্নিবেশিত আছে।

৩. ইডকল পরিচালনা পর্ষদ ও এর ব্যবস্থাপনা টিম সন্ধিহীনভাবে (সিমলেস) কাজ করেছে। আমার মনে পড়ছে, সিইও হিসেবে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে প্রথম পরিচালনা পর্ষদের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের সঙ্গে আমি তুমুল বিতর্কে লিপ্ত হতাম। বিশ্বব্যাংকের অনেক পরামর্শ আমরা গ্রহণ করিনি। সে প্রশ্রয় তাঁরা আমাকে দিতেন। তবে সব ক্ষেত্রেই আমরা আলোচনার পর প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোত্তম সিদ্ধান্তে উপনীত হতাম।

সামনের চ্যালেঞ্জ

ইডকলের কিছু ব্যর্থতাও আছে। যেমন সময়মতো সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি গুটিয়ে নিতে (এক্সিট স্ট্র্যাটেজি) ব্যর্থতার কারণে এ খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ অনাদায়ি রয়ে গেছে। অবশ্য এ জন্য বিনা মূল্যে সরকারের সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচিও দায়ী। রাজনৈতিক প্রভাবে প্রদত্ত ও দুর্নীতিক্লিষ্ট কিছু প্রকল্পের ঋণও খেলাপি হয়েছে।

আমি ইডকলের রজতজয়ন্তীতে এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মশিউর রহমান, সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, অতীত ও বর্তমান কর্মকর্তা ও কর্মচারী, বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থা, এনজিও, ঋণগ্রহীতা, শিক্ষাবিদ—সবাইকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। পরিশেষে প্রার্থনা করি, ইডকল শতায়ু, এমনকি আরও দীর্ঘায়ু হোক!

মুহাম্মদ ফাওজুল কবিরখান সাবেক সচিব ও ইডকলের প্রথম পূর্ণকালীন সিইও

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন