বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলোর বগুড়া অফিসের প্রধান আনোয়ার পারভেজকে আগেই বলে রেখেছিলাম, বগুড়ায় এলে শহরটা ঘুরে দেখতে চাই। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তিনি সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। প্রথম আলোর অফিসেই কথা হয় জাসদ নেতা ও আইনজীবী আবদুল লতিফ পশারি, সিপিবির নেতা আমিনুল ফরিদ, সাবেক ছাত্রনেতা সোইন চৌধুরী ও নজরুল ইসলামেরর সঙ্গে। জিজ্ঞাসা করলাম, বগুড়ার প্রধান সমস্যা কী? বললেন, যানজট। শহরে লাইসেন্স ছাড়া ৪০ হাজার ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে। ইজিবাইক আমদানি ও বিক্রির অনুমতি আছে। রাস্তায় নামার অনুমতি নেই। পুলিশ সড়কে গাড়ি আটকায় না। গ্যারেজের মালিকের কাছ থেকে নিয়মিত ‘মাসোহারা’ আদায় করে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও ভাগ পান। ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে দিনে তিন কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। সরকার ছাড়পত্র দিলে রাজস্ব পেত। শহরের মাঝ দিয়ে চলা রেললাইনে দিনে ১৮ থেকে ২০টি ট্রেন যাওয়া-আসা করে। এ কারণেও যানজট বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল থেকে জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত বিকল্প সড়কের নির্মাণকাজ ফের শুরু হয়েছে। বগুড়াবাসী চায়, বিকল্প সড়কের মতো বিকল্প রেললাইন হোক। যানজট কমে যাবে।

বগুড়া শহরের লোকসংখ্যা প্রায় আট লাখ। এর চেয়ে কম লোকসংখ্যার জেলা শহরও সিটি করপোরেশন হয়েছে। বিভাগ হয়েছে। বগুড়া হয়নি। এ নিয়ে বগুড়াবাসীর মনোবেদনা আছে। আবার তারা আনন্দিত যে বেসরকারি উদ্যোগে বগুড়ায় নতুন নতুন কারখানা গড়ে উঠেছে। কৃষিযন্ত্রের ৮০ শতাংশ তৈরি হয় এখানে। বছরে ২৫০ কোটি টাকার যন্ত্র বিদেশে রপ্তানি হয়। অনেক নতুন শিল্পকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও হোটেল-মোটেল গড়ে উঠেছে। নাগরিক সমাজের নেতাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে আওয়ামী লীগের আমলে বগুড়ার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হচ্ছে না। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা আখের গোছাতে ব্যস্ত। পদ হারানোর ভয়ে তঁারা সমস্যার কথা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন না। অথচ তিনি ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় এসে বিশ্ববিদ্যালয়, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন, অর্থনৈতিক অঞ্চল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বগুড়া উত্তরের প্রধান শিল্পশহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো। কাজের সুযোগ আছে। তাই গাইবান্ধা, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাটসহ অনেক জেলা থেকে অভিভাবকেরা এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানদের ভর্তি করেন। অনেকে বাড়ি ভাড়া করে থাকেন। কিন্তু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাতে গোনা কয়েকটি। চারটি সরকারি কলেজ ও দুটি মাধ্যমিক স্কুল।

বিএনপি আমলে বগুড়ায় কী রকম উন্নয়ন হয়েছে? একজন বলেন, সড়ক প্রশস্তকরণ ছাড়া দৃশ্যমান কিছু হয়নি। তারেক রহমান বগুড়া এলে চম্পা মহলে উঠতেন। শত শত নেতা-কর্মী বাড়ির সামনে ভিড় জমাতেন। এখন সেখানে কাকপক্ষীও আসে না। বাড়ির নামও বদল করে গ্রিন স্টেট রাখা হয়েছে। বগুড়ার সংস্কৃতিসেবীদের অভিযোগ, আট লাখ জন-অধ্যুষিত বগুড়া শহরে একটি ভালো মিলনায়তন নেই। অদ্ভুত নকশার একটি শহীদ মিনার করা হয়েছিল বিএনপির আমলে। সরেজমিন দেখলাম উঁচু ঢিবির মতো কংক্রিটের একটি স্থাপনা। এর ওপর লোহার শিকে কয়েকটি বাংলা অক্ষর ঝুলছে। সে সময় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে নতুন শহীদ মিনার তৈরি করবেন। ইতিমধ্যে ১৩ বছর পার হয়ে গেছে।

আনোয়ার পারভেজ নিয়ে গেলেন বগুড়া শহরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদী দেখাতে। জেলা প্রশাসকের অফিস এই নদীর পাড়েই। অফিসের পেছনের অংশে নদীর প্রায় পুরোটা দখল হয়ে গেছে। মাটি ও ময়লা-আবর্জনা দিয়ে ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। এখানে প্রশাসনে যাঁরা আসেন, তাঁরা দিন গোনেন যাওয়ার জন্য। ভাবেন, আগবাড়িয়ে উন্নয়নের কথা বললে ক্ষমতাসীনেরা সন্দেহ করবেন। করতোয়া রক্ষা নিয়ে বাপা ও বেলা মাঝেমধ্যে মানববন্ধন করে। কিন্তু দখলদারদের দৌরাত্ম্য কমে না। অনেক নামীদামি প্রতিষ্ঠানও নদী দখলের সঙ্গে জড়িত।

