বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, ‘মানুষ সেখানে বিনিয়োগ করল কেন? আমরা কি তাদের বিনিয়োগ করতে বলেছি?’ এ ধরনের যুক্তিও জুতসই নয়। যে দেশের গণপরিবহনে এখনো লেখা থাকে ‘অপরিচিত লোকের দেওয়া কিছু খাবেন না’, যে দেশে এখনো ছেলেধরা সন্দেহে দিনদুপুরে মানুষ মেরে ফেলা হয়, সে দেশের মানুষ নিজেই বুঝে ফেলবে, ই-কমার্স সাইট বিনিয়োগের জন্য নয়, ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য—এটা খানিকটা বাহুল্য রকমের প্রত্যাশা। রাষ্ট্রের কোনো কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া মাসের পর মাস একাধিক প্রতিষ্ঠান যখন কইয়ের তেলে কই ভাজার মতো গ্রাহকের টাকা দিয়ে গ্রাহককেই বুঝ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন সাধারণ মানুষের এমন মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে— ই-কমার্স বুঝি ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন এক চমক, নতুন এক উদ্ভাবন, যেখানে ক্রয়-বিক্রয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগও করা যায়।

এবার আসি সমাধানের প্রশ্নে। কারও ফ্লাইট ছিল রাত ১০টায়, তিনি যদি রাত ১১টায় বিমানবন্দরে পৌঁছে বলেন, সমাধান কী? এর কোনো সমাধান নেই। কারণ, বিমান ইতিমধ্যে ছেড়ে চলে গেছে। যেটি হতে পারে, সেটির নাম সমাধান নয়, সেটিকে ড্যামেজ কন্ট্রোল বা ক্ষতির পরিমাণ কমানো বলা যেতে পারে। ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন ক্ষতি কীভাবে কমানো যায়, সেটি নিয়ে কথা বলা যেতে পারে।

আমরা ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বা কমিটি গঠনের কথা জানতে পেরেছি।আমাদের ভাবনা অনুযায়ী ‘নিয়ন্ত্রণকারী’ না হয়ে ‘সমন্বয়কারী’ বা ‘উন্নয়নকারী’ জাতীয় শব্দ হলে ইতিবাচক শোনাবে। ই-কমার্স মশা কিংবা করোনাভাইরাস নয় যে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বরং ই-কমার্সের উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষ হতে পারে, যারা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করবে, যেখানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে প্রতিষ্ঠানগুলো সুষ্ঠুভাবে ই-কমার্স পরিচালনা করছে, তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা সহজ হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ড্যামেজ কন্ট্রোলের জন্য দুটি দিক নিয়ে কাজ করা যেতে পারে— ১. ইতিমধ্যে ‘ডুবে যাওয়া জাহাজ’গুলো, অর্থাৎ ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গ্রাহকদের যতটুকু সম্ভব অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা; এবং ২. ই-কমার্সের উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষ গঠনসহ একটি উন্নয়নমুখী স্ট্র্যাটেজি বা রোডম্যাপ গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।

দ্বিতীয় উপায় হিসেবে আলোচিত হয়েছে, সরকারের সব দেনা পরিশোধ করে দেওয়ার কথা। এখানে অনেক প্রশ্ন রয়েছে—কেন সরকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই বিপুল দেনা পরিশোধ করবে? লোভের ফাঁদে পা দেওয়া লোকজনকে রক্ষা করা সরকারের দায় কতটুকু?

প্রথমত, ইভ্যালির এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একেবারেই নতুন একটি অভিজ্ঞতা, যেহেতু ই-কমার্স সেক্টরের উত্থান এ দেশে নতুন। ফলে এর থেকে দ্রুত নিস্তার পেতে অত্যন্ত সাবধানে, সবার সহযোগিতায় একটি উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে হবে। ইভ্যালির ঘটনা চাউর হওয়ার পর থেকে বেশ কিছু মতামত বিভিন্ন মাধ্যমে এসেছে। মূলত দুটি সমাধানের কথা আলোচনায় এসেছে—১. আইনি পদ্ধতিতে ইভ্যালি অবসায়নের মাধ্যমে যা সম্পদ আছে তা বিক্রি করে পাওনাদারদের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া; এবং ২. ইভ্যালির গ্রাহকদের পাওনা সব টাকা সরকার কর্তৃক পরিশোধ করা।
চলুন দেখে নিই কেন এই দুটি উপায়ের কোনোটিই বাস্তবতার নিরিখে সমাধান দিতে পারে না। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ইভ্যালির এই মুহূর্তে মোট দায় আছে ৫০০ থেকে ১০০০ কোটি টাকা, অন্যদিকে সম্পদ আছে ১০০ কোটি টাকার মতো। এখন এই কোম্পানির অবসায়ন ঘটিয়ে এর সম্পদ বিক্রি করতে গেলে ‘ফায়ার সেল’ মূল্য ১০০ কোটি টাকা কখনোই পাওয়া যাবে না। এই সম্পদমূল্য অবচয় নির্ধারণের পরে কি না, সেটিও নিশ্চিত নই। ফলে সব বিবেচনায় হয়তো মোট সম্পদের সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দাম পাওয়া যেতে পারে। যদি ৭০ কোটি টাকাও উদ্ধার করা যায়, তবে তা দিয়ে মোট দায়ের (১০০০ কোটির অনুপাতে) মাত্র ৭ শতাংশ পাওনা মেটানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়ায় ৯০ শতাংশের বেশি দায় পরিশোধ সম্ভব হবে না। যেখানে আমরা বুঝতেই পারছি, এই প্রক্রিয়ায় ৯০ শতাংশ বা তার বেশি দেনা পরিশোধ করা সম্ভব নয়, সেখানে আইনি পদ্ধতি প্রয়োগ করে অবসায়নের এই সুপারিশ আমাদের কাছে বাস্তবসম্মত নয় বলেই মনে হয়েছে।

দ্বিতীয় উপায় হিসেবে আলোচিত হয়েছে, সরকারের সব দেনা পরিশোধ করে দেওয়ার কথা। এখানে অনেক প্রশ্ন রয়েছে—কেন সরকার জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই বিপুল দেনা পরিশোধ করবে? লোভের ফাঁদে পা দেওয়া লোকজনকে রক্ষা করা সরকারের দায় কতটুকু? যদি ইভ্যালির ক্ষেত্রে করে, তাহলে অন্যগুলোর ক্ষেত্রে, যেমন ধামাকা কিংবা রিং আইডি, এসবের ক্ষেত্রে কী হবে? এভাবে বারবার নানা উপায়ে সুযোগ-সন্ধানী মানুষ লোভের বশবর্তী হওয়া সাধারণ মানুষকে ঠকাবে আর সরকার গিয়ে জনগণের হাজার কোটি টাকা খরচ করে তাদের উদ্ধার করবে, এ কেমন প্রস্তাব? তা ছাড়া যদি ই-কমার্স খাতে সরকার এই সুবিধা দেয়, তাহলে ডেসটিনি কিংবা যুবকের কী হবে?

এতসব প্রশ্নের ভিড়ে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে কোনোভাবেই জনগণের ট্যাক্সের টাকা এই খাতে সরকারের খরচ করা বাঞ্ছনীয় নয়। ধরে নিলাম সরকার ইভ্যালির ক্ষেত্রে এই বিশাল অঙ্কের জনগণের টাকা ব্যয় করে ইভ্যালির অবসায়ন ঘটাল। তাতে কিন্তু ইভ্যালির মতো একটি প্রতিষ্ঠানকে একেবারেই শূন্যে মিলিয়ে দেওয়া হবে, যার ৪৫ লাখ গ্রাহক, কয়েক হাজার মার্চেন্ট এবং একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের অদৃশ্য সম্পদ রয়েছে। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর যে কোনো দেশে, যে কোনো খাতের ব্যবসাতেই এত বড় একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করা কঠিন এবং অবসায়নের মাধ্যমে এই পুরো নেটওয়ার্ককে আমরা ধ্বংস করে দিতে বলছি। এই সুপারিশ কতটুকু গ্রহণযোগ্য? ইভ্যালির দোষ খুঁজতে গিয়ে গুণের দিকগুলো বিবেচনায় না নিলে কী করে হবে। অনেকেই বলতে পারেন, নানা ধরনের লোভনীয় অফার দিয়ে এই কাস্টমার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা এত কিছুর পরে আর কাজে আসবে না। ইভ্যালির বর্তমান অবস্থা যা-ই হোক, ৪৫ লাখ সাধারণ মানুষের যে কাস্টমার বেজ, সেটা তো আর মুছে যায়নি। এই সংখ্যক গ্রাহককে ব্যবহার করে এক ক্লিকেই ৪৫ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

অনেকেই বলতে পারেন, এই গ্রাহকসংখ্যা অভাবনীয় অফারের কারণে সৃষ্টি হয়েছে, এরা প্রকৃত গ্রাহক নয়। এই যুক্তিও আংশিক সত্য। বিশ্বের অনেক নামীদামি প্রতিষ্ঠান অফারের মাধ্যমে গ্রাহক সৃষ্টি করে। তাদের কেউই আশা করে না যে অফারের মাধ্যমে সৃষ্ট গ্রাহকের শতভাগ নিয়মিত গ্রাহক হবে। বরং পরবর্তী সময়ে তাদের লক্ষ্য থাকে—এই গ্রাহকের একটি অংশ নিয়মিত গ্রাহকে পরিণত হয়ে সেটি ব্যবসাকে বিকশিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ইভ্যালির গ্রাহকসংখ্যার যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ ভ্যালু রয়েছে, তাই ইভ্যালিকে ধ্বংস করে দেওয়াটা আমরা মনে করি একটি অবিবেচনাপ্রসূত কাজ হবে।

তাহলে উপায় কী? এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা একটি কার্যকর এবং উদ্ভাবনী মডেল প্রস্তাব করতে চাই, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ সম্ভব দায় পরিশোধ করা যেতে পারে এবং একই সঙ্গে ইভ্যালিকে বাঁচিয়ে রেখে ভবিষ্যতে সঠিক পথে ব্যবসার একটি সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। যদিও আমাদের মডেলটি অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য হবে; তবুও বোঝার সুবিধার জন্য ইভ্যালির পরিপ্রেক্ষিতে এখানে সাতটি ধাপে মডেলটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

ধাপ-১: অনতিবিলম্বে ইভ্যালি এবং একই ধরনের অন্য কেসগুলোকে সমাধানের জন্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে যথাযথ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে হবে। এ কমিটিতে অবশ্যই ই-কমার্স ব্যবসা, প্রযুক্তি এবং এই খাতকে বোঝেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, ই-কমার্সসহ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক মডেলের প্রকৃত ভ্যালুয়েশন সম্পর্কে জানেন, এমন বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এই কমিটিকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের সুবিধার্থে একই সঙ্গে দায়িত্ব এবং ক্ষমতা দিতে হবে, যাতে কমিটি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। শুধু ইভ্যালি নয়, বর্তমানে অনৈতিক ব্যবসায়িক মডেল ব্যবহার করে গ্রাহকদের ঠকানোর অভিযোগে অভিযুক্ত সব ই-কমার্স কেসগুলো নিয়ে কাজ করাই এই কমিটির কাজের আওতায় থাকবে।

ধাপ-২: যেহেতু ইভ্যালি আমদের প্রধান বিষয় এই মুহূর্তে, তাই এই কোম্পানিতে একজন তত্ত্বাবধায়ক বসানো যেতে পারে। মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির সহযোগিতা ও পরামর্শে ইভ্যালির সার্বিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক দায়িত্বে থেকে প্রতিদিনের কাজের তত্ত্বাবধান করবেন। ইভ্যালিতে তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালনে প্রয়োজনীয় পরিচালন ব্যয় সরকার নির্বাহ করবে। উল্লেখ্য, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারি কর্মকর্তা কিংবা পাবলিক সেক্টর থেকে হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই; অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে প্রাইভেট সেক্টর থেকেও দক্ষ এবং অভিজ্ঞ একজন এই ভূমিকা পালন করতে পারেন।

ই-কমার্স বিশ্বব্যাপী প্রচলিত এমন একটি ব্যবস্থা, যেটি এখন আর বিচারের পর্যায়ে নেই, বিচারের মানদণ্ড এটি বহু আগেই পার হয়ে এসেছে। বরং ই-কমার্সই বিচার করবে, আমরা ডিজিটাল বিশ্বের ডিজিটাল নাগরিক হওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি, নাকি মুখে মুখেই ডিজিটাল হয়ে আছি।

ধাপ-৩: যেকোনো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা, যেমন ফেসবুক কিংবা উবার, অবশ্যই এর অন্তর্নিহিত মূল্য তার বাহ্যিক সম্পদ দ্বারা নির্ধারিত হয় না। এমন অনেক কোম্পানি আছে, যেমন উবার কিংবা পেপাল, যার প্রযুক্তিনির্ভর সেই অ্যাপ্লিকেশনটি না থাকলে, তার ব্যবসার কিছুই থাকে না। ফলে প্রযুক্তি-কোম্পানিগুলোর অন্তর্নিহিত মূল্য এর বাহ্যিক সম্পদ দিয়ে কখনো বিচার করা যায় না। কারণ, তাদের বাহ্যিক, দৃশ্যমান সম্পদের চেয়ে অদৃশ্য সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে (যেমন, উবারের কাস্টমার এবং ড্রাইভারের বিশাল নেটওয়ার্ক)। ইভ্যালির বর্তমানে বাহ্যিক সম্পদ এক শ কোটি টাকা হলেও এর অন্তর্নিহিত মূল্য আমাদের অজানা। যতক্ষণ এই অন্তর্নিহিত মূল্যায়ন আমরা জানব না, ততক্ষণ আমরা বুঝতে পারব না, প্রকৃত অর্থে ইভ্যালির মূল্য কত। তাই অনতিবিলম্বে বিশেষজ্ঞ কমিটির তত্ত্বাবধানে ইভ্যালির প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমে অন্তর্নিহিত মূল্য নির্ণয় করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় ইভ্যালির সৃষ্টি করা কাস্টমার, মার্চেন্ট এবং ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কসহ তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, ঝুঁকি, সম্পদ, দায়, ইত্যাদি বিবেচনায় নেওয়া হবে।

ধাপ-৪: বিশেষজ্ঞ কমিটির তত্ত্বাবধানে প্রকৃত মূল্য নির্ণয় করা গেলে, কমিটির প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইভ্যালির তত্ত্বাবধায়ক বেসরকারি খাতে অন্তর্নিহিত মূল্যে বিক্রির জন্য পদক্ষেপ নেবেন। প্রশ্ন হতে পারে, এত কিছুর পরে, কে এই কোম্পানিতে অর্থ বিনিয়োগে আসবেন? আমাদের বিশ্বাস যে কোনো প্রকৃত ব্যবসায়ী ইভ্যালির যে বিশাল গ্রাহক নেটওয়ার্ক এবং আরও সহপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার প্রকৃত ব্যবহারে সমর্থ হলে, পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। তবে এ ক্ষেত্রে কোম্পানিটি কেনার পর, নাম পরিবর্তনসহ ব্র্যান্ডিং পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন করে কর্মকাণ্ড শুরু করতে হবে। যেমন হয়েছে আমাদের ব্যাংকিং সেক্টরে (আইসিবি, ইসলামী ব্যাংক যা আগের ওরিয়েন্টাল ব্যাংক এবং পদ্মা ব্যাংক—যা আগের ফারমার্স ব্যাংক)। এ ছাড়া, সম্ভাব্য ক্রেতা বিনিয়োগকারী খোঁজা, বিজনেস কেস সঠিকভাবে উপস্থাপন করা এবং ক্রয় ও বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার পুরো প্রক্রিয়া সরকার নিযুক্ত তত্ত্বাবধায়কের নেতৃত্বে হলে সেটি মানুষের হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত কার্যকর হবে বলে আমরা মনে করি।

ধাপ-৫: প্রাপ্ত বিনিয়োগকে ব্যবহার করে ইভ্যালির বর্তমান যে দায় রয়েছে তার সর্বোচ্চ অংশ পরিশোধ করে দিতে হবে। এখানে দায়ের তুলনায় বিনিয়োগ অনেক কমও পাওয়া যেতে পারে, তবে আমাদের ধারণা, বিনিয়োগের পরিমাণ (অন্তর্নিহিত মূল্য) বাহ্যিক সম্পদের চেয়ে অনেক বেশি হবে। ফলে অনেক বেশি পরিমাণ দায় পরিশোধ করা যাবে। যে অংশটুকু পরিশোধ করা যাবে না, তার ঝুঁকি পাওনাদারদেরই বহন করা উচিত বলে আমরা মনে করি, যেহেতু তারা অতিরিক্ত লাভ কিংবা লোভের বশবর্তী হয়ে ইভ্যালির পাতা ফাঁদে পা দিয়েছেন। আমরা মনে করি, এই অপরিশোধিত অংশটুকু সরকারের দেওয়া উচিত নয় এবং এর কারণগুলো ইতিমধ্যেই আমরা ওপরে ব্যাখ্যা করেছি। বিনিয়োগ এবং দেনা পরিশোধের এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকবে।

ধাপ-৬: এরই মধ্যে যেহেতু কোম্পানিটি নতুন মালিকানায় চলে যাচ্ছে, যত দিন ধাপ-৫ এ বর্ণিত দায় পরিশোধ প্রক্রিয়া শেষ না হচ্ছে, তত দিন নতুন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে সরকার নিযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক থাকবেন এবং প্রক্রিয়া শেষে তিনি দায়িত্ব কোম্পানির কাছে ফিরিয়ে দেবেন। প্রক্রিয়া শেষে নতুন মালিকের কাছে একটি সম্পূর্ণ নতুন কোম্পানি থাকছে এবং নতুন নামে, নতুন ব্র্যান্ডে, ইভ্যালির যে নেটওয়ার্ক এবং বাহ্যিক সম্পদ রয়েছে সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে, সঠিক ব্যবসায়িক মডেল অনুসরণ করে, ব্যবসাকে দাঁড় করাতে হবে এবং সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
ধাপ-৭: লক্ষণীয় যে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারী কোম্পানিটির এগিয়ে আসার পুরস্কারস্বরূপ সরকার এই নতুন কোম্পানিকে ব্যবসা পুনরায় সচল ও সম্প্রসারণের জন্য নানা মেয়াদে (তিন থেকে পাঁচ বছর) বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা (যেমন ট্যাক্স হলিডে, আমদানি কর রেয়াত, কিংবা ভ্যাট রেয়াত) দিতে পারে। নতুন কোম্পানি অবশ্যই সরকার প্রণীত ই-কমার্স নীতিমালা ও বিধিবিধান মেনে চলবে।

আমাদের প্রস্তাবিত মডেল ইভ্যালির মতো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়ের যে ধরন, তাকে কেন্দ্র করে তৈরি করা। এই মডেলে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বেসরকারি উদ্যোক্তার অংশগ্রহণ হচ্ছে, সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পাওনা মেটানো যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে এই কোম্পানিকে ধ্বংস না করে বরং তার প্রতিষ্ঠিত অদৃশ্য সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে। এমন সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের আশা এবং আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটবে বলে আমাদের বিশ্বাস। যেহেতু প্রস্তাবিত বিশেষজ্ঞ কমিটির কাজের আওতায় শুধু ইভ্যালি নয় বরং একই ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি সব ই-কমার্সের কেস থাকবে, সেহেতু এই প্রস্তাবিত মডেল ইভ্যালির জন্য সফল হলে পরে অন্যান্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

ই-কমার্স সম্পর্কিত কিছু ধারণা নিয়ে কথা বলে এই লেখা শেষ করতে চাই। ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্যে কী পণ্য উৎপাদন করা হয় সেটি নিয়ে প্রশ্ন চলে এসেছে। ই-কমার্স যদি ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্প হয়, সেটির কারখানা কোথায় সে বিষয়ে প্রশ্ন চলে এসেছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে এ ধরনের প্রশ্ন একেবারেই বেমানান। উবারের নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই, এয়ারবিএনবির নিজস্ব কোনো বাড়ি নেই, ফেসবুকের নিজস্ব কোনো কনটেন্ট নেই। ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্য আমাদের চিরচেনা বাণিজ্যের সঙ্গে শুধু অতিরিক্ত একটি চ্যানেল বা বিপণন মাধ্যম যোগ করেছে; যেখানে পণ্য প্রদর্শন, মূল্য পরিশোধসহ বাণিজ্যের বিভিন্ন কাজে তথ্যপ্রযুক্তির আধুনিক ব্যবহার সংযুক্ত করা হয়েছে। গোলাপকে যে নামেই ডাকা হোক, সেটি যেমন গোলাপই থাকবে, ই-কমার্সকেও যে নামেই ডাকা হোক, সেটির নাম-পরিচয় নিয়ে যত প্রশ্নই করা হোক, সেটি ই-কমার্সই থাকবে। ব্যবসা বলা হোক আর বাণিজ্য বলা হোক, অথবা কিছু নাই-বা বলা হোক, ই-কমার্স তার নিজের জায়গাতেই থাকবে।

আমাদের দরকার ই-কমার্স ব্যাপারটার স্বকীয়তাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে এই খাতের উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষ গঠনসহ একটি উন্নয়নমুখী স্ট্র্যাটেজি বা রোডম্যাপ গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে এমন কোনো ঘটনা আর কোনোভাবেই না ঘটে এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও তাদের দায়দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে। এ কাজটি কীভাবে করা যেতে পারে, সে ব্যাপারে ইতিমধ্যে আলোচনা ও কার্যক্রম কিছুটা শুরু হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে হয়তো আমরা এ ব্যাপারে আমাদের আরও কিছু চিন্তাভাবনার কথা তুলে ধরব। বিখ্যাত ‘মোনালিসা’ চিত্রকর্ম নিয়ে বলা হয়ে থাকে—এটি এমন একটি চিত্রকর্ম, যার মান বিচারের আর দরকার পড়ে না। তবে যিনি চিত্রকর্মটিকে দেখছেন, সেই দর্শকের চিত্রকর্ম বুঝতে পারার ক্ষমতা আছে কি না, সেটি বিচারের জন্য মোনালিসা চিত্রকর্মটি ব্যবহার করা যেতে পারে। ই-কমার্স বিশ্বব্যাপী প্রচলিত এমন একটি ব্যবস্থা, যেটি এখন আর বিচারের পর্যায়ে নেই, বিচারের মানদণ্ড এটি বহু আগেই পার হয়ে এসেছে। বরং ই-কমার্সই বিচার করবে, আমরা ডিজিটাল বিশ্বের ডিজিটাল নাগরিক হওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি, নাকি মুখে মুখেই ডিজিটাল হয়ে আছি।

ড. বি এম মইনুল হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: [email protected]
ড. সুবর্ণ বড়ুয়া, সহযোগী অধ্যাপক, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন