>
default-image
উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত, তা চিহ্নিত করার লক্ষ্যে গবেষণা করছে কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার। অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত উন্নয়নের ওপরও জোর দিচ্ছে সংস্থাটি। বাংলাদেশের জন্য ভিশন ২০২১ অর্জনে এই গবেষণাভিত্তিক কিছু নিবন্ধ প্রকাশ করছে প্রথম আলো। আজ প্রকাশ করা হলো এগারোতম নিবন্ধটি।

প্রতিবছর সরকারি ক্রয়ের পেছনে বাংলাদেশ ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে সরকারি অফিসের জন্য পেনসিল কেনা পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত। ধরুন যদি এই পদ্ধতিটি মাত্র ১ শতাংশ আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করা যেত, তাতে ৭০০ কোটি টাকা বেঁচে যেত। আর এই টাকা অন্য অনেক প্রয়োজনীয় প্রকল্প ও সেবার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারত।

সরকারি ক্রয়পদ্ধতি অদক্ষতায় জর্জরিত। বর্তমানে যেসব কোম্পানি ও ঠিকাদার সরকারকে পণ্য ও সেবা দিতে ইচ্ছুক, তাদের অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে দরপত্রের জন্য আবেদন করতে হবে। সরকারি অফিসে সশরীরে উপস্থিত থেকে ফরম দাখিল করতে হবে। কখনো কখনো যেসব ঠিকাদারের রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে, তাঁরা দরপত্র প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সেরা অবস্থানে থাকেন, এমনকি কখনো কখনো অন্যান্য ঠিকাদারের জন্য প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করতে পারেন, যাঁরা আরও ভালো দর দিতে সক্ষম। অনেক ক্ষেত্রে দরপত্রের বিজয়ীরা অন্যান্য সংস্থার অধীন চুক্তিতে কাজ দিয়ে দেন। অবশ্য নিজের লভ্যাংশটুকু রেখে দেন। এর ফলে ক্রয়-প্রক্রিয়ার খরচ দিনে দিনে বাড়তেই থাকে।
সরকারি ক্রয়পদ্ধতিতে এ ধরনের চর্চার ফলে যেকোনো কেনাকাটায় অযথা বিলম্ব ও খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি নিম্নমানের জিনিস কেনা হতে পারে। এগুলো সবই সরকারি খরচ বাড়িয়ে দেয়। এতে করদাতা ও দাতাদের উচ্চমূল্য গুনতে হয়। কীভাবে জাতীয় সরকার তার ক্রয়পদ্ধতির উন্নতি সাধন করতে পারে এবং নিশ্চিত করতে পারে যে করদাতাদের তহবিল যতটা সম্ভব বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যয় করা যায়—‘বাংলাদেশ প্রায়োরিটিজ’ জাতীয় উন্নয়ন প্রচেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কিত এই চ্যালেঞ্জসহ আরও অনেক চ্যালেঞ্জের সমাধান খোঁজার লক্ষ্যে কাজ করছে। কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টার ও ব্র্যাকের যৌথ অংশীদারত্বের এই প্রকল্প এ দেশ, অঞ্চল এবং সারা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ডজন খানেক অর্থনীতিবিদকে দায়িত্ব দিয়েছে যে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন প্রচেষ্টার পেছনে ব্যয়িত প্রতি টাকায় কীভাবে সর্বোচ্চ কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, সে বিষয়ে গবেষণা করার জন্য।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের একজন গবেষণা সহকর্মী ওয়াহিদ আবদাল্লাহর নতুন গবেষণায় বর্তমান ক্রয়পদ্ধতিকে অনলাইন পদ্ধতিতে রূপান্তর করার ফলাফল যাচাই করে দেখা হয়। আবদাল্লাহর গবেষণা অনুযায়ী, ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয়পদ্ধতি (ই-জিপি) দেশের জন্য বিপুল পরিমাণে সুফল বয়ে আনতে পারে—এ ধরনের প্রচেষ্টার পেছনে ব্যয় করা প্রতিটি টাকা বিস্ময়করভাবে ৬৬৩ টাকার কল্যাণ সাধন করবে।
সরকারি ক্রয়পদ্ধতি সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংক মিলে ২০০৮ সালে একটি প্রকল্প চালু করে। ২০১১ সালের মধ্যে চারটি বাংলাদেশি সংস্থা ইলেকট্রনিক ক্রয়পদ্ধতি বাস্তবায়ন করে। সরকারি কেনাকাটার প্রায় ১০ শতাংশ এই পদ্ধতির মাধ্যমে করা হয়। প্রত্যাশা ছিল যে সশরীরে উপস্থিত থেকে ফরম জমা দেওয়ার পরিবর্তে অনলাইনে জমা দেওয়ার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে দরপত্র দাখিল করার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। কে দরপত্র বিজয়ী হয়েছেন, দরপত্র দাখিলকারীরা অনলাইনে সেটাও যাচাই করতে পারবেন, যার ফলে প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।
কেউ যদি খুব সহজেই তাঁদের অফিস, এমনকি নিজের বাসা থেকে একটি সরকারি চুক্তির ওপর দরপত্র দাখিল করতে পারেন এবং যদি সবাই মনে করেন যে প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠু হবে, তাহলে আরও অনেক কোম্পানির দরপত্র দাখিল করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। সরকারি প্রকল্পের ওপর এ রকম বেশি বেশি দরপত্র দাখিলের অর্থ আরও অনেক বেশি প্রতিযোগিতা এবং এর মধ্য দিয়ে কম মূল্যে দরপত্র দাখিল হবে।
২০১১ সালে ই-জিপি বাস্তবায়ন করা চারটি সংস্থার মধ্যে একটি হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি)। এলজিইডি প্রথম ২০১২ সালে খুব ছোট আকারে পরীক্ষামূলকভাবে ই-জিপি চালু করে। তখন সরকারি কেনাকাটার ১ শতাংশেরও কম ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে করা হতো। এলজিইডি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কারণে এবং অনলাইনে নিবন্ধনের মাধ্যমে আরও দরপত্র দাখিল করার কারণে এই হার বৃদ্ধি পেয়ে ৬১ শতাংশে উন্নীত হয়। বর্তমানে এলজিইডির কেনাকাটার প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ই-জিপি ব্যবহৃত হয়, যা অন্য যেকোনো সংস্থার চেয়ে বেশি।
এখন কোনো প্রকল্প শুরু করার আগে, এলজিইডির প্রকৌশলীরা কেনা হবে এমন প্রতিটি জিনিসের আনুমানিক খরচ হিসাব করে নেন। এটি ই-জিপির প্রভাব অনুধাবনের ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই যখন একের পর এক ব্যবহারকারী ই-জিপি ব্যবহার শুরু করলেন, তখন কেনার খরচ ১১ দশমিক ৯ শতাংশ কমে গেল। ই-জিপির সম্প্রসারণ প্রতিবছর আনুমানিক ৫ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা বাঁচাবে। ভবিষ্যতে ই-জিপি সর্বমোট ৯৫ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকার কল্যাণ সাধন করবে। আর এটি একটি নিয়ন্ত্রিত অনুমান, কারণ এতে কেবল ক্রয়পদ্ধতির কাজ-সম্পর্কিত সঞ্চয় অন্তর্ভুক্ত, যেহেতু এলজিইডি বিশ্লেষণে শুধু কাজই অন্তর্ভুক্ত আছে। তাই সর্বসাকল্যে ই-জিপির সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ব্যয়িত প্রতি টাকা ৬৬৩ টাকার সুফল বয়ে আনবে।
ইলেকট্রনিক ক্রয়পদ্ধতি জাতীয় সরকার ও করদাতাদের জন্য ব্যাপক সুবিধা এবং সঞ্চয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়। এটা কি বাংলাদেশের জন্য আপনার শীর্ষ অগ্রাধিকারের মধ্যে একটি হতে পারে? https://copenhagen. fbapp. io/e-procurementpriorities-এ আপনার বক্তব্য শোনা যাক। কীভাবে ব্যয়িত প্রতিটি টাকায় সর্বোচ্চ কল্যাণ সাধন সম্ভব, সে বিষয়ে আমরা আলোচনা চালিয়ে যেতে চাই।

ইংরেজি থেকে অনূদিত
ড. বিয়র্ন লোমবোর্গ: কোপেনহেগেন কনসেনসাস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট। টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির একজন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0