আওয়ামী লীগ সরকার ঘোষণা দিয়েছে, প্রতিটি জেলায় একটি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে। অথচ পুরোনো জেলা বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোনো উদ্যোগ নেই। এ জন্য অবশ্য বিএনপিকেও দায়ী করেন স্থানীয় লোকজন। আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে বগুড়ার একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করার উদ্যোগ নিয়েছিল। বিএনপি এসে সেটি বাতিল করে দেয়। তারা বলেছিল, বিশেষায়িত নয়, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় হবে। গত দুই দশকে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি।

বগুড়া উত্তরের প্রধান শিল্পশহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। যোগাযোগব্যবস্থা ভালো। কাজের সুযোগ আছে। তাই গাইবান্ধা, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাটসহ অনেক জেলা থেকে অভিভাবকেরা এখানকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানদের ভর্তি করেন। অনেকে বাড়ি ভাড়া করে থাকেন। কিন্তু সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাতে গোনা কয়েকটি। চারটি সরকারি কলেজ ও দুটি মাধ্যমিক স্কুল। শিক্ষা নিয়ে কথা হয় পুলিশ লাইনস স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ শাহাদৎ আলম ওরফে ঝুনুর সঙ্গে। তিনি বলেন, বগুড়া শিক্ষাশহর হিসেবে পরিচিতি পেলেও এখানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুব কম। বিশেষায়িত ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন বেশি। উপবৃত্তির পরিমাণও কম। গরিব অভিভাবকেরা সন্তানদের এখানে পড়াতে পারবেন না। বগুড়ায় স্বাস্থ্যসেবাও অপ্রতুল। ৫০০ শয্যার জিয়াউর রহমান মেডিকেল হাসপাতালে সব সময় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ রোগী ভর্তি থাকে।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে গত ১৩ বছরে বগুড়ায় অন্তত ৫০টি রাজনৈতিক হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কোনোটির বিচার হয়নি। এমনকি বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আনা সন্ত্রাস ও নাশকতার মামলায়ও কেউ শাস্তি পাননি। আওয়ামী লীগ-সমর্থক আইনজীবীরা তাঁদের জামিন করিয়ে দিয়েছেন। ২০১৭ সালে শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকার পত্রিকার শিরোনাম হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে ভর্তি-ইচ্ছুক এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ ও মা-মেয়েকে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছিল। এই মামলার পর তুফানকে শ্রমিক লীগ ও তাঁর ভাই মতিন সরকারকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি মামলার বাদী আদালতে তুফান সরকারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তুলে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে বলেন, এ রকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। বর্তমানে তুফান জামিনে আছেন; যদিও মামলা চলমান আছে।

বগুড়া আওয়ামী লীগে কতটি ধারা, জিজ্ঞাসা করলে তৃণমূল থেকে উঠে আসা দলের এক নেতা বললেন, ধারা একটাই—সুবিধাবাদী। ২০০৯ সালের আগে আওয়ামী লীগের যেসব নেতার কিছুই ছিল না, তাঁরা পদপদবি পেয়ে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। তঁারা সরকারি জমি দখল করেন। মানুষকে বেকায়দায় ফেলে কম দামে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করেন। আর বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের একাংশ আওয়ামী লীগ নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে চলছেন। বিএনপির থেকে বহিষ্কৃত এক পৌর কাউন্সিলর ক্ষোভের সঙ্গে টেলিফোনে বললেন, বিএনপির নেতারা এখন আওয়ামী লীগ নেতাদের মঞ্চে বসিয়ে দলের সম্মেলন করেন।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হয় বগুড়া পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বাদশার সঙ্গে। তাঁর অফিসে তখন শত শত নারী-পুরুষের ভিড়। বেশির ভাগই এসেছেন জন্মনিবন্ধন করতে। এ নিয়ে সারা দেশে মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কম দামে পণ্য নিতে টিসিবির কার্ডের জন্যও অনেকে মেয়রের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। মেয়র জানান, ১১ ওয়ার্ডের পৌরসভা সরকার থেকে যে বরাদ্দ পায়, বগুড়াও তা-ই পায়। সরকারের কাছ থেকে পায় ৭৩ লাখ আর বাজেট হলো ৯৬ কোটি টাকার। সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা কেমন পান? উত্তরে মেয়র বলেন, আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের লোকজন বগুড়ার নাম শুনলে বাঁকা চোখে তাকাতেন। এখন অন্তত কথাবার্তা
বলা যায়।

ঢাকা থেকে বগুড়ার দূরত্ব ২৩০ কিলোমিটার। বাসে ঢাকা থেকে বগুড়া যেতে সময় লেগেছিল সাড়ে ছয় ঘণ্টা। ফেরার দিন সাড়ে আট ঘণ্টা। উত্তরের এই প্রধান শিল্পনগরীর সঙ্গে বিমান যোগাযোগ স্থাপিত হলে বগুড়া ও এর আশপাশের সব জেলার মানুষই উপকৃত হবেন। ব্যবসা–বাণিজ্য, পর্যটন বাড়বে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি কি ভেবে দেখবেন?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন